সড়ক? না কি মৃত্যুফাঁদ?

August 2, 2018

সাধারণত একটি বাসে যখন দুর্ঘটনা ঘটে, মালিক তখন তার ব্যবসায়ের স্বার্থেই মানবতাকে পায়ে দলে চালক ও সহকর্মীদের পক্ষ নেন। অনেক সময় টাকা ও প্রভাবের কাছে আইনের শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। তা দেখে অন্যরাও একই ধরনের অপরাধ ঘটানোর দুঃসাহস পায়। এ অবস্থা থেকে  বেরিয়ে আসার উপায় কী?

প্রাণের শহর ঢাকা! মাত্র ৩০৬ বর্গকিলোমিটারের এই নগরে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বাস।  এদেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ ও শহুরে মানুষের ৩৬ শতাংশ এইটুকু জায়গায় বসবাস করে।

সময়মতো নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। এখানে আধাঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেতে পারে। সিএনজি অটোরিকশার চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া চায়, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

বাসে চড়ে যাওয়া এক বিভীষিকা। আসন সংখ্যার চাইতে দ্বিগুণ লোক নিয়ে বাসগুলো চলে। ধাক্কাধাক্কি করে বাসে ওঠা এবং স্টপেজে ঠিকমতো নেমে যাওয়া সম্ভব হবে কি না সেকথা ভাবলেও ভয় লাগে। ব্যস্ত রাস্তায় বড়ো বড়ো গাড়ির ভিড়ে রিকশায় চলাচল করাই দায়।

হেঁটে যাবেন খানিকটা পথ তাতেও শান্তিমতো চলার উপায় নেই। ফুটপাতের ওপর দিয়ে সাঁইসাঁই করে চলে যায় মোটরসাইকেল। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে। রিকশা, বাস, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা সবাই রাস্তার রাজা। এইসব ঝক্কিঝামেলা সামলে দিন শেষে নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে কি না সে এক লাখ টাকার প্রশ্ন!

গত ২৯শে জুলাই রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে আবদুল্লাহপুর থেকে মোহাম্মদপুর রুটে চলাচলকারী জাবালে নূর পরিবহন লিমিটেডের একটি বাস সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ও একই কলেজের ছাত্রী দিয়া খানম নিহত হয়। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরবে বলে তারা রাস্তার কিনারে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিল। শিক্ষার্থী দুজনের তো কোনো ভুল ছিল না। শুধু কে কার আগে যাবে বাসচালকদের  এই প্রতিযোগিতার মর্মান্তিক বলি হতে হবে তাদের! এই করুণ মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা, আমাদের সন্তানরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। শিশুদের গণআন্দোলনের জোয়ারে ঢাকা ছিল অচল।  আজ সবাই এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়।

সড়ক কেন হবে মৃত্যুফাঁদ? সড়কের বুকে চলতে থাকা বেপরোয়া যান কেন নিমেষেই কেড়ে নেবে প্রাণ? এর প্রধান কারণ হলো পরিবহন ব্যবস্থাপনার নানারকম অরাজকতা। এদেশে বাসচালকদের অনেকেই বৈধ লাইসেন্সধারী নয়। তাদের অনেকেই কোনোরকমে গাড়ি চালাতে জানে, অনেক সময় বাসের হেলপার বসে যায় চালকের আসনে। আইনকানুন না জেনেই গাড়ি চালায়। সড়ক নিরাপত্তার কোনো প্রশিক্ষণ নেই তাদের । আবার অনেকে মাদকাসক্ত। এ ছাড়াও  ট্রাফিক আইন অমান্য করা, ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, রাস্তার উল্টোপথে চলা, ওভারটেক করা, বেশি ট্রিপ দেওয়ার প্রতিযোগিতা- এসব অব্যবস্থা আর নৈরাজ্য তো আছেই। এসব কারণেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রাণহানি ঘটছে। তা নিয়ে চালকদের বিশেষ ভ্রƒক্ষেপ নেই। কারণ তারা জানে, আইনের ফাঁকফোকর গলে ঠিকই তারা বেরিয়ে যেতে পারবে। হয়তো হৈচৈ হবে। সংবাদমাধ্যমে খবর ছাপা হবে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও আসবে খবর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানা প্রতিক্রিয়া এবং মতামত প্রকাশিত হবে। এই বৈরী সময়টাতে গা-ঢাকা দিয়ে থাকলেই হলো। কয়েকদিন পরেই ব্যস্ত ঢাকাশহরে আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হয়ে যাবে। তারপর ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের সঙ্গে কিছু টাকা দিয়ে আপোস করে নেওয়ার চেষ্টা চলবে।

সাধারণত একটি বাসে যখন দুর্ঘটনা ঘটে, মালিক তখন তার ব্যবসায়ের স্বার্থেই মানবতাকে পায়ে দলে চালক ও সহকর্মীদের পক্ষ নেন। অনেক সময় টাকা ও প্রভাবের কাছে আইনের শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। তা দেখে অন্যরাও একই ধরনের অপরাধ ঘটানোর দুঃসাহস পায়। এ অবস্থা থেকে  বেরিয়ে আসার উপায় কী? আমরা নিচের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে পারি-

  • প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাইসেন্সধারী গাড়িচালক নিয়োগ।
  • দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার নির্মাণ।
  • স্পিড মনিটর ও ক্যামেরার ব্যবহার চালু করা।
  • আলাদা বাস লেনের ব্যবস্থা করা।
  • সহজে সনাক্তকরণের জন্য বাসচালকদের জন্য নির্দিষ্ট ইউনিফর্মের ব্যবহার।
  • বাসের পেছনে চালকের নাম-ঠিকানা লিখে রাখা।
  • ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে মান্য করা।
  • সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা, এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা এবং এর নিষ্পত্তির সংখ্যা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোর দায়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন বাতিলের সংখ্যাসম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

আমি চোখ বুজে কল্পনা করি, মসৃণ পিচঢালা পথে সার বেঁধে চলছে গাড়ি। রাস্তায় রংচটা, গ্লাস ভাঙা, হেডলাইট ও লুকিং গ্লাসহীন গাড়ি নেই একটিও। প্রশিক্ষিত গাড়িচালক নিয়ম মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন। নেই ওভারটেক, আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। সংবাদপত্রে মাসের পর মাস ছাপা হয় না একটিও সড়ক দুর্ঘটনার খবর- এটাই আমার স্বপ্নের ঢাকা, আমার প্রিয় দেশের চিত্র কি এরকম হতে পারে না? পরিবহন খাতের সকল অব্যবস্থাপনার আমরা অবসান চাই। সকলের সদিচ্ছা নিশ্চয় এই কল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে পারে।