আমার ব্র্যাক জীবন – ‘ফ্রম দ্যা গ্রাউন্ড আপ’

January 25, 2021

ব্র্যাকের নানা বয়সি এবং লেভেলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম যে, আশির দশকে ব্র্যাকে যেসব কালজয়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কে খুব কমসংখ্যক কর্মীরই ধারণা আছে। বেশ একটা অপরাধবোধ জাগ্রত হলো। ভাবলাম, এটা আর বেশিদিন ফেলে রাখা যাবে না। যতুটুকু ক্ষমতা আছে তাই দিয়ে অন্তত কিছুটা দলিলবন্দি করার চেষ্টা করতে হবে। প্রথমেই ব্র্যাকের কৃষিক্ষেত্রে অবদানের বিষয় নিয়ে ভাবলাম। আমার জানা ছিল আশি ও নব্বইয়ের দশকে ব্র্যাক কী কী উদ্যোগ নিয়েছিল, যা এক পর্যায়ে চরম সফলতায় পর্যবসিত হয়।

২০১৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর। মৃদু শীতের বিকেল। মহাখালী ব্র্যাক সেন্টার অডিটরিয়ামে তিল ধারণের জায়গা নেই। উপলক্ষ্য একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। এ রকম অনুষ্ঠান তো কতই হয়। এই অডিটরিয়ামেই অনেক হয়েছে। কিন্তু আজ যেন একটু আলাদা, একটু অন্যরকম।  ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ হাসপাতালে। জীবনের শেষ কয়েকটি দিন তাঁর সেখানেই কাটছে। বিকেলের অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে সকালের দিকে আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে গেলাম। অসুস্থতার সময় বেশ কয়েকবার গিয়েছি তাঁকে দেখতে। স্ত্রী নীলোফার আমার সঙ্গী। রুমে ঢুকে দেখতে পেলাম সারওয়াত ভাবীকে। স্যুইটের অপর পাশে আবেদ ভাই শুয়ে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ভাবী বললেন, ভাই ঘুমোচ্ছেন। কিছুক্ষণ বসার পর ভেতর থেকে কেউ আমায় ডাকছেন বলে মনে হলো। তাকিয়ে দেখি রেহানা মুরশেদ, আবেদ ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং ব্র্যাকে আমার অনেক দিনের সহকর্মী। বললেন, আবেদ ভাই জেগেছেন। আপনারা আসুন। সঙ্গে সঙ্গেই গেলাম। দেখলাম, আবেদ ভাই একটু নড়ছেন। রেহানা আবেদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, দেখুন তো তাকে চেনেন কি না? আমার দিকে তাকিয়েই বললেন ‘মোশতাক’। মনটা ভরে গেল। সময় ব্যয় না করে সঙ্গে আনা বইটি তাকে দেখিয়ে বললাম, ‘আবেদ ভাই, কৃষি ক্ষেত্রে ব্র্যাকের অবদানের ওপর লেখা বইটি প্রকাশিত হয়েছে।’ নিবিড় দৃষ্টিতে এক ঝলক দেখে শুধু বললেন, ‘ওয়ান্ডারফুল’। তারপর আবার ঘুমিয়ে গেলেন। মনে হলো, সত্যিকার অর্থে আমাদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়ে গেল। আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে সেটিই আমার শেষ দেখা।

বিকেলে উপস্থিত হলাম ব্র্যাক সেন্টারে। ‘ফ্রম দ্যা গ্রাউন্ড আপ’ শিরোনামের বইয়ের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন। বইটি কৃষি ক্ষেত্রে ব্র্যাকের প্রায় পাঁচ দশকের কাজের একটি বিবরণ। শাল্লায় সত্তর দশকের প্রথম দিকেই কৃষির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এরপর সেটা মানিকগঞ্জে প্রসারিত হয়। ১৯৮০-র দশকের প্রথম দিকে ব্র্যাক কৃষিক্ষেত্রে কার্যক্রম জোরদার করে। বলে রাখি, কৃষি বলতে এখানে শুধু ক্রপ এগ্রিকালচার বা মাঠ কৃষি যথা: শাক-সবজি, ধান, পাট ইত্যাদি নয়। কৃষি একটি সমষ্টিগত ধারণা, যার মধ্যে হাঁস-মুরগি বা পোলট্রি, গবাদিপশু বা লাইভস্টক এবং মৎস্য সম্পদ বা ফিসারিজও অন্তর্ভুক্ত। ব্র্যাক সবগুলো ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছে। কৃষিতে বাংলাদেশ আজ প্রায় স্বনির্ভর। উল্লিখিত বইয়ে দেখানো হয়েছে যে, স্বনির্ভরতা অর্জনে ব্র্যাকের কতটা কার্যকর ভূমিকা ছিল।

ব্র্যাকের অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু তা কখনও লিপিবদ্ধ করার কোনো প্রয়াস চালানো হয়নি। আমার কিছুটা হলেও অবদান সর্ম্পকে ধারণা ছিল। ২০১৭ সাল থেকে ভাবছিলাম ব্র্যাক ছেড়ে দেব এবং জীবনের বাকি সময়টা আমার দেখা ব্র্যাক নিয়ে লেখার চেষ্টা করব। স্বাস্থ্যক্ষেত্রের নানা বিষয়ে লেখার সৌভাগ্য হয়েছে, কিন্তু ব্র্যাকের বিশাল কাজের অভিজ্ঞতাগুলো তেমন লেখা হয়নি। আবেদ ভাই, আমিন ভাই, কানিজ আপা, সুখেন দা’র সঙ্গে কাজ করে ব্র্যাকের নানামুখী কাজ সর্ম্পকে সরাসরি জানার এবং দেখার সুযোগ ঘটেছিল, সৌভাগ্য হয়েছিল। মাহবুব ভাইয়ের (বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞ মাহবুব হোসেন) মৃত্যুর পর দুই বছর ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছি। ব্র্যাকের সমুদয় কাজের তদারকি করতে গিয়ে কিছু কিছু বিষয় দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়েছি। ব্র্যাক একটি ক্রমবর্ধমান সংস্থা। বেসরকারি সেক্টরে সবচাইতে বড়ো মানবসম্পদ নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠান। সারা বছরই ব্র্যাকের মানবসম্পদ বিভাগ নতুন নিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পুরনো কর্মী চলে যাবে নতুনের জন্য জায়গা করে দিয়ে, এই তো চিরাচরিত নিয়ম। ‘ইনস্টিটউশনাল মেমোরি’ বলে একটা কথা আছে। প্রতিষ্ঠানের বয়স ও পরিধি বাড়ার সঙ্গেসঙ্গে তার মেমোরি বেশি প্রয়োজন। এই মেমোরি সংরক্ষণের একটি কার্যকর উপায় হলো সমস্ত কাজের দলিল সংরক্ষণ বা ডকুমেন্টেশন।

ব্র্যাকের নানা বয়সি এবং লেভেলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম যে, আশির দশকে ব্র্যাকে যেসব কালজয়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কে খুব কমসংখ্যক কর্মীরই ধারণা আছে। বেশ একটা অপরাধবোধ জাগ্রত হলো। ভাবলাম, এটা আর বেশিদিন ফেলে রাখা যাবে না। যতুটুকু ক্ষমতা আছে তাই দিয়ে অন্তত কিছুটা দলিলবন্দি করার চেষ্টা করতে হবে। প্রথমেই ব্র্যাকের কৃষিক্ষেত্রে অবদানের বিষয় নিয়ে ভাবলাম। আমার জানা ছিল আশি ও নব্বইয়ের দশকে ব্র্যাক কী কী উদ্যোগ নিয়েছিল, যা এক পর্যায়ে চরম সফলতায় পর্যবসিত হয়।

২০১০ সালে আমিন ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়। বলা বাহুল্য আশি ও নব্বইয়ের দশকে সমুদয় কৃষিসংক্রান্ত কাজ আমিন ভাইয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত  হয়েছিল। আফসোস হলো যে, আমরা তাঁর মুখ থেকে সেগুলো জানতে পারলাম না। মনে পড়ল আরেক সহকর্মী এম এ ছালেকের কথা। ব্র্যাকের হাঁস-মুরগি বা পোলট্রিসহ অন্য কৃষি কার্যক্রমের এক দিকপাল এবং আমিন ভাইয়ের অত্যন্ত কাছের লোক। সে ছিল ব্র্যাক বাংলাদেশের এবং পরবর্তীতে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সকল কৃষি কার্যক্রমের প্রধান। তার সঙ্গেই কথা বললাম। ব্র্যাকের কৃষিসংক্রান্ত যাবতীয় কাজের একটি ডকুমেন্টশন তৈরি করে তা দিয়ে বই প্রকাশ করা হবে। ছালেক সঙ্গে সঙ্গেই সায় দিল। শুরু হলো আমাদের নতুন যাত্রা। প্রশ্ন উঠল কে সেটা লিখবে? ব্র্যাকের ভেতর থেকে এরকম একটা জ্ঞানগর্ভ কাজ করার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। বললাম, যদি কয়েকজন নামি কৃষি-বিজ্ঞানীকে এই কাজে আমন্ত্রণ জানানো যায়, তবে বইয়ের মান এবং তার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। ছালেক ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র। সে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করল। অল্প সময়ের মধ্যে চারজন বিজ্ঞানীর সম্মতি পাওয়া গেল। তারা হলেন: ফজলুল হক ভুইয়া (অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস (মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট), এস ডি চৌধুরী (অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) এবং মোহাম্মদ সাইফউদ্দীন শাহ (উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়)। দেশের বরেণ্য কৃষি অর্থনীতিবিদ মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগ করলাম। কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপনা শেষে তিনি ব্র্যাকের গবেষণা বিভাগে যোগদান করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে অনেক বছর কাজ করেছি। আবেদ ভাইয়ের ঢাকা কলেজের সতীর্র্থ, একজন অমায়িক ভদ্রলোক। তিনিও রাজি হয়ে গেলেন। ব্র্যাক সেন্টারে প্রথম সভায় সম্ভাব্য গবেষকবৃন্দ, মোয়াজ্জেম ভাই এবং ছালেকসহ আমরা বইয়ের বিষয়বস্তু, গবেষণা পদ্ধতি এবং আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলাম। গবেষক ও লেখকদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচয় হলো। তাদের কথা শুনে মনে হলো তারা গবেষকের দৃষ্টিতেই ব্র্যাকের নানা কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে তা লিপিবদ্ধ করবেন। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা হবে একটি প্রধান মানদ-। বইয়ের লেখকরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রথিতযশা একাডেমিক এবং সফল গবেষক। যে চারটি বিষয়ের ওপর গবেষণা হবে সেগুলো হলো: মাঠ কৃষি বা ক্রপ এগ্রিকালচার, হাঁস-মুরগি বা পোলট্রি, গবাদিপশু বা লাইভষ্টক এবং মৎস্য চাষ বা ফিশারিজ। দেশের বাইরে কৃষিক্ষেত্রে ব্র্যাকের পদচারণা অনেক বেড়েছে বিধায় এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি পরিচ্ছদে আলাদা করে লেখা হবে বলেও ঠিক করা হলো এবং ছালেককে ওই লেখার দায়িত্ব দেওয়া হলো।

গবেষকরা প্রায় বছর খানেক খেটে তাদের স্বীয় পরিচ্ছদের খসড়া তৈরি করলেন। পরিচ্ছদের খসড়া তৈরি করার সময় সংশ্লিষ্ট গবেষকরা ব্র্যাকের বর্তমান এবং সাবেক কর্মীদের কাছ থেকে কৃষি কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করলেন। এ ছাড়া সরকারি সেক্টরের অতীত এবং বর্তমানে কর্মরত ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বেসরকারি সংস্থা এবং কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত মিডিয়া ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকেও তাঁরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করলেন। এরপর ছালেক, মোয়াজ্জেম ভাই এবং আমার কাজ শুরু হলো। নিয়মমাফিক প্রতিটি পরিচ্ছদের ওপর আমাদের বিস্তারিত মন্তব্য লেখকদের কাছে ফেরত পাঠানো হলো। এভাবে বেশ কয়েকবার আদান-প্রদানের পর মোটামুটি একটা ভালো খসড়া তৈরি হলো। এরপর আমি শুরু করলাম চূড়ান্ত সম্পাদনা। এই সময় প্রায় এক মাস ছিলাম কানাডার টরেন্টোতে। ছুটির এই পুরো সময়টাই কাটিয়েছিলাম বিভিন্ন পরিচ্ছদগুলোর সম্পাদনার কাজে। কাজ শুরু করার পরপরই বুঝতে পারলাম এটা একটা দুরূহ কাজ। প্রথমত, কৃষি আমার বিষয় নয়। একজন জেনারেলিস্ট হিসেবে যতটুকু জানা দরকার ঠিক ততটুকুই জানি। দ্বিতীয়ত, গবেষকদের নিজস্ব একটি  স্টাইল রয়েছে। যদিও সকলের জন্য সাধারণ একটি ছক তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু প্রয়োজনে সেখানে অনেক ধরনের পরিস্ফূটন ও পরিবর্ধন করতে হয়েছিল। তৃতীয়ত, তথ্য এবং উপাত্তের ঘাটতি। গবেষকরা তাদের স্বীয় পরিচ্ছদের প্রয়োজনে অনেক ঐতিহাসিক তথ্যের সন্নিবেশ ঘটাতে গিয়ে মাঝে মাঝে বিফল মনোরথ হয়েছেন। ব্র্যাককর্মীদের মধ্যে যারা আশি ও নব্বইয়ের দশকে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা অনেকেই এখন ব্র্যাকে নেই। গবেষকরা অনেক চেষ্টা করেও কয়েকজনের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে সক্ষম হননি। চতুর্থত, ভাষার বিড়ম্বনা। বইটি ইংরেজিতে হবে তাই গবেষকরাও তাদের পরিচ্ছদগুলো সেভাবেই লিখেছিলেন। একজনের ভাষার মান এবং স্টাইল আরেকজনের চাইতে ভিন্ন। সম্পাদকের কাজ হলো এই ভিন্নতা কমিয়ে মোটামুটিভাবে একই পর্যায়ে এবং একই মানে নিয়ে আসা। এটা ছিল বড়ো ধরনের চ্যালেঞ্জ।

তারপরের কাজ হলো বইয়ের প্রকাশনা। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে, ইউনিভাসির্টি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) হবে আমাদের প্রথম পছন্দ। ইউপিএল-এর প্রধান নির্বাহী মাহরুখ মহিউদ্দীন রাজী হয়ে গেলেন। এ ধরনের কোনো বইয়ে প্রধান পরিচ্ছদগুলো ছাড়াও আরও কিছু পৃষ্ঠা সন্নিবেশিত থাকে।  মুখবন্ধ, উৎসর্গ, কৃতজ্ঞতা স্বীকার ইত্যাদি। ঠিক হলো বইটি উৎসর্গ করা হবে ব্র্যাকের কৃষিসংক্রান্ত কার্যক্রমের তিন নায়ককে। স্যার ফজলে হাসান আবেদ, আমিনুল আলম এবং মাহবুব হোসেন। ব্র্যাকের কৃষিবিষয়ক কার্যক্রমে তাঁরা তিনজন অনন্য অবদান রেখেছেন। এই বই তাঁদের অবদানের সামান্য স্বীকৃতি।

হিউ ব্রামার কৃষিবিজ্ঞান গবেষণায় বিশ্বের এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের কৃষি এবং মাটি সম্পর্কে তাঁর অন্তত দশটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সকলেই তাঁকে এক নামে চেনে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না। যোগাযোগ করলাম ইমেইলে। সঙ্গেসঙ্গে উত্তর দিলেন। ব্র্যাকের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার কথা জানালেন। আবেদ ভাইয়ের প্রতিও শ্রদ্ধা জানালেন। আমাদের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে জানালেন যে, মুখবন্ধ লেখার জন্য তিনি সঠিক বা সুযোগ্য ব্যক্তি নন। বরং অন্য দুয়েকজনের নাম সুপারিশ করলেন। আরও বললেন, আমাদের আপত্তি না থাকলে তিনি একটি আলাদা পরিচ্ছদ লিখতে আগ্রহী। আমার মনে হলো হিউ ব্রামার যদি স্বতন্ত্র একটি পরিচ্ছদ লেখেন তবে বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে বেড়ে যাবে। রাজি হয়ে গেলাম। উল্লিখিত বইয়ের শেষ পরিচ্ছদ তারই রচিত। ভাবলাম, চূড়ান্ত সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে কাজ করলে কেমন হয়? প্রস্তাব করায় তাতেও রাজি হলেন। আমি, মোয়াজ্জেম ভাই এবং ছালেকের সঙ্গে হিউ ব্রামার-এর নামও সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হলো। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে তাঁর সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি দেখা ও কথা হলো। থাকেন ব্রাইটন-এর কাছাকাছি হোভ শহরে। জানালেন, দেখা করতে লন্ডনেই আসবেন। চির কর্মঠ এই মনীষী ৯৩ বছর বয়সেও ভীষণ ব্যস্ত। ঠিক হলো কিংস ক্রস স্টেশনের সন্নিকটে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে দেখা হবে। সময়মতো গিয়ে দেখি তিনি আগে থেকেই সেখানে এসে বসে আছেন। কুশলাদি বিনিময় করলাম। দেশের অবস্থা, আবেদ ভাইয়ের অসুখ, আর্সেনিক সমস্যা ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কথা শুনে মনে হলো বাংলাদেশকে এখনও খুব মিস করেন। তারপর বই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। বললেন, এই কাজে জড়িত হতে পেরে  তিনি খুব খুশি। নিজের ব্যস্ততা নিয়েও বললেন। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ক্যান্টিনে একসঙ্গে মজার মধ্যাহ্নভোজ সেরে সেদিনকার মতো বিদায় নিয়েছিলাম। সেই সাক্ষাতের রেশ ছিল অনেকদিন।

কাজী বদরুদ্দোজা বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে এক কিংবদন্তীর নাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান। এই দেশে কৃষি গবেষণায় যাঁরা দিকপাল, তাদের সকলের গুরু কাজী বদরুদ্দোজা। সম্ভবত তিনি বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় ইমেরিটাস বিজ্ঞানী। ২০১২ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়। ৯৪ বছর বয়সেও তিনি বিজ্ঞান সাধনায় লিপ্ত। মোয়াজ্জেম ভাই এবং ছালেক তাঁর উত্তরার বাসায় গিয়ে দেখা করলেন। বিবরণ শুনে তিনি প্রকাশিতব্য বইয়ের মুখবন্ধ লেখার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেন।

এভাবেই এগিয়ে গেলাম বই প্রকাশনার কাজে। বাকি থাকল শুধু বইয়ের নামকরণ এবং প্রচ্ছদ। নামকরণে বেশ কিছু প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্র্যাকের পরিচালক মৌটুসী কবীরের দেওয়া নামই সকলের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হলো। সঙ্গে প্রচ্ছদটিও তৈরি করে দিলেন ব্র্যাকের আরেক নিবেদিত কর্মী সাজেদুর রহমান রোকন। পূর্বে প্রকাশিত কয়েকটি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে বইটি সম্পর্কে গুণীজনের মন্তব্য সন্নিবেশিত করেছিলাম। ভাবলাম, এখানেও তাই করা উচিত। রাজি হয়ে গেলেন চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তি-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ^বিদ্যালয়ের নরমেন আপহফ, বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন সচিব শামসুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রাক্তন কৃষি সচিব এ এম এম শওকত আলী এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। তাদের স্ব-স্ব বাণীতে সকলেই বইটির ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

বইটিতে মোট সাতটি প্রধান পরিচ্ছদ জুড়ে কৃষিক্ষেত্রে ব্র্যাকের অবদানের একটি ফিরিস্তি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আগেই বলেছি, সত্তর দশকের প্রথম থেকেই অর্থাৎ ব্র্যাক প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কৃষি উন্নয়নে বিশেষভাবে নজর দেয়। শাল্লা এলাকা হাওর বেষ্টিত। সেখানে শাক-সবজির তেমন প্রচলন ছিল না। স্থানীয়রা একমাত্র ফসল বোরো ধানের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল ছিল। আগাম বন্যা না হলে কৃষকের ঘরে আনন্দ আর খুশির জোয়ার বয়ে যেত। শাল্লাতে শাক-সবজি চাষের ওপর প্রথম থেকেই জোর দেওয়া হয়। কিছু বিদেশি সবজি যেমন: ব্রোকলি, লেটুস পাতাসহ বাঁধাকপি, গাজর, লালশাক ও টমেটো বীজ বিনামূল্যে দেওয়া হতো। মাছ চাষকেও করা হতো উৎসাহিত। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সবজি চাষের চিন্তাভাবনা মানিকগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। এখানে কিন্তু বীজ বিনামূল্যে দেওয়া হয়নি। সাব্বির আহমেদ চৌধুরী তখন তরুণ কর্মী (পরে ব্র্যাকের পরিচালক হয়েছিলেন)। অর্থনীতিতে মাস্টার্স শেষ করে ব্র্যাক মানিকগঞ্জে মাঠকর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার ওপর ব্র্যাকের ভূমিহীন সদস্যদের মাঝে সবজি বীজ বিক্রির দায়িত্ব পড়ল। বিদেশি সংস্থা ম্যানোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি বা এমসিসি-র সহায়তায় মানিকগঞ্জে ব্রোকলি, লেটুস পাতা, গাজর, বাঁধাকপি প্রভৃতির বীজ পাঠানো হলো। সাব্বির ভাইয়ের দায়িত্ব এগুলো সম্পর্কে প্রচার করে কম মূল্যে বিক্রি করা। ভূমিহীনদের এক সভায় তিনি বীজগুলো নিয়ে গেলেন। ‘বলাই’ নামে ভূমিহীনদের এক করিতকর্মা নেতা ছিল। সাব্বির ভাই ভাবলেন, বলাইকে দিয়েই শুরু করবেন বীজ বিক্রি। রাত দশটা অবধি সভা করে একটি বীজও বিক্রয় করা গেল না। তিনি ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন মানিকগঞ্জে ছিলেন ব্র্যাকের আরেক কর্মী জাহাঙ্গীর কবির। ভীষণ হাসিখুশি এবং খুব ভালো বক্তা। জাহাঙ্গীর ভাই অভয় দিয়ে বললেন, তিনিও সাব্বির ভাইয়ের সঙ্গে গ্রাম সভায় যাবেন। সভা শুরু হলো। সেখানে পুরুষ ও নারী সদস্যরা ছিলেন। জাহাঙ্গীর ভাই জিজ্ঞেস করলেন, গাজর খেলে কী হয়? নারীদের জন্য গাজর কী বেশি পুষ্টিকর? শাক-সবজির মাধ্যমে কীভাবে ভালো পুষ্টি পাওয়া যায়, তা-ই বর্ণনা করলেন। সেদিন দেখা গেল সাব্বির ভাই যতগুলো বীজ নিয়ে গিয়েছিলেন তার সিকিভাগ সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রয় হয়ে গেল। সেবার মানিকগঞ্জের কয়েকটি গ্রামে প্রচুর ব্রোকলির ফলন হয়েছিল। কিন্তু নতুন সমস্যা দেখা দিল। গ্রামের মানুষ কেউই ব্রোকলি খায় না, তাই তারা কেনেও না। চাষিদের মধ্যে হতাশা। নতুন আইডিয়া এলো। যোগাযোগ করা হলো ঢাকার তখনকার একমাত্র আর্ন্তজাতিক মানের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। তারা কিনতে রাজি হলো এবং এর মাধ্যমে কৃষকের ভাবনা আপাতত দূর করা গেল। ব্রোকলি এখনও বাংলাদেশে তেমন প্রচলিত সবজি নয়। সুধীরচন্দ্র নাথ। ব্র্যাকের কৃষি সংক্রান্ত কাজের আরেক দিকপাল। তার মতে ভালো বীজ এবং উপযুক্ত এক্সটেনশনের অভাবে এই পুষ্টিকর সবজি জনপ্রিয়তা পায়নি।

যাহোক এভাবেই শুরু হয়েছিল ব্র্যাকের কৃষিসংক্রান্ত নানা কর্মকাণ্ড, অনেকটা ট্রায়াল অ্যান্ড এরর ভিত্তিতে। আশির দশকের প্রথমদিকে ব্র্যাক মুরগিপালন তথা পোলট্রি কাজে বিশেষ নজর দেওয়া শুরু করে। বাংলাদেশে গত চার দশকে পোলট্রি ক্ষেত্রে যে বিপ্লব ঘটে গেছে, তাতে ব্র্যাকের বড়োসড়ো ভূমিকা ছিল। এক্ষেত্রে বিশেষ সমস্যা হিসেবে দেখা হতো মুরগির অত্যধিক মৃত্যুহার। সরকারি অফিসে তখন মুরগির ভ্যাকসিন প্রচুর পরিমাণে মজুদ ছিল, কিন্তু সেই ভ্যাকসিন থানা থেকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ব্র্যাক তখন পোলট্রিকর্মী হিসেবে কয়েকশ গ্রামীণ ভূমিহীন নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়, যাদের কাজ হলো থানা পর্যায়ের সরকারি অফিস থেকে ভ্যাকসিন নিয়ে সেগুলো কৃষকের মুরগিকে প্রয়োগ করা। খুব কঠিন কাজ নয়। কর্মীরা প্রতিটি ভ্যাকসিনের জন্য বিশ পয়সা করে সার্ভিস চার্জ নিত, যা এই দরিদ্র নারীদের আয়ের একটি অংশ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে পোলট্রি কর্মীদের ক্ষমতায়ন এবং সমাজে তাদের অবস্থানের উন্নতি হয়। কিন্তু একটি সমস্যা দেখা দিল। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা রক্ষায় কোল্ডচেন প্রয়োজন অর্থাৎ থানা পর্যায় থেকে কৃষকের ঘরে পৌঁছানো পর্যন্ত একে হিমশীতল করে রাখতে হবে। এটা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়? ব্র্যাক খুব দ্রুত একটি গবেষণা করে বের করল যে, ভ্যাকসিনের অ্যাম্পুল যদি পাকাকলার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা যায়, তবে এর মান চার-পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠিক থাকে। তা-ই করা হলো। ছোটো একটি আইডিয়া কিন্তু ক্ষুদ্র এই উদ্ভাবনীর সহায়তায় কত বড়ো সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে গেল! নতুন এই কৌশল প্রয়োগের ফলে মুরগির মৃত্যুহার শতকরা ৫০ থেকে ২৫-এ নেমে এলো। পরবর্তী সময়ে সাভারস্থিত বাংলাদেশ লাইভস্টক গবেষণা ইনস্টিটিউট এই উদ্ভাবনীর কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পায়।

আশির দশকেই বাংলাদেশে উন্নত জাতের মুরগির পালন শুরু হয়। ব্র্যাকও এর প্রচার-প্রসারে এগিয়ে আসে। ছোটো খামারিদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ব্র্যাক একদিনের মুরগির বাচ্চা খামারিদের জোগান দেওয়া শুরু করে। এই কার্যক্রম খুব দ্রুত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সম্প্রসারিত হয়। প্রথমদিকে মুরগির বাচ্চা সরবরাহ করত সরকার। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে এর চাহিদা বিপুলভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকারের একার পক্ষে তা সংকুলান করা সম্ভব ছিল না। ব্র্যাক কয়েক বছরের মধ্যেই ছয়টি বৃহৎ পোলট্রি ফার্ম স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে অবশ্য অনেক ব্যক্তি মালিকানাধীন ফার্ম তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রোটিন অপ্রতুলতা দূর করতে পোলট্রি শিল্প অনেক অবদান রেখেছে।

উন্নতমানের মুরগির খাবারের জোগান দেওয়া ছিল আরেকটি সমস্যা। এজন্য ব্র্যাক কয়েকটি বড়ো আকারের অত্যাধুনিক উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ফিড মিল স্থাপন করে। মুরগির খাবার উৎপাদনের একটি প্রধান উপাদান হলো ভুট্টা। তখন বাংলাদেশের ভুট্টার আবাদ হতো খুবই কম। আবার স্থানীয় জাতের ভুট্টা, যার উৎপাদন ছিল হাইব্রিড ভুট্টার তিনভাগের একভাগ। বাংলাদেশে হাইব্রিড ভুট্টা চাষের প্রচলন ছিল না বিধায় ব্র্যাক প্যাসিফিক সিড কোম্পানি অস্ট্রেলিয়া থেকে ১৯৯৪ সালে হাইব্রিড ভুট্টা বীজ এনে দেশে প্রচলনে মনোনিবেশ করে। বাংলাদেশে এখন ব্যাপকভাবে ভুট্টার চাষ হয় এবং বর্তমানে ভুট্টা বীজের সর্ববৃহৎ উৎপাদনকারী হলো ব্র্যাক। এভাবে পোলট্রি বিপ্লবে ব্র্যাক ভ্যালু চেন তৈরির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

পোলট্রি ক্ষেত্রে ব্র্যাক সরকারের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছে। বিদেশি প্রজাতির মোরগ-মুরগিপালনে আমাদের আবহাওয়া এবং সামাজিক অবস্থায় অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। বিদেশি প্রজাতির মুরগির মাংসের স্বাদ ভিন্নরকম হওয়ার কারণে ওই সময় সাধারণ মানুষ খুব বেশি পছন্দ করত না। তাই সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে ব্র্যাক একটি নতুন ধরনের জাত বা ভ্যারাইটি উদ্ভাবন করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘সোনালি’। বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে ‘পাকিস্তানি’ নামে যে মুরগি বিক্রি হয়, তা ‘সোনালি’ প্রজাতি।

ভ্যালু চেন আরও কয়েকটি ক্ষেত্রেও হয়েছে। দুগ্ধজাত পণ্য বা ডেইরির কথাই ধরা যাক। ব্র্যাক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা ভূমিহীন নারীদের ঋণ দেয়। এই ঋণ তারা নানা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে। দুগ্ধবতী গাভী পালনেও ছিল তাদের বেশ আগ্রহ ছিল। হাজার হাজার নারীকে ব্র্যাক এক্ষেত্রে ঋণ দিয়েছে। এই ঋণ থেকে বর্ধিত বা অনুকূল ফল পেতে দু ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। নারীরা তাদের গাভীর দুধের ন্যায্য মূল্য পেত না। স্থানীয়ভাবেই দুধ বিক্রি করতে হতো। সেখানে বিক্রয়মূল্য অনেক কম। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যেখানে ঢাকা শহরে দুধ বিক্রি হতো লিটার প্রতি পঞ্চাশ টাকা, সেই একই দুধ কৃষকেরা স্থানীয়ভাবে বিক্রি করত দশ থেকে পনেরো টাকায়। আরেকটি সমস্যা ছিল গাভীর উৎপাদনশীলতা। পশ্চিমা দেশের তুলনায় আমাদের দেশীয় গাভীর উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় এক-দশমাংশ। দুগ্ধ বা ডেইরিকে প্রকৃতভাবে লাভবান করতে গেলে এই জোড়া সমস্যার সুরাহা করতে হবে। প্রথমটা অর্থাৎ দুধের বিক্রয়মূল্য বাড়াতে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করল ‘আড়ং ডেইরি’। গাজীপুরে স্থাপিত হলো আধুনিক কারখানা বা ডেইরি প্ল্যান্ট। সঙ্গেসঙ্গে দেশের আনাচে-কানাচে স্থাপিত হলো দুগ্ধ খরিদ কেন্দ্র বা কালেকশন সেন্টার। এই কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে দুধ কিনে তা কুলিং ট্যাংক লরিতে করে নিয়ে আসা হতো গাজীপুরের প্ল্যান্টে। সেখানে দুধ জীবাণুমুক্ত এবং পাস্তুরিত করে প্যাকেটের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড়ো বড়ো শহরে বাজারজাত করা হয়। এই উদ্যোগের ফলে ছোটো খামারিরা তাদের দুধের বেশি দাম পায় এবং ব্র্যাকেরও কিছু মুনাফা থাকে। এই মুনাফা কৃষকদের নানা উন্নয়ন কাজে ব্যয়িত হয়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নিমিত্তে ব্র্যাক আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন (কৃত্রিম প্রজনন) কার্যক্রম শুরু করে। ভারত এবং অন্য দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ থেকে উন্নতমানের সিমেন বা বীজ বাংলাদেশ এনে তা দেশীয় গরুর মাধ্যমে উন্নততর প্রজাতি বা ব্রিড তৈরি শুরু করে। এরপর ব্র্যাক নিজেই বুলস্টেশন স্থাপন করে উন্নতজাতের সিমেন উৎপাদন ও বিতরণ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন অত্যন্ত জনপ্রিয় পদ্ধতি, যা সরকার এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করছে। দুগ্ধ উৎপাদন ক্ষেত্রে ব্র্যাকের নানা উদ্যোগ একদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে অন্যদিকে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতেও বিশেষ অবদান রাখছে। বিদেশি দুধের ওপর আমাদের নির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হচ্ছে।

মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ তৃতীয় স্থান দখল করে আছে। এখানেও ব্র্যাকের অবদান লক্ষণীয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত শাল্লা এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং সর্বস্ব হারানো মৎস্যজীবীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে ব্র্যাকের মৎস্য উন্নয়ন ক্ষেত্রে যাত্রা শুরু।

‘ফ্রম দ্যা গ্রাউন্ড আপ’ নামক বইয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে সরকারের পরেই ব্র্যাকের অবস্থান। প্রান্তিক মানুষকে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করা থেকে শুরু করে এর উন্নয়ন গবেষণার সকল ক্ষেত্রে ব্র্যাক অবদান রেখেছে। দেশে মিঠাপানির চিংড়ি ও তেলাপিয়া চাষের প্রসার এবং জনপ্রিয়তা ব্র্যাকের কাজের অন্যতম নিদর্শন।

মাঠ কৃষি বা ক্রপ এগ্রিকালচারের মাধ্যমেই কৃষিক্ষেত্রে ব্র্যাকের হাতেখড়ি, যা ইতিমধ্যেই আলোচিত হয়েছে। হাইব্রিড ভুট্টা চাষের কথাও এসেছে। ভুট্টা বীজ তৈরিতে ব্র্যাকের অবস্থান অগ্রগণ্য। নতুন নতুন বীজ উন্নয়নে ব্র্যাক অনেকগুলো গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে দেশি-বিদেশি গবেষকরা একসঙ্গে কাজ করে নতুন প্রজাতির চারা এবং বীজ তৈরি করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে  ধান, সবজি, ভুট্টা, সূর্যমুখী, অয়েলসিড প্রভৃতির বীজ উন্নয়ন এবং বাজারজাতকরণ করা হয়েছে, যার নাম প্রথমে ছিল ‘সুফলা বীজ’ এবং পরবর্তীতে ‘ব্র্যাক সিড’।

দেশে ‘টিস্যু কালচার’ পদ্ধতি প্রবর্তনেও ব্র্যাক অনন্য  ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমদিকে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে বীজ আলু বাজারজাত করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, কারণ এ প্রযুক্তি তখন অনেকের কাছে নতুন ছিল। এর পূর্বে ভিত্তি বীজ মূলত নেদারল্যান্ড থেকে আমদানি করা হতো। কিন্তু টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে বীজ আলু উৎপাদনের ফলে বিদেশ থেকে ভিত্তি বীজ আমদানি অনেকাংশে কমে যায়, এতে উৎপাদনও বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশ নির্ভরতা কমে আসে। বর্তমানে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত প্ল্যান্টলেট থেকে বীজ আলু করে আসছে। এখন টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত আলুর বীজ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।

 

 

কৃষিক্ষেত্রে ব্র্যাকের অভিজ্ঞতা দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আফগানিস্তান, উগান্ডা, তানজানিয়া, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান, লাইবেরিয়াসহ অনেক দেশে কৃষি এখন একটি বিশেষ কার্যক্রম যা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ’ বা ‘বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার’-কে বলা হয় খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রের নোবেল প্রাইজ। ১৯৭০ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী হয়েছিলেন নরমেন বোরলগ। তিনি তাঁর পুরস্কারের সমুদয় অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ’। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতি বছর খাদ্য নিরাপত্তাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ২০১৫ সালে এই পুরস্কার দেওয়া হয় ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে। এটা ছিল ব্র্যাকের কৃষি এবং খাদ্যক্ষেত্রে অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। মনে পড়ে ২০০৩ সালে ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ’ প্রদান উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সেমিনারে আমি বক্তব্য রেখেছিলাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ডে মোন শহরে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ-এর প্রধান কার্যালয়ে সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল। তখন আমেরিকায় ব্র্যাকের নাম খুব বেশি পরিচিত ছিল না। ওই  সেমিনারে আমি ব্র্যাকের কৃষি এবং পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির নানাদিক বর্ণনা করেছিলাম। ২০১৫ সালে আবেদ ভাইয়ের পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমার সেই বক্তব্য সামান্যতম ট্রিগার ছিল কিনা তা বলতে পারব না। নরমেন বোরলগ সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে স্বীকৃত। সেই সময় বোরলগের সঙ্গে আমার দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছিল।

‘ফ্রম দ্যা গ্রাউন্ড আপ’ বইটি ব্র্যাকের বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস তুলে ধরার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। জানি, ব্র্যাকের কাজের পরিধি এবং প্রভাব এতই বিশাল যে একটি বইয়ে তা ধারণ করে রাখা নিতান্তই বাতুলতা।

 

কৃতজ্ঞতা : এম এ ছালেক, সুধীরচন্দ্র নাথ এবং সাব্বির আহমেদ চৌধুরী

সম্পাদনা : তাজনীন সুলতানা

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments