হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি!

April 8, 2019

যে ছেলেটি সকালে স্কুলে যায় আর বিকেলে দোকানে কাজ করে, একবার তার জায়গায় নিজেকে চিন্তা করে দেখুন। তখন বুঝবেন আপনি কত ভালো আছেন।

আমাদের অনেকের জীবনের বড়ো একটি অংশ দখল করে আছে হতাশা। বাংলাদেশে, বিশেষ করে শিক্ষিত শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। দেশ নিয়ে হতাশা, প্রেম নিয়ে হতাশা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা, ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এই যে আপনি শহুরে মানুষ, জীবনের পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেব মেলাতে মেলাতে হতাশায় ডুবে যাচ্ছেন, আপনি কি জানেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ১২.৯% মানুষ অতিদরিদ্র। তারা তাদের সারাদিনের আয়ের পুরোটা খরচ করেও পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে পারে না। আমি একবার প্রবল বৃষ্টির সময় প্রত্যন্ত গ্রামে ছোট্ট টিনের ঘরে একটা পরিবারের সঙ্গে খানিক সময় কাটিয়েছিলাম। এক কক্ষের সেই ঘরের চালের ফুঁটো দিয়ে অবিরাম বৃষ্টির পানি ঢুকছিল। আমরা প্রত্যেকে কাকভেজা হয়ে গিয়েছিলাম। তখন যদি সেই বাড়িতে থাকতেন তাহলে উপলব্ধি করতে পারতেন, আপনি সেই পরিবারটির চাইতে কত গুণ বেশি সৌভাগ্যবান।

আপনি হয়তো শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আপনার জীবনের নানা ভোগান্তির কথা স্মরণ করে দেশ ও সরকারকে দোষারোপ করছেন। আপনি কি জানেন, আমাদের উপকূলে অসংখ্য মানুষ লবণাক্ত পান করে বেঁচে আছেন? সেখানকার সকল পানির উৎস লবণাক্ত হয়ে গেছে। এই পানি পান করার জন্য তারা নানা রোগে ভুগছে। একটি ঘটনা বলি, কোনো এক বেসরকারি সংস্থা সূর্যালোক ব্যবহার করে সুপেয় পানি উৎপন্ন করার প্রযুক্তি নিয়ে উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়েছিল। দামের দিক থেকে প্রযুক্তিটি ছিল সস্তা। কিন্তু সেই এলাকার মানুষ তা গ্রহণ করেনি। কেন জানেন? সুপেয় পানির স্বাদ তাদের ভালো লাগেনি। তারা লবণাক্ত পানি খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল! অথচ আপনার-আমার গোসলখানায় অবিরাম ধারায় পানির অপচয় হচ্ছে। আচ্ছা বলুন তো আপনি বছরে কতগুলো মিনারেল ওয়াটারের বোতল খুলে দু-এক চুমুক পানি পান করে তা ফেলে দেন? ইংরেজিতে Tragedy of Commons বলে একটি টার্ম চালু আছে। আমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন যারা তাদের নিজেদের আরামআয়েশ বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় করেন, ফলে প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্যরা বঞ্চিত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাকেই Tragedy of Commons বলে। পানির অপচয় করে, রান্নাঘরের চুলা অপ্রয়োজনে জ্বালিয়ে রেখে বা খাবার নষ্ট করে আপনি হয়তো সেই কাজটিই করছেন।  দেশের সম্পদ রক্ষায়, অন্যদের জন্য সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার বুঝি কোনো দায় নেই?

যে ছেলেটি সকালে স্কুলে যায় আর বিকেলে দোকানে কাজ করে, একবার তার জায়গায় নিজেকে চিন্তা করে দেখুন। তখন বুঝবেন আপনি কত ভালো আছেন। বস্তিবাসী যে মা তার শিশু সন্তানকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে ইট ভাঙতে যায় সেই শিশুটির কথা ভাবুন। দেখবেন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি যে দুশ্চিন্তার পাহাড় গড়েছেন, তার বোঝা অনেকটাই কমে যাবে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আপনি হতাশার গহীন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছেন? কত প্রেমের বিয়ে অশান্তিতে শেষ হচ্ছে। প্রেম করতে অস্বীকার করা কত মেয়ে অ্যাসিডদগ্ধ হচ্ছে। আপনি কি তাদের চাইতে সৌভাগ্যবান নন?

ময়মনসিংহের দারিদ্র্যপীড়িত প্রত্যন্ত এলাকা কলসিন্দুর এলাকার স্কুলপড়ুয়া কিশোরী ফুটবল দলের যে মেয়েগুলো দেশের প্রথম বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট জিতেছিল সেই মেয়েদের জন্য কিছু করার ইচ্ছে নিয়ে একদল মানুষ তাদের বলেছিল, তারা কী উপহার চায়? প্রত্যন্ত গ্রামের সেই দরিদ্র কিশোরীরা কী বলেছিল জানেন? বলেছিল, তারা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একবেলা পেটপুরে ভাত খেতে চায়! সেই অনাহারে থাকা, খেলাধুলোর চর্চা করার সুযোগবঞ্চিত মেয়েরাই দেশের জন্য একের পর এক জয় এনে দিয়েছে। অথচ আপনার মেয়েটিকে আপনি নিরাপত্তার নামে ঘরের ভেতর আটকে রাখতে চান। তাকে পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখতে চান।

হ্যাঁ, আপনাকে তাই বলছি। নিজের চার দেয়ালের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসুন। একটু অন্য মানুষের কাতারে দাঁড়ান। তাদের সুখ-দুঃখগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। দেখবেন আপনি অনেক ভালো থাকবেন। অন্যের জীবন সংগ্রামকে উপলব্ধি করুন। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে যারা এগিয়ে চলেছেন তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিন। আমরা অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনায় হাহাকার তুলি। কিন্ত অ্যাসিড সারভাইভার যে মেয়েটি সব বাধাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছেন তার গল্প হয়তো জানি না। যে দলিত শিশুটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, যে প্রতিবন্ধী ছেলেটি আজ চাকরি করছেন তাদের গল্পগুলো পড়ুন। মনে রাখবেন Life is really about the journey, not the destination.

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of