সবার জন্য বাড়ি, তিনটি ধাপে গড়ি

৩১ অক্টোবর, বিশ্ব নগর দিবস। এই ধারণার আলোকে আমরা শহর এলাকায় বসবাসরত দরিদ্র মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত, ব্যয়সাশ্রয়ী একটি আবাসন সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। সম্প্রতি দেশের ঝিনাইদহের প্রাণকেন্দ্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিচালনায় চালু হয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে বাড়ি নির্মাণ।

চিন্তাদিদির একটি নতুন দোতলা বাড়ি হয়েছে এখন। বাড়িটি তৈরি হয়েছে তাঁর প্রতিবেশীদের অর্থায়নে, খরচ হয়েছে প্রায় ১২০,০০০ টাকা। তার বয়সও হয়েছে অনেক। চোখে তেমন দেখতে পান না। তবে এই দেখতে না পারা বয়সজনিত কারণে নয়। জন্ম থেকেই তার চোখে বিভিন্ন সমস্যা ছিল। এতদিন তিনি নির্ভরশীল ছিলেন তাঁর স্বামীর ঝালাইয়ের কাজ থেকে সামান্য আয়ের উপর। সবাই জানে, এই এলাকায় চিন্তা দিদিই সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।

চিন্তাদিদির আগের বাড়িটি ছিল টিনের। সারা দেশের বস্তিগুলোর অস্থায়ী বাড়িগুলো যেরকম থাকে ঠিক সেরকমই। বর্ষাকালের বন্যায় বাড়িটিতে পানি উঠত। গ্রীষ্মে অতিরিক্ত গরম লাগত। আর শীতকালের ঠান্ডা ছিল একেবারে হাড্ডি জমে যাওয়ার মতো।

তবে এখন দক্ষিণপূর্বের জেলা শহর ঝিনাইদহের বান্নাতলার আরও অনেক সুখী বাসিন্দার মতোই চিন্তাদিদির জীবনযাপন।

আসন্ন ধর্মীয় উৎসবের জন্য চারদিকে প্রস্তুতি চলছে। নতুন বাড়ির উল্টোদিকে যে দূর্গা প্রতিমাটি তৈরি হচ্ছে সেটি তাঁর বাড়ি থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। সারা সপ্তাহ ধরে জানালা দিয়ে তিনি প্রতিমা তৈরি করা দেখছেন। আর জানালার পাশের দেওয়ালেই তিনি টাঙিয়ে রেখেছেন বাঁধাই করা শ্রীকৃষ্ণের একটি ছবি। যে ছবির দিকে তাকিয়ে তিনি অনেকটা সময় কাটিয়ে দেন। যদিও তার চোখের জ্যোতি এখন আর ততটা উজ্জ্বল নয়, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

সবার জন্য বাড়ি

সবাই মিলে গড়ি

আবাসন সমস্যার সমাধানকল্পে গত দু’বছর আগে প্ল্যাটফর্ম ফর কমিউনিটি অ্যাকশন এন্ড আর্কিটেক্চার, কো ক্রিয়েশন আর্কিটেক্টস এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি একযোগে স্বল্প খরচের একটি এলাকাভিত্তিক আবাসন মডেলের কাজ শুরু করেন। স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ, এশিয়ান কোয়ালিশন ফর হিউম্যান রাহটস, কমিউনিটি আর্কিটেক্টস নেটওয়ার্ক, অ্যালাইভ নামের একটি স্থানীয় এনজিও এবং স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি সঞ্চয়ী সংস্থা বা দল মিলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর জন্য ঝিনাইদহ জেলায় কম খরচে টেকসই বাড়ি তৈরির মডেল বাস্তবায়ন করেছে।

১ম ধাপঃ শুরুতে পুঁজি থাকে ছোট, সামষ্ঠিক সঞ্চয়ের মাধ্যমে ঘটে তার বৃদ্ধি

একটি প্রাথমিক তহবিল দিয়ে এই উদ্যোগের শুরু হলেও ক্রমশ সঞ্চয়কারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘এশিয়ান কোয়ালিশন ফর হাউজিং রাইটস’ সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তি ও পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশটি বাড়ি তৈরির জন্য ঋণ দিয়েছে। নগরকেন্দ্রিক কমিউনিটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ৫টি সঞ্চয়ী দলের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়।

‘আমরা এলাকার মানুষেরা সকলে মিলে চিন্তাদিদির জন্য একটা ভালো বাড়ি তৈরির সিদ্ধান্ত নিলাম’- বলেন কল্পনা রাণী কর্মকার নামে এলাকার একজন স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।

এলাকায় ৫টি সঞ্চয়ী দল গঠন করা হলো। প্রত্যেক দলে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ঠিক করে দেয়া হয়। তাঁরা সপ্তাহে ৫০০ টাকা করে সঞ্চয় করা শুরু করলেন। প্রত্যেকের প্রদত্ত অর্থ জমা হচ্ছে একটি চক্রায়মান তহবিলে যা এলাকাবাসীর ভবিষ্যত সমৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হবে।

২য় ধাপঃ স্বপ্নের পথে যাত্রা

এলাকার একটি ম্যাপ তৈরি করার কাজে এলাকার মহিলার একদিন সকলে একত্রিত হোন। তাদের দিকনির্দেশনা এবং অন্যান্য সহায়তা দানের জন্য ছিলেন স্থানীয় কয়েকজন স্থপতি। এতে স্থানীয় মহিলারা বুঝতে পারেন তাদের প্লটগুলোর আকার আকৃতি বা সেগুলো দেখতে কেমন হবে। বাচ্চাদের খেলার কথা চিন্তা করে কেউ কেউ বাড়িটিতে সুন্দর একটি ছাদের কথা বলেন। অনেকেই আবার বলেছেন দোতলা বাড়ির কথা। কেউ চেয়েছেন বড় পরিবারের জন্য দুটি করে ঘর। আর্কিটেক্টরা দুটি মডেলের ডিজাইন চূড়ান্ত করেন। একটি হলো একতলা বাড়ির, অন্যটি দোতলার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়, বাসিন্দাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ির নকশায় তারতম্য থাকবে।

৩য় ধাপঃ স্বপ্নের বাস্তবায়ন

স্বপ্ন বাস্তবায়নে এলাকার মানুষ নিজেরা পুরোদমে সম্পৃক্ত হলেন। বাড়ি তৈরির জিনিসপত্র স্থানীয় বাজার থেকে সদস্যরাই কিনে আনেন এবং বাড়ির নির্মাণ কাজের পরিদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি তৈরিতেও তারা সাহায্য করেন। প্রতিটি বাড়ি তৈরিতে খরচ পড়েছে প্রায় ১ লক্ষ টাকা। বাড়িগুলোর চৌকাঠ তেমন দামি নয়। দরজা, জানালা প্লাস্টিকের। দেওয়ালগুলোও আস্তরহীন এবং ছাদগুলো হলো ধনুকাকৃতির। বাড়ির বাসিন্দারা নির্মাণ কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় খরচও পড়েছে বেশ কম। বাড়িতে একটি টয়লেট এবং দরজা জানালার চৌকাঠও তৈরি করা যেত যদি আরও ২০,০০০ টাকা তারা খরচ করতে পারতেন।

কমিউনিটির একজন নেত্রী, শরিফা বেগম বলেন,‘ গত দুই বছরে আমাদের এই এলাকা পুরোপুরি বদলে গেছে। আপনার বিশ্বাসই হবে না যে এখানে আগে একটি বস্তি ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের পক্ষে এখন ১ লক্ষ টাকারও কম খরচে বাড়ি বানানো সম্ভব। কারণ কোথা থেকে ভালো জিনিস কম খরচে সংগ্রহ করা যায় সেটি এখন আমরা জানি।’

চিন্তাদিদি এবং এলাকার বাচ্চাদের কথা

চিন্তাদিদির একারই নতুন বাড়ি হয়নি। চাকলাপাড়ার বাসিন্দারা তাদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে একজন বৃদ্ধ বাসিন্দার জন্যও একটি বাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন, যার বয়স প্রায় ১০৯ বছর বলে তাদের ধারণা! এই দুই এলাকার অধিবাসীরা তাদের এলাকার এই পরিবর্তনে যারপরনাই সন্তুষ্ট এবং তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। নিজেরা একটু ভালো থাকতে পেরে এখন তাদের প্রিয়জন এবং প্রতিবেশীদের উন্নতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এমন কি যারা সঞ্চয়কারী দলের মধ্যে পড়েননি তাদেরও দেখভাল করছেন তারা। মোট কথা, তারা দেখভাল করছেন বন্ধু, প্রতিবেশীর মধ্যে যাদের কোনো সঞ্চয় নেই কিংবা যাদের কোনো আয় রোজগারও নেই, যারা বয়স্ক এবং যারা পঙ্গু।

বর্তমানে শিশুরা স্কুলের পড়াশোনাতে ভালো করছে। এখন তারা বাড়িতেই খেলাধুলার জন্য অনেক জায়গা পাচ্ছে। পড়াশোনার পরে বন্ধুদেরকে তারা বাড়িতে খেলতে ডাকছে। গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমের মধ্যেও তাদের নতুন বাড়ির ভেতরটা অনেক ঠান্ডা থাকে। এটি তাদের জন্য একেবারেই একটি নতুন অভিজ্ঞতা। এসব বাড়ির বাসিন্দারা তাদের সঞ্চয় থেকে বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নিচ্ছে। কোনো কোনো পরিবারে তাদের সন্তানেরা রাতের বেলাতেও এই প্রথম, বিদ্যুতের আলোতে পড়তে পারছে। এর আগে তারা স্কুলে যেতো না বা যেতে পারত না। সে কারণে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগত। এবং তাদের স্বচ্ছল প্রতিবেশীদের থেকে সবসময় নিজেদেরকে ছোট ভাবত।

ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনের তাৎক্ষণিক সমাধান

জরুরি দরকারের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধানে, অল্প খরচে আবাসন মডেল এবং কমিউনিটির নেতৃত্বে শহরে আমরা যেভাবে বসবাস করি তার পরিবর্তন কী হতে পারে তার একটি ঝলক আমরা দেখতে পাই ঝিনাইদহের এই দুটি প্রকল্পে। শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভালো হাউজিং বা আবাসন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এদেশের প্রায় ৪২ মিলিয়ন মানুষ শহরে বাস করে। এদের ১০ জনের মধ্যে ৭ জনেরই স্থায়ী কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেক বছর প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে। এদের প্রতি তিনজনের একজন বস্তিতে বাস করে। যে বস্তিগুলো অবৈধভাবে এবং টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী বাড়ি। বস্তির এই বাড়িগুলো একদমই মজবুত নয়। খুবই বিপদজনক এবং অপরিকল্পিতভাবে তৈরি। এখানে জমির কোনো নিরাপত্তা নেই। বস্তিগুলোতে মানুষ উপচে পড়ছে। একটি ছোট ঘরে ৩/৪ জন মানুষ এক সঙ্গে থাকে। বস্তিগুলোতে নিরাপদ পানি নেই। পয়ঃনিষ্কাসনের যথার্থ ব্যবস্থা নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই, শিক্ষারও কোনো ব্যবস্থা নেই।

ভবিষ্যৎ হবে শহরকেন্দ্রিক

বিশ্ব জুড়ে এখন অর্ধেকেরও বেশি লোক শহরে বসবাস করে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দাঁড়াবে দুই তৃতীয়াংশে। প্রশ্ন হলো, এদের থাকাটা কীভাবে স্থায়ী এবং টেকসই করা যায়? শহরগুলোকে আরও বসবাসযোগ্য করতে হলে এই শহরের বাসিন্দাদের সক্রিয় হতে হবে। সেই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে (১১) শহরগুলোকে আরও বেশি সহনশীল, নিবিড়, নিরাপদ এবং টেকসই করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ফলপ্রসূ সমাধান প্রয়োজন। যা কমিউনিটিকে নগরজীবনের মূলস্রোতের সঙ্গে মিশতে সাহায্য করবে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাটা খুব সহজ কাজ নয়। প্রত্যেক জনগোষ্ঠী যেমন ভিন্ন, তাদের প্রয়োজনও ভিন্ন ভিন্ন। কমিউনিটির স্থপতি এবং প্রকৌশলীদের বিভিন্ন এলাকার জনগোগষ্ঠীর সঙ্গে আরও আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। তাদেরকে কারিগরি সহায়তা পেতে সাহায্য করতে হবে। উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুসারে আবাসনগুলির পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সিভিল সোসাইটি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে এই প্রক্রিয়া পরিচালনায় সাহায্য করা দরকার। কমিউনিটি যদি নেতৃত্ব দিতে পারে তবে সেই শহরই হয়ে উঠবে তাদের নিজের শহর। স্থপতি খন্দকার হাসিবুল করিম এবং সোহেলি ফারজানার মতে, “আদর্শ ঘর বলতে কিছু নেই যাকে হুবহু অনুকরণ করা যায়, কিন্তু আদর্শ প্রক্রিয়া থাকে যাকে অনুসরণ করা যায়।“