১৬ লক্ষ চশমা!

September 16, 2020

রিডিং গ্লাস বা চশমাকে দারিদ্র্য বিমোচনের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে- এই ভাবনার বিষয়ে জানার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে এলো বাংলাদেশে কর্মরত ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকাদের কথা। মনে পড়ল আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের হাজার হাজার কারিগরদের কথা। জানতাম, চোখে কম দেখার কারণে অনেকেই সূক্ষ্ম কাজ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েন। এর ফলে অনেকের রোজগার কমে যেত, এমনকি কেউ কেউ কাজও হারিয়েছেন। চোখের ডাক্তার দেখানো হয়তো অনেকের সাধ্যের অতীত, তাই তাদের কাছে একটি সমাধান পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।

২০০৪ সালের কথা। আমি তখন নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করছি। একদিন চিঠি পেলাম কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স বা সিএফআর থেকে। তাদের নিউইয়র্কের অফিসে হেলথ অন্ট্রাপ্রেনারশিপ নিয়ে একটি সভায় আমাকে ব্র্যাক সম্পর্কে উপস্থাপনা করতে বলা হলো।

সিএফআর থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে বেশ গর্বিত ও উৎফুল হয়েছিলাম। নির্ধারিত দিনে দুপুর সাড়ে তিনটের দিকে পৌঁছলাম সিএফআর এর কার্যালয়ে। জর্ডন কাসালো আমাকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে গেলেন সভাকক্ষে। বেশ বড় কক্ষ, পঞ্চাশটির মতো চেয়ার গোলটেবিল ঘিরে বৃত্তাকারে সাজানো। আমার সঙ্গে আরও দুজন বক্তা। আমি ব্র্যাক সম্পর্কে বললাম, জানালাম কীভাবে এর কার্যক্রম কোটি কোটি মানুষের দ্বারে পৌঁছেছে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। তখন আফগানিস্তানে আমাদের কার্যক্রম কেবল শুরু হয়েছে, তাও বললাম। বক্তব্যের শেষে ব্র্যাকের ওপর নির্মিত ১৫ মিনিটের একটি ভিডিও দেখালাম। সেসময় মনে হচ্ছিল, অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিএফআর-এর সদস্যদের ব্র্যাক সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। আর আজ সারাবিশ্বে ব্র্যাক শুধু একটি নাম নয়, এটি দর্শনের সফল রূপান্তর এবং সার্থক বাস্তবায়ন।

সেদিনের পর জর্ডন কাসালোর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। জানলাম, স্কজো ফাউন্ডেশন পৃথিবীর কয়েকটি দেশ যেমন ভারত এবং এল-সালভেডরে নামমাত্র মূল্যে চশমা বিতরণ করছে। বয়স ৩৫-৪০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ‘প্রেসবায়োপিয়া’-র কারণে বেশিরভাগ মানুষ কাছের জিনিস অস্পষ্ট দেখতে শুরু করে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৫২ কোটি লোক চোখের এই সমস্যায় আক্রান্ত। ‘প্রেসবায়োপিয়া’-র কারণে পৃথিবী জুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি বছরে আনুমানিক ২০ হাজার কোটি ডলার। এই সমস্যার সহজ, নিরাপদ এবং ব্যয়সাশ্রয়ী সমাধান হলো চশমা বা রিডিং গ্লাসের ব্যবহার।

জর্ডন এবং তার ফাউন্ডেশন ভাবছিল কীভাবে রিডিং গ্লাস বা চশমাকে দারিদ্র্য বিমোচনের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে এলো বাংলাদেশে কর্মরত ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকাদের কথা। মনে পড়ল আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের হাজার হাজার কারিগরদের কথা। জানতাম, চোখে কম দেখার কারণে অনেকেই সূক্ষ্ম কাজ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েন। এর ফলে অনেকের রোজগার কমে যেত, এমনকি কেউ কেউ কাজও হারিয়েছেন। চোখের ডাক্তার দেখানো হয়তো অনেকের সাধ্যের অতীত।

উন্নত দেশগুলোতে একজন অপটোমেট্রিস্ট চোখ পরীক্ষা করে চশমা দেন আর অপথালমোলজিস্ট (চোখের ডাক্তার) চোখের জটিল সমস্যা দেখা দিলে তার চিকিৎসা করেন এবং প্রয়োজনে অপারেশনও করে থাকেন।

২০০৪ সালের শেষদিকে নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথ প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু রিডিং গ্লাসের কথা ভুলে যাইনি। বন্ধু ফারুক আহমেদ ছিলেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির পরিচালক। এ ব্যাপারে আগেই আলাপ হয়েছিল। ফিরে এসে আমি আবারও বিষয়টি তাঁর নজরে আনলাম। একইসঙ্গে উপ-নির্বাহী পরিচালক সালেহউদ্দীন আহমেদ এবং আমিনুল আলমের সঙ্গেও কথা হলো। আবেদ ভাই রিডিং গ্লাসের কথা আগ্রহ নিয়ে শুনলেন এবং রাজী হয়ে গেলেন। বললেন, ‘একটি পাইলট করে দেখো আমাদের সেবিকারা এই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারে কিনা।’

জর্ডনের সঙ্গে যোগাযোগ করার কিছুদিনের মধ্যেই স্কজো ফাউন্ডেশনের নির্বাহী, নীল ব্লুমেনথাল (Neil Blumenthal) ঢাকায় এলেন। সিদ্ধান্ত হলো, পাইলটটি ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কার্যক্রমের অধীনে পরিচালিত হবে এবং এর মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বে থাকবেন জ্যৈষ্ঠ ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম (পরবর্তীতে লাইবেরিয়ায় ব্র্যাকের দেশীয় প্রতিনিধি এবং কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রকল্পের প্রধান)।

সালামের নেতৃত্বে রিডিং গ্লাস পাইলট প্রকল্প যাত্রা শুরু করল। প্রথমে নরসিংদীর মাধবদীতে পাইলট শুরু হয় ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। প্রথম পাইলট মাধবদীতে করার উদ্দেশ্য ছিল, এখানে ঘরে ঘরে রয়েছে শত শত তাঁতকর্মী। মাত্র এগারোজন স্বাস্থ্যসেবিকা এবং দুজন তদারক কর্মী নিয়ে প্রথম প্রশিক্ষণ শুরু হয়। দেখা গেল যে, স্বাস্থ্যসেবিকারা বেশ সহজেই গ্রামের লোকদের চোখ পরীক্ষা করছেন এবং সঠিক চশমা দিচ্ছেন। প্রশিক্ষণের স্বল্প দিনের মধ্যেই একশ চশমার সবগুলোই বিক্রি হয়ে যায়!

আমরা ভাবলাম আরেকটি পাইলটের কথা। ঠিক হলো মানিকগঞ্জে এটা পরিচালিত হবে। এখানেও অনুরূপ সাফল্য পেলাম। পরবর্তীতে বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা তৈরির জন্য আমরা লেগে গেলাম। ঠিক হলো চীন থেকে ৬ হাজার চশমা নিয়ে আসা হবে। বর্তমানে মিরপুরে একটি চশমা তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়েছে, যার ফলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্বাস করে, যেকোনো কার্যক্রম যদি কার্যকর হয় তবে তা যেন সকলের কাছে পৌঁছে। গত কয়েক বছরে রিডিং গ্লাস প্রকল্প দেশের ৬১টি জেলায় বিস্তৃতি লাভ করেছে, যার মাধ্যমে ২৫ হাজারেরও বেশি স্বাস্থ্যসেবিকা গ্রামাঞ্চলে চক্ষু পরীক্ষা এবং চশমা বিতরণ করে চলেছেন। চক্ষু পরীক্ষায় প্রেসবায়োপিয়া ধরা পড়লে চশমা দেওয়া হয়, কিন্তু অন্য সমস্যা হলে তাকে চোখের ডাক্তারের কাছে রেফার করা হয়। প্রায় ৮০ লক্ষ লোকের চক্ষু পরীক্ষা করে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লক্ষ জোড়া চশমা বিতরণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি একটি গবেষণায় এই প্রকল্পের প্রভাব নির্ণয় করা হয়। দেখা গেছে, চশমা ব্যবহারকারীদের আয় যারা চশমা ব্যবহার করছেন না তাদের আয়ের চাইতে শতকরা ২৩ ভাগ বেশি। চশমা ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি সাধিত হয়েছে।

২০০৮ সালে স্কজো ফাউন্ডেশনের নাম পরিবর্তন করে হয়েছে ‘ভিশন স্প্রিং’। সম্প্রতি জর্ডন কাসালো তার সংস্থার বোর্ড সদস্যদের নিয়ে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। গত ৪ঠা মার্চ, সফরের শেষদিন ছিল সমাপনী অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে জানানো হয় যে, ‘ভিশন স্প্রিং’-এর সহায়তায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে রিডিং গ্লাস প্রকল্প শুরু হয়েছে, যা শিল্পোদ্যোক্তারাই পরিচালনা করবেন। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ পোশাক শ্রমিক চক্ষু পরীক্ষার সুযোগ পাবেন। আর ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকা চালিত প্রকল্প তো চলবেই। এছাড়াও সম্প্রতি ব্র্যাকের এই কার্যক্রম আফ্রিকার উগান্ডাতে সম্প্রসারিত হয়েছে।

রিডিং গ্লাসকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর সাফল্যে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটি জর্ডন ও আমাকে ‘ইনোভেটর অব দি ইয়ার‘ পুরস্কারে ভূষিত করে। আজ মনে হয় যে, ব্র্যাকের এই প্রকল্প বাংলাদেশের কয়েক লাখ কর্মজীবী মানুষকে দেখিয়েছে নতুন আশার আলো। সেই পরিতৃপ্তিই তো আমার জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার।

 

সংক্ষিপ্ত লেখাটির পূর্ণ সংস্করণ পড়তে ক্লিক করুন

সম্পাদনা: তাজনীন সুলতানা

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments