স্বাধীনতা ও আমাদের প্রত্যাশা

March 25, 2018

প্রয়োজন থেকেই মানুষের চাওয়া, আর এই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলেই মানুষ তার অধিকারের প্রশ্নে সজাগ হয়ে ওঠে। গড়ে তোলে তুমুল আন্দোলন। চলে আসে ৭১ এর মতো মুক্তির সময়, বাঙালির স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। ৭১-এর এই মার্চেই বাঙালি বুঝে ফেলে বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজ পতাকা উড়তে চলছে।

স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা। কথাটি কয়েকটি শব্দে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিন্তু লুকিয়ে আছে মহাকাশের বিশালতাসম মানুষের মুক্তির পদচিহ্ন, অধিকারের স্বপ্ন। খোলসা করে বললে, মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার কিভাবে অর্জন করবে এটি তারই যেন এক রূপকল্প। বঞ্চিত মানুষ যখন তার প্রাপ্য পাওনাটুকু বুঝে নিতে চায়, তখন তার ভিতর এক ধরণের স্বাধিকারবোধের সৃষ্টি হয়। এর পূর্ণাঙ্গ রূপই স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস সহস্র বছর ধরে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো থাকে জাজ্বল্যমান।

হঠাৎ করে উদয় হওয়া নয়, বরং স্বাধীনতা অর্জনে রয়েছে সংগ্রামের ইতিহাস। সময়ের প্রতিটি কার্যকর মুহূর্ত যেন ধাপে ধাপে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে চলে মুক্তিকামী মানুষের দুয়ারে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে সংগ্রাম শুরু করা বাঙালি জাতি পরবর্তীতে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন পেরিয়ে ৭১ এর মহান স্বাধীনতার সূর্যটি ছিনিয়ে নেয় বীরদর্পে। প্রতিটি ধাপে ধাপে বাঙালী প্রমাণ করেছে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা।

প্রয়োজন থেকেই মানুষের চাওয়া, আর এই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলেই মানুষ তার অধিকারের প্রশ্নে সজাগ হয়ে ওঠে। গড়ে তোলে তুমুল আন্দোলন। চলে আসে ৭১ এর মতো মুক্তির সময়, বাঙালির স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। ৭১-এর এই মার্চেই বাঙালি বুঝে ফেলে বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজ পতাকা উড়তে চলছে।

স্বাধীনতা মানে শুধু যেনতেন আঁকিবুকি করে একটি লাল বৃত্ত তৈরি নয় বরং ‘সূর্যাকার’ সেই বৃত্তটিকে মহাকাশে পৌঁছে দিয়ে পুরো জাতির জন্য প্রাপ্য আলোটুকু নিশ্চিত করার মধ্যেই স্বাধীনতার সাফল্য লুকায়িত।  যে সূর্যের আলো সেদিন বীর বাঙালি তার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল, সেই আলোর উজ্জ্বলতা আমরা কতটুকু বজায় রাখতে পেরেছি? সেই বিস্তীর্ণ পথে কতটুকু হাঁটতে পারলাম আমরা? এই কথাগুলো আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

আমরা কি স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার করছি? আমরা কি স্বাধীনতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? এসব নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে। কিন্তু একটি ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত স্বাধীনতার মতো বৃহৎ বিষয়টি সন্মুখে আনতে হলে জাতি হিসাবে আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, দু’মুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা কিংবা নিজের মতো পথ চলার যে স্বাধীনতা, এসব নিশ্চিতকরণের মধ্যে দিয়েই সমাজ থেকে সকল অনিয়ম, অভিযোগ এবং অধিকারহীনতা থেকে মানুষকে মুক্ত করা সম্ভব।

এদেশে যথাসম্ভব বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু অত্যাচারিত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে ক’জন মানুষ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে? নারীর উপর অত্যাচার এদেশে ক্রমশঃ বেড়েই চলছে। প্রতিনিয়ত নারী তার প্রাপ্য স্বাধীনতাকে হারাচ্ছে। এই স্বাধীনতা হরণ করছে প্রকারান্তরে একজন ‘পুরুষ’। পুরুষ তার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে নারীকে পরাধীন করে রেখেছে। মূলত নিজের স্বাধীনতাকেও সে এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, এদেশের নারীরা যখন স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ করতে পারবে, তার পথ চলাকে আরো গতিশীল করতে পারবে, সেই দিনই জাতি হিসাবে আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবো। আর নারী স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা না পেলে পুরুষের স্বাধীনতা কার্যত হয়ে উঠবে অর্থহীন। তখন ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিই কাঠগড়ার সম্মুখীন হবে।

কথিত আছে, “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে সেটা রক্ষা করা কঠিন” এই রক্ষা করার অর্থ তাকে বাক্সবন্দি করা নয় বরং বাক্সটি উন্মুক্ত করে দেয়া। যেখানে অবারিতভাবে যাওয়া আসা করবে ব্যক্তি চেতনা, অধিকারের স্বপ্ন, প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার। শুধু জাতীয় সংগীতের সুরে পতাকাকে সুউচ্চে ওঠানোই স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিতে পতাকার লাঠিকে ঐক্যবদ্ধ হাতের বাঁধনে রাখতে হবে। এই হাত শক্ত রাখতে অর্জন করতে হবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকারের স্বাধীনতা। তবেই তো তাকে স্বাধীনতা বলা যায়!

বৃহৎ অর্থে, মুক্তি মানে জীবনের সাথে মিলন। অর্থাৎ স্বাধিকার থেকে অর্জিত স্বাধীনতাকে যদি মুক্তি দিতে না পারা যায় তবে জাতি হিসাবে আমাদের মিলন অধরাই রয়ে যাবে। বাঙালী আশাবাদী জাতি। সে পথ চলায় অবিচল, কর্মের মাধ্যমে সে তার অর্জিত স্বাধীনতাকে মহাকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রে পরিণত করবে একদিন, এই আমাদের আশাবাদ। সেই সাথে অগ্রজদের পথই হয়ে উঠুক অনুজদের নির্দেশনা। যে বৈষম্যহীন, সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে আমরা লড়ে যাচ্ছি, স্বাধীনতা তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতাতেই শক্তি, স্বাধীনতাই হোক প্রেরণা।