স্কুল পালিয়ে কাউন্সিলর

August 17, 2017

রিনা হালিম আজ ঢাকা যাচ্ছেন। তার সমাজসেবামূলক কর্মকান্ড তাকে একজন বিশিষ্ট ও সফল কাউন্সিলর হিসেবে এনে দিয়েছে মাদার তেরেসা পুরষ্কার। তিনি তার স্বামীর সাথে আজ যাচ্ছেন সেই পুরষ্কার গ্রহণ করতে । তার স্বামী ইতিমধ্যেই অপেক্ষা করছেন, তাই তাড়াহুড়ো করে সব জরুরী কাজগুলো সেরে ফেলতে হচ্ছে- আজ দম ফেলার সময় নেই।

এক ঝলক দমকা হওয়ার মত ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে তাকে ছুটে যেতে দেখা যায়, সেই সাথে পরণের গোলাপী শাড়ি থেকে গোলাপী রং ঠিকরে বেরিয়ে যেন ঘরময় ছড়িয়ে পড়তে থাকে! তাকে ঘীরে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল অভিভাবকসহ একদল শিক্ষার্থী, তাদের সাথে একজন ঘরের মানুষের মতই তিনি আলাপচারিতা চালাতে থাকেন। যা দেখে বোঝা যায় এলাকাবাসী তার পরম আত্মীয়।

রিনা গাজীপুর জেলা সদরের তিনটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর; স্থানীয় প্রশাসনে তার কাজ দিয়ে অল্প সময়ে যথেষ্ট নজর কেড়েছেন। সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এরই মধ্যে আবার তার মুকুটে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু মূল্যবান রত্ন- যেমন কাজী নজরুল ইসলাম পুরস্কার, বেগম রোকেয়া পুরস্কার এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস পুরস্কার। এই মুহূর্তে তিনি আগামী কাউন্সিলর নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে নিজের পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যস্ত।

নারীরা এদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বৈপ্লবিক সব পরিবর্তন নিয়ে আসছেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের তালিকায় ৫ এবং ১৬ নম্বরে বর্ণিত বিষয়গুলো যেমন জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন স্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করণ- এগুলো অর্জনে রিনার মত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাংলাদেশের প্রয়োজন।

নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম করার একটি বিশাল হাতিয়ার জনপ্রতিনিধিত্ব। সরকারের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সকল স্তরে নারী জনপ্রতিনিধিদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন বরাদ্দ আছে। কিন্তু প্রশাসনে আসন বরাদ্দ রাখা এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের ক্রমাগতে বাধার সম্মূখীন হতে হয়।

ভাগ্যের কিছুটা সহায়তা এবং নিজের ইতিবাচক মনোভাব দিয়ে রিনা সমস্ত বাঁধা বিপত্তিকে জয় করে দূর্বার বেগে এগিয়ে চলেছেন। তার ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও তিনি আমাদের শোনান তার জীবনের গল্প এবং নিজের কিছু মূল্যবান উপলব্ধি।

শেখার কোন বয়স নেই

রিনা ৮ম শ্রেণীতে থাকতে তার স্বামীকে গোপনে বিয়ে করে ফেলেন, এরপর তখনকার মত তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

“সবসময় মনে খচখচ করত যে লেখাপড়ায় ভাল হওয়া সত্ত্বেও পড়াশোনাটা আমার এগোলো না। কিন্তু পড়াশোনা করার ইচ্ছাটা আমার সবসময় ছিল। ২০১৬ সালে আমি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিই এবং জিপিএ ৪.৪৫ সহ পাস করি।“

মজার ব্যাপার হলো, রিনা এবং তার ছেলে দু’জনই একই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেন। “আমার ছেলে শুরুর দিকে একটু অস্বস্তিতে থাকলেও পরবর্তীকালে আমি পরীক্ষা দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি জেনে যথেষ্ট সহযোগিতা করে। এমনকি আমার মেয়েও আমাকে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে অনেক সাহায্য করেছে।“

ব্র্যাক স্কুলের একজন সাবেক শিক্ষিকা রিনা হালিম প্রতিটি মানুষের জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করেন। তিনি গর্ববোধ করেন যে তার ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যেকেই বোর্ড পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল। “সে সময় আমি শুধু ঘর সামলাতাম; হঠাৎ একদিন শুনলাম আমার বাড়ির খুব নিকটেই একটা স্কুল চালু হতে যাচ্ছে এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আমি সেই স্কুলে পড়াতে আগ্রহী কিনা। আমি খুবই উৎসাহের সাথে রাজী হলাম। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী দুই ভূমিকাতেই আমার অভিজ্ঞতা নির্বাচনের সময় আমার অনেক কাজে লেগেছে।“ আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনের পর রিনার পরিকল্পনা তিনি আইন বিষয়ে একটি ডিগ্রী লাভ করবেন।

এগিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ

“আমার স্বামী পৃথিবীর সেরা স্বামী!” আনন্দিত ভঙ্গীতে হাসতে হাসতে বলেন রিনা! “আমার বাচ্চারাও খুবই ভালো, আর শ্বশুর বাড়ির সকলেই আমাকে কাজে খুবই উৎসাহ দেয়। রান্নাবান্না নিয়ে বা বাড়িতে থাকা নিয়ে আমার কখনও কোন চিন্তা করতে হয় না। আমি যাই করি তাতেই বাড়ির সকলের সহযোগিতা পাই। আমার স্বামী আমাকে বারবার বলাতেই না আমি ২০১৩ সালে নির্বাচনে অংশ নিই!”

রিনা সবসময় স্বীকার করেন যে তার মত এমন একটি পরিবার পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার এবং বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি থাকে ভিন্ন। পরিবার থেকে যথাযথ সহায়তা পাওয়া যায় না বলেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বহু নারী পারেন না প্রশাসনিক কাজে অংশ নিতে। “আমি বিশ্বাস করি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আমরা নিজেরা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি- সেটা হোক পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধব। আমাদের সকলের উচিত গঠনমূলক কাজে একে অপরকে সহায়তা করা এবং এমন মানুষজন খুঁজে বের করা যাদের সাহচর্যে আমরা নিজেদের জীবন সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারব।“

ধৈর্য্য ধরতে হবে এবং প্রতিষ্ঠা করতে হবে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

রিনা বলেন, “আপনাকে হতে হবে নিবেদিতপ্রাণ, আপনার মূল্যবোধগুলো হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আপনার নৈতিকতা যদি ঠিক থাকে এবং নিজের কাজ যদি উপভোগ করেন তাহলে আপনি সফল হবেনই। রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের এদেশের বেশিরভাগ লোকই ভাল চোখে দেখেন না। আমি একটি ব্যতিক্রমধর্মী সুন্দর উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাই।“

“আমাকে নিয়ে আমার আশেপাশের মানুষের অনেক আশা” তিনি বলেন, “কোন ধরণের দূর্নীতি আমি প্রশ্রয় দেব না। কখনই না।“

মেয়র হওয়া বা কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে চান কিনা এ ব্যাপারে রিনা মাটিতেই পা রাখতে চান। একজন বাস্তববাদী, বিনয়ী মানুষের মত তিনি জানান, “আমি তো সরাসরি রান্নাঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে এলাম। দু’বছর মাত্র হলো। আরও বড় কোন ভূমিকায় নিজেকে দেখতে আমার এই কাজে আরও অনেক সময় ব্যয় করতে হবে এবং লাগবে আরও অনেক অভিজ্ঞতা।“

হাসতে হবে এবং নিজের দিকে খেয়াল রাখতে হবে

রিনার সদাহাস্যময় মুখ তার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য!

“হাসলে নিজেকে কমবয়সী মনে হয়।“ বলে তিনি আবার হাসতে থাকেন। “নিজে হাসুন এবং অন্যের মুখেও হাসি ফোটাতে চেষ্টা করুন! অন্যদের যত্ন নিতে হলে নিজের যত্ন নেয়াটাও জরুরি।“

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of