জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আশা জাগিয়েছে সূর্যমুখী চাষ

December 4, 2023

মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা প্রতিবছর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিকে অনুর্বর করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রভাবে লক্ষাধিক কৃষক তাদের শতবর্ষের পুরনো পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। অসীম শিকারী সেই কৃষকদের মধ্যে একজন, যিনি সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে জলবায়ু সঙ্কটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন।

আমাদের কাছে লবণ-এর একটি নতুন নাম আছে। আমরা বলি ‘আগুনের ছাই’।

কেন? আমি বলছি সেটা।

আমি কৃষিকাজ করি এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলবর্তী পটুয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করি। আমাদের ৬টি ঋতু ছিল এবং বছরের পর বছর একইভাবে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ঋতু বৈচিত্র্য উপভোগ করতাম (গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত)। বর্তমানে কেবল ৩টি ঋতুর দেখা মেলে। একটি হলো গ্রীষ্মকাল, যা মাটির নমনীয়তা শোষণ করে; একটি বর্ষাকাল যা প্রায়শই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা সঙ্গে নিয়ে আসে এবং আরেকটি হলো শীতকাল, যার শুষ্কতা সমস্ত আর্দ্রতা কেড়ে নেয়। এমনকি ফসলের মধ্যে সবচেয়ে সহনশীল মুগ ডালের ফলনও  ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লবণ প্রয়োজনীয় উপাদান হলেও দিনদিন তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। লবণাক্ততা এখানে প্রায় সব ঋতুতেই থাকে। এটি আসে ভয়াবহ জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যার সঙ্গে।

ঘূর্ণিঝড় আসে কিছু সময়ের জন্য, তবে তা রেখে যায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই ঝড় সঙ্গে করে নিয়ে আসে ভয়াবহ লবণাক্ততা। ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সঙ্গে আসা সেই স্থবির ​​নোনা পানি মাসের পর মাস থেকে যায়। যখন শেষ পর্যন্ত তা বাষ্পীভূত হয় বা মাটিতে প্রবেশ করে, তখন সাদা লবণের একটি বিষাক্ত স্তর রেখে যায়, যা পুরো মাটিকে ছেঁড়া সাদা বিছানার চাদরের মতো ঢেকে দেয়।

“লবণের মধ্যে কিছুই জন্মায় না আর আমি কৃষিকাজ ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না।”

আমরা একে বলি, ‘আগুনের ছাই’ কারণ এটি মাটিকে আগুনের মতো পুড়িয়ে ফেলে।

যখন এই নোনা মাটিতে আমি ধান লাগানোর চেষ্টা করেছি, তখন ধানের আগাগুলো হলুদ হয়ে শুকিয়ে গেছে। আমি তরমুজ চাষ করে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তরমুজ চাষে প্রচুর পানি প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া সেচের জন্য অনেক টাকা খরচ হয়, প্রতি একরে প্রায় ৩ হাজার ৩শ টাকা।

শুনেছি লোকজন এই পরিস্থিতিকে ‘জলবায়ু সঙ্কট’ বলে। এই সঙ্কট কে তৈরি করেছে এবং আমাকে কেন এর জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে? চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খায়। তবে শুধু ভাবলে তো আর ক্ষুধা মিটবে না। সেজন্য আমি আবার ক্ষেতে ফিরে যাই। দিনের পর দিন পার হয় আর নতুন ফসল ফলানোর চেষ্টা করি, খাবার জোগাড়ের চেষ্টা করি।

হাস্যোজ্জ্বল সূর্যমুখী

আমার এখনও মনে আছে যখন আমি সূর্যমুখী চাষের কথা শুনেছিলাম, তখন আমার মনে অনেক প্রশ্ন ছিল। আমি কীভাবে সূর্যমুখী চাষ করব? কীভাবে বীজ প্রক্রিয়া করব? এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই লবণাক্ত মাটিতে এটি কীভাবেই বা বেড়ে উঠবে?

নিজের সূর্যমুখী ক্ষেতে অসীম শিকারী

আমি প্রথমবার যে জাতের সূর্যমুখী চাষের চেষ্টা করেছিলাম, সেটি ছিল হাইসান-৩৩, যা লবণ-সহনশীল একটি জাত। সূর্যমুখী চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে আমার ক্ষেতে রোপণ করেছিলাম। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা করেছি। যেমনটা আমি সব ফসলের জন্য করি। এবার আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। শেষমেশ তাদের আশাতীত ফলন আমাকে অবাক করেছে। লবণাক্ত মাটিতে এতো ভালোভাবে আর কোনো ফসল ফলতে দেখিনি। জলবায়ু পরিবর্তন সত্ত্বেও চারাগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত বেড়ে ওঠা এবং পরিপূর্ণ সূর্যমুখী হয়ে ওঠা দেখে মনে হচ্ছিল যে, তারা এই মাটির জন্যই জন্মেছিল।

খুব শীঘ্রই ফুল ফোটা শুরু হয়। প্রতিদিন সকালে যখন আমি ক্ষেতে যেতাম, তখন প্রার্থনা করতাম। আমি চেয়েছিলাম প্রতি গাছে একটি করে ফুল হোক, কারণ বেশি হলে ফুল ছোট হবে। ফলে সূর্যমুখীর বীজ ছোট হবে এবং পরবর্তীতে একর প্রতি ফলন কম হবে।

দ্বিতীয় মাসের মধ্যেই প্রায় সব ফুল ফুটে গিয়েছিল। সেদিন ফুটে ওঠা সূর্যমুখীগুলোর হাসি আমার চোখে সূর্যের মতোই উজ্জ্বল মনে হয়েছিল। সূর্যমুখীর হাসি দেখে আমার মুখেও হাসি ফুটল। শেষ কবে আমি আমার ফসলের দিকে তাকিয়ে এমন নিশ্চিন্তে হেসেছিলাম তা মনে করতে পারছি না।

সূর্যমুখীর হলুদ পাপড়িগুলো দর্শকদের নজর কাড়লেও আসীমের মতো কৃষকদের জন্য, মাঝখানের কালো বৃত্তের অংশটুকুই তাদের খুশির কারণ। বৃত্ত যত বড় হয়, সূর্যমুখী তেলের ফলন তত বেশি হয়।

“এই মৌসুমে প্রতি একর প্রায় ৫শ কিলোগ্রাম সূর্যমুখী বীজ সংগ্রহ করার আশা করছি। একই সময়ে একই ক্ষেতে সাধারণত যে পরিমাণ মুগ ডাল উৎপাদন করতাম, তার তুলনায় এখন পাঁচগুণ বেশি আয় করতে পারি। তার চেয়েও বড় কথা, নিজেদের রান্নার জন্য এখন আর সারা বছর বাজার থেকে দামি খাবার তেল কিনতে হয় না। ডালপালা রান্নাঘরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং গবাদি পশুদের খাওয়ানোর ভুসি পাওয়া যায়। এর বেশি আর কি আশা করতে পারি?

জমিতে সেচ 

আমার জমির প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা থাকলেও বিগত কয়েক বছর ধরে ফসল উৎপাদনে ক্রমাগত ব্যর্থতা আমাকে হতাশ করছিল। সূর্যমুখীর হাসি এখন আমার মধ্যে একটি নতুন, দীর্ঘ-লালিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।

আমি ফসলের জমিতে সেচ দেওয়ার সস্তা উপায় বের করতে চেয়েছিলাম। অবশেষে বুঝতে পেরেছি যে, সমাধানটি সবসময় আমার চোখের সামনেই ছিল। এখানে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল আছে। যেটি আমাদের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। বছরের পর বছর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ না করায় খালটি পলি দিয়ে ভরাট হয়ে যায়। যদি খালটি আবার খনন করে বাঁধ দিতে পারি, তাহলে আমরা খুব কম খরচে শুষ্ক মৌসুমে ফসলে সেচ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারব।

আমার আশেপাশের চাষীরা এখন সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী। সেজন্য সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি এটিই হবে আমার পরবর্তী লক্ষ্য। আপনি যদি আমাকে গত মরসুমে জিজ্ঞেস করতেন, তাহলে হয়তো আমি বলতে পারতাম না যে, এভাবে করা সম্ভব।

 

অসীম শিকারী বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার একজন কৃষক।

 

অনুবাদ : যারিন তাসনিম, সাব্বির আহমেদ ইমন

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
রেজাউল
রেজাউল
1 month ago

তথ্য সমৃদ্ধ লেখা, পড়ে খুব ভাল লেগেছে। অসাধারণ ছবি।