সড়কপথঃ মৃত্যুর নেমপ্লেট

May 10, 2018

এই দুর্বিষহ জীবন থেকে নিজেদের বাঁচাতে প্রয়োজন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ। এই মৃত্যুফাঁদ নিয়ে আমরা যে প্রতিবাদগুলো করছি তা শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেই আটকে আছে। এর প্রতিকার সড়কেই হতে হবে, অন্য কোথাও সম্ভব নয়।

রাজীবের কাটা হাতের আঙুল হয়তো আগামীতে নির্বাচিত করত কোনো সৎ, নির্ভীক জনপ্রতিনিধি। অথবা পরিশ্রমী এই হাতে ভরসা রাখতে পারত আমাদের সমাজ। তেমনি রোজিনার কেঁটে যাওয়া পা আমাদের হাঁটতে শেখাতো বহুদূর। কিন্তু এসবই আজ অতীত। এক অর্থে বর্তমান।

রাজীব, রোজিনার মতো আমাদের সমাজে যারা পরিশ্রম করে বেঁচে থাকতে শেখে, যাদের হাত চললেই কেবল পেট চলে, সেই মানুষগুলোর জীবনের নিশ্চয়তা কি দিতে পারছে বর্তমান সময়? নিশ্চয়তা দিতে পারছে কি আমাদের সড়কগুলো? সড়কে এই যে মৃত্যুর মিছিল, কবে হবে এই মিছিলের শেষ? শুধু গত এপ্রিলেই এই সড়কে চিৎকার করে বাঁচতে চেয়েছে রোজিনা আক্তার, খালিদ হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, রুনি আক্তার, আয়েশা খাতুন কিংবা রাজীব হোসেন। সড়ক সবাইকে ঘরে ফিরতে দেয়নি।

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল খুব কি বেশি সময়? মাত্র ৪টি মাস। অথচ একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ৪ মাসেই সড়কপথে মৃত্যুর সংখ্যা ২ হাজার ১২৩।  এই সময়ের আগে কি তারা জানতো সড়কেই তাদের মৃত্যুফাঁদ? কি নামে বিশেষায়িত করা যায় এই মৃত্যুকে? অপঘাতে মৃত্যু, নিছক দুর্ঘটনা নাকি রক্তাক্ত খুন?  লাশ হয়ে তাঁরা ফিরেছেন স্বজনদের কাছে। এ সময়ে দুর্ঘটনাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আগের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনের এই তথ্যটি অবশ্যই আমাদের আতঙ্কিত করে। সড়কে মৃত্যুর শঙ্কা জাগায়।

সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যে আলোড়ন, তার মূল কারণ হচ্ছে রাজধানীকেন্দ্রিক সড়ক অব্যবস্থাপনা। ঢাকা শহরের সড়কে মৃত্যুর যে আহাজারিতা, তা বেড়ে যাওয়ার ফলেই অনেকের টনক নড়ছে। অথচ দেশজুড়ে এই সড়ক মৃত্যু আজ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, যা কিনা রাজধানী থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। পথচারীর এই করুণ মৃত্যুর জন্য দায়ী কারা সেটা নিয়ে মত বিরোধ থাকতেই পারে কিন্তু সড়কে এই রক্তস্রোত আমরা থামাতেই পারছিনা, ক্রমশ বেড়েই চলেছে সে পথে চলা পথিক।

দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো, সচেতনতার অভাব, নিয়ম না মানার প্রবণতা অথবা চালকের ব্যর্থতা, এই কারণগুলোই আমাদের মৃত্যুফাঁদে পতিত করছে প্রতিনিয়ত। উল্লেখিত কারণগুলোর কোনটিই এককভাবে দায়ী নয়। প্রতিটি ঘটনার যোগফলই এই চলমান দুর্ঘটনা। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়াটা জরুরি আর এই সচেতনতা অনেক সময় অসচেতনায় রূপ নেয় দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে। এই ব্যবস্থাপনা যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয় তাহলে জনসাধারণ নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষগুলো যখন অনিয়ম করে রাস্তা পারাপার হবেন তখন সাধারণ মানুষ অবশ্যই সে সুযোগটি নেবে। রাজধানীর ওভারব্রিজগুলো তখন ফাঁকা হতে থাকে, দখলে চলে যায় হকারসহ অন্যান্য অনেকের নিয়ন্ত্রণে। সে সময় ইচ্ছা থাকলেও মানুষজন ওভারব্রিজ এড়িয়ে চলে। একদিকে যেমন ওভারব্রিজগুলো ব্যবহারের অযোগ্য, অপরদিকে ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে নিচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। যত্রতত্র গাড়ী থামাচ্ছে, যাত্রী তুলছে রাস্তার মাঝপথে চলন্ত অবস্থায়। সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। আবার আইন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলে বেড়িয়ে যাচ্ছে অন্যায়কারী। লাইসেন্সবিহীন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি সহজেই ছাড় পেয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী কাউকে একটি ফোন করলেই। এছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে যারা গাড়ি চালাচ্ছেন তারা লাইসেন্সবিহীন থাকলেও ফিস হিসাবে মাত্র পাঁচশ টাকা জরিমানা দিয়ে ঝামেলা এড়াচ্ছেন, এসবই দুর্বল ব্যবস্থাপনার উদাহারণ।

সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে যথাসম্ভব সমাধানে আসতে হবে। এই সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে পথচারীর মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকবে। এখানে একতরফাভাবে চালককে দোষারোপ করা হবে ভুল। চালক সুযোগ পেয়ে অন্যায় করছে, তাকে এই অন্যায় সুযোগ থেকে বাইরে রাখতে আইন হতে হবে কঠোর এবং তার বাস্তবায়ন হতে হবে নিশ্চিত। রাজধানীর অনেক রুটে যে ছোটো ছোটো টেম্পো বা লেগুনা পরিবহনগুলো নিয়মিত চলছে তার শ্রমিকদের অনেকের বয়স আঠারোই পেরোইনি। এই অনিয়ম নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি এটা মনে রাখা জরুরী এই চালকগুলোর জীবনমান বা জীবনযাত্রা কি রকম কিংবা কতটুক নিয়ন্ত্রিত। এটা খুবই দুঃখজনক যে একজন বাস চালককে গাড়ি চালাতে হয় দিনে ১৫ ঘণ্টারও বেশি। তার প্রাত্যহিক জীবনে কোন বিনোদনের ব্যবস্থা আছে কি, থাকলে তা কতটুকু? কিংবা কোনো নিয়মিত প্রশিক্ষণ? দিন শেষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্রিপ না হলে তার এবং সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর পেট চালানো দায়, আর সে যেই গাড়িটি চালাচ্ছে সেটি এই সড়কে চলাচলের কতটা যোগ্য সেটাও ভাবতে হবে। শহরে প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে নতুন গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, ফলে যানজট বাড়ার সাথে সাথে চালকদের ট্রিপের সংখ্যাও কমছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চালকেরা হয়ে উঠছে নিয়ন্ত্রণহীন এবং বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা।

আমাদের রাজধানী ঢাকা বায়ু দূষণের দিকে থেকে বিশ্বে এখন তৃতীয় অবস্থানে আছে । এই দূষণের মধ্য দিয়ে যে মানুষগুলো ঘন্টার পর ঘন্টা প্রতিনিয়ত তাদের জীবন পার করছে হোক সে সাধারণ পথচারী অথবা পরিবহনশ্রমিক, সকলের জন্য সেটা বড়ো ধরনের ঝুঁকি। এই ঘটনাগুলো নাগরিক জীবনকে করে তুলছে দুর্বিষহ। প্রতিটি বয়সের মানুষ এখানে মহা এক ঝুঁকির মুখে।

এই দুর্বিষহ জীবন থেকে নিজেদের বাঁচাতে প্রয়োজন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ। এই মৃত্যুফাঁদ নিয়ে আমরা যে প্রতিবাদগুলো করছি তা শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেই আটকে আছে। এর প্রতিকার সড়কেই হতে হবে, অন্য কোথাও সম্ভব নয়। তবেই সড়কের সব ধুলাবালি, অন্যায়-অনিয়ম, তাজা রক্তের দাগ মুছে ফেলা সম্ভব।

ছোট্ট একটি জিজ্ঞাসা রাজীব অথবা রোজিনার মৃত্যুর নেমপ্লেটের খোঁজ আমরা কতজন রেখেছি?

যে সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে চলছে আমাদের কর্মযজ্ঞ, সড়ক দুর্ঘটনার মতো দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু সেখানে ঘটতে দেয়া যায় না আর। সকলে মিলে সঠিকভাবে নিয়মগুলো মেনে চলে এবং সড়কে একে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলাচল করলেই কেবল আমাদের সড়কগুলো হবে সবার জন্য নিরাপদ।