সুস্থ কিডনি
সবার জন্য

March 20, 2019

আপনি জানেন কি- ৮৫০ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। বিশ্বে প্রতি ১০ জনে একজন এবং বাংলাদেশে প্রতি ৭জনে একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত। বিশ্বে প্রতিবছর ২.৪ মিলিয়ন মানুষ কিডনি রোগে মারা যান।

সচেতনতা ও সুস্থ জীবনযাপনের চর্চার মাধ্যমে কিডনি রোগের ৫০-৬০ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালন করা হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। গত ১৪ই মার্চ ২০১৯ তারিখ ছিল বিশ্ব কিডনি দিবস। দিনটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সবার জন্য, সর্বত্র’।

কিডনি আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীরে মধ্যভাগে পাঁজরের হাড়ের নিচে, পেছনের দিকে থাকে কিডনি। এটি শিমবিচি-আকৃতির অঙ্গ। মানবদেহে দুটি কিডনি থাকে। সাধারণভাবে বলা যায়, কিডনি আমাদের শরীরে ছাঁকনির কাজ করে। রক্ত থেকে বর্জ্য ছেঁকে বের করে এবং তা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। তবে এই অঙ্গটির ক্ষমতা বিষ্ময়কর। প্রতিদিন কিডনি ১৮০ লিটার তরল পরিশোধন করতে পারে।

শরীরের অপ্রয়োজনীয় ও বিষাক্ত উপাদান রক্তের মাধ্যমে কিডনিতে যায়। একটি কিডনিতে প্রায় ১০ লক্ষ নেফ্রন থাকে। এগুলো বর্জ্যকে রক্ত থেকে আলাদা করে দেয়। শরীরের অতিরিক্ত পানির সঙ্গে এসব বর্জ্য মিশে প্র¯্রাব তৈরি হয়। এভাবে কিডনি একদিকে শরীরকে বিষাক্ত পদার্থমুক্ত করে অন্যদিকে তরল পদার্থের ভারসাম্য ঠিক রাখে। এছাড়াও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে এবং হাড়ের সুস্থতা রক্ষা করে। সুতরাং শরীরের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে সুস্থ রাখার জন্য আমাদের সচেতন থাকা জরুরি। কিডনি সুস্থ রাখতে নিচের আটটি বিষয়ের প্রতি নজর দিন। নিয়ম মেনে চলুন, কিডনি সুস্থ রাখুন-

১.    শরীরকে সুস্থ এবং কার্যকর রাখুন: শরীর সুস্থ রাখতে কায়িক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম করা শরীরকে সুস্থ রাখে, সেইসঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগকেও দূরে রাখে।

২.   ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ডায়াবেটিস রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের অর্ধেকাংশই কিডনি জটিলতায় ভোগে। এজন্য প্রাথমিক অবস্থাতেই কিডনি রোগ সনাক্ত করতে ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করা জরুরি। এ ছাড়াও ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে কিডনিও সুস্থ থাকে।

৩.   উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অনেকেই জানে উচ্চ রক্তচাপের কারণে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক হয়। যে  বিষয়টি অনেকে জানে না তা হলো, এর কারণে কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি এবং হৃদরোগীদের যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে তাহলে তা কিডনির ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৪.   স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: এর মাধ্যমে ডায়াবেটিসসহ আরও যেসব রোগ কিডনি জটিলতার জন্য দায়ী তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। কিডনি সুস্থ রাখতে কিছু খাদ্যাভাসের প্রতি নজর দেওয়া দরকার। যেমন, পরিমিত পরিমাণে লবণ খাওয়া। সারাদিনে খাবারের মাধ্যমে আমাদের ৫-৬ গ্রাম অর্থাৎ চায়ের চামচের প্রায় এক চামচ লবণ খাওয়াই যথেষ্ট। এর বেশি খেলে কিডনি রোগের শঙ্কা বাড়ে। প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। এজন্য তা যত কম খাওয়া যায় ততোই ভালো। খাবারে বাড়তি লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। সেইসঙ্গে সুস্থ থাকার জন্য তাজা ফল ও সবজি যথেষ্ট পরিমাণে খাওয়া উচিত।

৫.   প্রচুর পানি পান করুন: একজন সুস্থ মানুষের দিনে ১.৫ থেকে ২ লিটার অর্থাৎ সাত-আট গ্লাস পানি পান করা উচিত। পরিমিত পরিমাণে পানি পান করলে তা সোডিয়াম, ইউরিয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার করতে কিডনিকে সাহায্য করে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ঝুঁকি কমে।

৬.   ধূমপান বন্ধ করুন: ধূমপান করার ফলে কিডনিতে রক্তপ্রবাহের গতি কমে যায়। ফলে কিডনি ধীরে ধীরে সঠিকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারায়। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে কিডনি ক্যান্সারের শঙ্কা ৫০% বেড়ে যায়।

৭.   ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত মাত্রাতিরিক্ত ব্যথানাশক এবং অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাবেন না: কিডনি যদি সুস্থ থাকে তাহলে প্রয়োজনে এসব ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। এতে হয়তো কিডনির তেমন কোনো গুরুতর বিপদ হবে না। কিন্তু নিয়মিত খেলে বা মাত্রাতিরিক্ত খেলে তা কিডনির ক্ষতি ও রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৮.   উচ্চ ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করুন: আপনার মধ্যে নিচের ঝুঁকিপূর্ণ কারণসমূহের এক বা একাধিক লক্ষণ থাকলে অবশ্যই নিয়মিত কিডনি রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করুন।

– ডায়াবেটিস
– উচ্চ রক্তচাপ
– স্থূলতা
– পরিবারের কেউ যদি কিডনি রোগে আক্রান্ত থাকে

কিডনি রোগ নির্ণয় পরীক্ষা কখন করাবেন

কিডনি রোগের প্রায়শই কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই বয়স ৬০ বছর হলে বছরে কমপক্ষে একবার বা নিচের যে কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই কিডনি রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করলে সুস্থ থাকা যায়।

  • ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া
  • প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া
  • ফেনাযুক্ত প্রস্রাব হওয়া
  • চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া
  • গোড়ালি বা পায়ের পাতায় ব্যথা
  • ক্লান্ত বোধ করা বা কাজে মনোযোগ দিতে না পারা
  • ঘুমের অসুবিধা
  • শুকনো বা খসখসে ত্বক
  • ক্ষুধামান্দ্য
  • কোমর ও পেশিতে ব্যথা

আমাদের অনেকেরই ধারণা কিডনি রোগ নির্ণয়ে যে পরীক্ষাগুলো করতে হয় তাতে অনেক টাকা লাগে। এ কারণে হয়তো অনেকে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করতে গড়িমসি করেন। এটি ভুল ধারণা, ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে আপনি কিডনি রোগ নির্ণয় পরীক্ষা করাতে পারবেন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of