প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি চার উপায়ে নিশ্চিত করছে ব্র্যাক

September 12, 2019

আইএলও কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শ্রমবাজারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি না ঘটায় আন্তর্জাতিক জিডিপিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রতি বছর প্রায় ৭ শতাংশ। অথচ চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখেন।

আমাদের স্বাভাবিক কর্মধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এতে বাধা হিসেবে একদিকে যেমন আছে গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি, তেমনি অন্যদিকে কাজ করে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে আড়ষ্টতা। এর ফলস্বরূপ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্ম অধিকার থেকে বঞ্চিত হবার ঘটনাই ঘটে থাকে।

সাধারণত নানা জটিলতার কথা চিন্তা করে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবন্ধী কর্মী নিয়োগে আগ্রহী হয় না। চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবন্ধী প্রার্থী মাত্রই ধরে নেয় তার অবদান হবে সামান্য, আর তাকে নিয়ে কাজ করতে গেলে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে প্রতিষ্ঠান। কাজেই, সর্বদাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখায় এবং প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে রাখে। তবে এ কথাও সঠিক যে, প্রতিবন্ধী কর্মী নিয়োগ দিতে চাইলে প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সবার আগে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দিয়ে কাজ হয় না এবং তাদের পেছনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়-এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, যার মাশুল গুণতে হয় আমাদের জিডিপিতে। আইএলও কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শ্রমবাজারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি না ঘটায় আন্তর্জাতিক জিডিপির ক্ষতির পরিমাণ প্রতি বছর প্রায় ৭ শতাংশ। অথচ চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখেন।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তিকরণের বিষয়টি এতদিন ছিল চ্যারিটি নির্ভর। সম্প্রতি বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পেয়েছেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ- প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ কোনো না কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেঁচে আছে। আমাদের সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি শারীরিক অক্ষমতাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি বলেই শ্রমবাজারে তাদের অবদান সামান্য। ব্র্যাক এই সমস্যাকে অধিকার আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগিয়ে নিতে চায়।

সমাজে সবার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ব্র্যাক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ২০১৯ সালের প্রথম দিকে যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্র্যাক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চার উপায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি করতে চায়।

১। অধিকার রক্ষা শুরু হোক অন্তর্ভুক্তি নীতিমালা থেকে

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্র্যাক কাজ শুরু করার পরপরই কার্যক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং সেবা প্রদানের পদ্ধতিতে তাদের সম্পৃক্তকরণের জন্য আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অবকাঠামো এবং নীতিমালার মাধ্যমে এই অগ্রগতি আরও বেশি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর এ কারণেই প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মস্থল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ আমাদের নিজেদের নীতিমালার সীমাবদ্ধতাগুলো খুঁজে বের করা।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে আমাদের মানবসম্পদ নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে যেন সুস্পষ্টভাবে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটানো যায়।

মানবসম্পদ নীতিমালার নতুন নিয়োগ কৌশলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে যে, প্রতিবন্ধী কর্মীর যেকোন প্রতিভা বিকাশে প্রতিষ্ঠান সচেষ্ট থাকবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই অন্যদের চাইতে আলাদা হওয়া উচিত নয়। একইসঙ্গে চাকরির বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হবে যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উক্ত পদের জন্য উপযুক্ত হলে, অবশ্যই ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হবে। এটি অন্তর্ভুক্তিকরণ নীতিমালা প্রয়োগের একটি উদাহরণ মাত্র। প্রাপ্ত বয়স্কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি নতুন সেফগার্ডিং নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে প্রতিবন্ধী কর্মী এবং ক্লায়েন্টরাও অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়াও আমরা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও বিনিয়োগ করছি যেন সবাই কর্মস্থলে কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য শর্তগুলো সম্পর্কে জানতে পারে।

ভাষা যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। ক্ষমতায়ন কিংবা বৈষম্য – সবই যোগাযোগ উপকরণের মাধ্যমে সম্ভব। সে কারণে আমাদের পরিবর্তিত কমিউনিকেশন নীতিমালাতেও অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে। এটি সকল কমিউনিকেশন ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক রক্ষা এবং সঠিক শব্দের ব্যবহার নিশ্চিত করবে। এ বিষয়ে ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মীদের জন্য সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আমরা মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নিয়েও কাজ করব।

২। পরিবর্তন আনা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোতে

প্রতিবন্ধী কর্মীদের চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ঢাকায় অবস্থিত ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সংস্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধীবান্ধব লিফট এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অনেক জায়গায় ব্রেইল পদ্ধতিতে স্পর্শ করে অনুভব করার ব্যবস্থা, রেলিং, প্রয়োজনীয় জায়গায় র‌্যাম্প সংযোজন ইত্যাদি। এই পরিবর্তনগুলো সার্বজনীন গাইডলাইন এবং জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে করা হয়েছে।

ব্র্যাকের ২০টি আঞ্চলিক অফিসেও নানাবিধ সংস্কারের কাজ চলছে এবং কাজ শেষ হওয়ার পর একজন কনসালট্যান্ট এবং প্রতিবন্ধী কর্মী তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করবেন। জাতীয় হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ মহসিন ব্র্যাকের কয়েকটি অফিস ভিজিট করে সংস্কারের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।

আমাদের যানবাহন বিভাগের কিছু গাড়িতে হুইলচেয়ারে বসা কর্মীর জন্য নির্দিষ্ট আসন রয়েছে। বাকিগুলোও এ বছরের মধ্যেই হয়ে যাবে। ঢাকায় অবস্থিত প্রধান প্রধান আড়ং স্টোরগুলোতেও শীঘ্রই সংস্কার কাজ শুরু হবে।

৩। প্রতিষ্ঠানব্যাপী পরিবর্তন এবং তা বজায় রাখার জন্য লিডারশিপ কমিটি গঠন

কর্নেল ইউনিভার্সিটি পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায় কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায় যদি যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ এবং প্রতিবন্ধী কর্মীদের জন্য কিছু প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা থাকে।

ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচির কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি লিডারশিপ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি কাজের অগ্রাধিকার, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং নির্বাহী পরিচালকের কাছে বাজেট পেশ করার দায়িত্ব পালন করে। লিডারশিপ কমিটির সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করার জন্য ১৬টি উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মসূচির সমন্বয়ে একটি কর্মীবাহিনী গঠন করা হয়েছে। এই কর্মীবাহিনী প্রতি একমাস অন্তর তাদের কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির ফলাফল এবং একে ত্বরান্বিত করার জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

এই কর্মীবাহিনী দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সময়মতো কাজ করছে। একই সঙ্গে, এইচআর ডিপার্টমেন্ট এসব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে এই কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলার লক্ষ্যে একজন পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছেন।

৪। উদ্ভাবনী অন্তর্ভুক্তি মডেলে বিনিয়োগ

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত। ব্র্যাকের অন্যতম মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘অন্তর্ভুক্তি’। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ব্র্যাকের অন্যতম অগ্রাধিকার। কর্মসূচি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকরণ নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিভিন্ন কর্মসূচির পাইলট করছি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ অন্তর্ভুক্ত করার পরিসর বাড়াচ্ছি।

ডিসেম্বর ২০১৮-এর তথ্য অনুযায়ী ২৫০,০০০ শিশু আমাদের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক ক্লাসরুম থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি তাদের পুরাতন বাংলাদেশি শিক্ষানবিশি মডেলকে আধুনিক করেছে যেখানে প্রতিবন্ধী তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে চাকরি পেতে সাহায্য করা হবে। এই প্রকল্পের বিস্তার সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে যেখানে আমাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করার কিছু লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

বাংলাদেশের গণপরিবহনগুলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার জন্য আমাদের ছয় মাসব্যাপী প্রচার-প্রচারণা এ বছরের শুরুতে আলোর মুখ দেখেছে। নদীপথে পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার জন্যও ব্র্যাক সুপারিশ করবে। এছাড়াও আমরা বর্তমানে ঢাকায় নির্মাণরত মেট্রোরেলে যথাযথ সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করেছি।

আমাদের M&E ফ্রেমওয়ার্কে প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক ‘ওয়াশিংটন গ্রুপ অফ কোয়েশ্চেনিয়ার’ একীভূত করার জন্য একটি পাইলট কার্যক্রম শুরু করছি যেন এ সম্পর্কে আরও বেশি শিখতে এবং আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করতে পারি। প্রতিটি কর্মসূচির পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার জন্য সচেতনভাবে আমরা চিন্তাভাবনা করছি এবং এটি শুরু হচ্ছে আমাদের বর্তমান প্রতিবন্ধী কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে। মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচি যার কর্মীসংখ্যা বেশি এবং বড়ো পরিসরে দেশ-বিদেশে পরিচালিত হচ্ছে, এ বছরের জুন মাসে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে যেখানে প্রতিবন্ধী কর্মীরা নিজেদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। আগামীতে আরও কয়েকটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে যা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য স্থির করতে সহায়তা করবে।

অন্তর্ভুক্তি স্বতঃস্ফুর্তভাবে আসে না, কিন্তু এটি অসম্ভবও নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করুণা করার পুরনো মানসিকতা পরিত্যাগ করার এখনই সময়। বরং তাদের অন্যদের মতো কর্মক্ষম এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবতে হবে এবং যখন তা বাস্তবে পরিণত হবে, তখন এর সুফল আমরা সকলেই ভোগ করব।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of