রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুজব মোকাবেলা

September 20, 2018

‘বিরোধিতা নয়, বুঝিয়ে বলব’ কৌশলই তারা প্রয়োগ করেছেন। শুরুতেই তারা বলেননি যে ‘আপনি যা জানেন সেটা ভুল’। প্রথমে তারা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন টিকাদানের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের কি ধারণা।

কেউ মনে করতো ডিপথেরিয়ার টিকা দিলে সন্তান মারা যাবে, কেউ বলতো টিকা নিলে খ্রিষ্টান হয়ে যাবে। আবার কেউ বলত মুসলিম নারীরা ঘরের বাইরে যায় না, সুতরাং মায়েরা সন্তান নিয়ে টিকা দিতে যাবে না। আবার অনেকে আতঙ্কিত ছিল এই ভেবে যে, ডিপথেরিয়ার টিকা নিলে পরজন্মে মুসলিম হয়ে জন্ম নেবে না।

এগুলো গুজব। রোহিঙ্গা শরণার্থী, আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে যারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছিলো, এসব গুজব এসেছে তাদের সাথেই।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে মাঠ পর্যায়ে যৌথভাবে একটি সমীক্ষা চালায় বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সেই সমীক্ষায় উঠে আসে যে, ডিপথেরিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। এর পরপরই ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য ডিপথেরিয়া টিকাদান কর্মসূচির প্রথম পর্বের কার্যক্রম শুরু হয়।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের শুরু থেকেই, সরকারের সহযোগী হিসেবে জরুরী ত্রাণ, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা, কৃষিসহ অন্তত ১২টি খাতে মাঠ পর্যায়ে সবচেয়ে বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে ব্র্যাক। অন্যান্য স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সাথে যৌথভাবে সরকারের এই ডিপথেরিয়া টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে ব্র্যাক।

ডিপথেরিয়া টিকাদান কর্মসূচি চলাকালে ব্র্যাকের সিফরডি কর্মীরা ইমামদের সঙ্গে কথা বলছেন

মাঠ পর্যায়ে, সরকারি-বেসরকারি-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সমস্ত কার্যক্রম সমন্বয় করে থাকে ইন্টার সার্ভিসেস কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি)। সেসময় এই টিকাদান কর্মসূচির জন্য সচেতনতা তৈরিতে আইএসসিজি-এর কমিউনিকেটিং উইথ কমিউনিটিস (সিডব্লিউসি) কর্মীরা মোট ১,০৫০ স্বেচ্ছাসেবককে সংগঠিত করেন। এর মধ্যে ব্র্যাকের কমিউনিকেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (সিফরডি) কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন ৮০০ জন।

প্রাথমিক পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকরা ক্যাম্পের ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের ডিপথেরিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতন করা চেষ্টা করেন। দেখা গেলো, বেশিরভাগ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষই এই রোগটার কথা জানেন, তবে অন্য নামে। কিন্তু, তাদের কেউই বাচ্চাকে টিকা দেওয়াতে রাজি নন। ধীরে ধীরে নানা রকম গুজবের কথা উঠে আসতে লাগলো।

এই অবস্থায় ব্র্যাকের সিফরডি কর্মীরা নতুন কৌশল প্রয়োগ করলো। এক্ষেত্রে তাদের নীতি হলো, ‘বিরোধিতা নয়, বুঝিয়ে বলব’। এর মাধ্যমে তাদের আচরণে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলো তারা।

আচরণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা ট্রান্সথিওরেটিকাল মডেল অনুসরণ করা হলো যার রয়েছে পাঁচটি ধাপ: ১. প্রাক-তথ্য, ২. তথ্য, ৩. স্বীকার, সমর্থন ও বিশ্বাস, ৪. অনুশীলন, এবং ৫. অ্যাডভোকেসি। মূল সমস্যা দেখা দিলো তৃতীয় ধাপে এসে। নানারকম গুজবের কারণে রোহিঙ্গারা কোনভাবেই মানতে রাজি হচ্ছিলো না যে টিকা দিয়ে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ইন্টারপারসোনাল কমিউনিকেশন (আইপিসি)

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্র্যাকের সিফরডি স্বেচ্ছাসেবকরা ইন্টারপারসোনাল কমিউনিকেশন (আইপিসি) মেথড অনুসরণ করে। প্রতিটি আইপিসি সেশনের আবার পাঁচটি ভাগ রয়েছে: ১. উপস্থিতি, ২. সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন তৈরি, ৩. প্রচার, ৪. ডি-লার্নিং, এবং ৫. স্মরণ।

প্রথমে স্বেচ্ছাসেবকদের আইপিসি সম্পর্কে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। একে-একে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোট ৪০,০০০ হাউজহোল্ডে গিয়ে প্রতিটি পরিবারের সাথে নানা বিষয় নিয়ে গড়ে আধাঘণ্টা করে আলাপ-আলোচনা করে তারা। এছাড়াও, স্থানীয় ইমাম এবং মাঝিদের সঙ্গেও আলাদাভাবে কথা বলে তারা।

‘বিরোধিতা নয়, বুঝিয়ে বলব’ কৌশলই তারা প্রয়োগ করেছেন। শুরুতেই তারা বলেননি যে ‘আপনি যা জানেন সেটা ভুল’। প্রথমে তারা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন টিকাদানের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের কি ধারণা। সবকিছু শুনে নিয়ে তারপর একে একে তাদের ধারণাগুলো নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। যেমন একটি প্রশ্ন ছিলো এমন: ‘আপনি কি নিজ চোখে কাউকে টিকা নেয়ার কারণে মারা যেতে দেখেছেন?’

এর ফলে এক পর্যায়ে আসল সত্যিটা সামনে চলে আসে। কোনো উত্তরদাতাই নিজ চোখে টিকা দেওয়ার কারণে কাউকে মারা যেতে দেখেননি। মিয়ানমারে থাকাকালে সেখানকার ইমাম বা ধর্মগুরুরাই মূলত এই গুজবের উৎস। নিরক্ষর ও ধর্মভীরু রোহিঙ্গাদের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এসব গুজব।

এই আচরণ পরিবর্তন কর্মসূচির শেষে দেখা গেলো বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই তাদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। এরপর তাঁরা স্বানন্দে সন্তানদের টিকা দিতে রাজি হয়েছিলেন।

ডিপথেরিয়ার টিকা নিচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুরা

ফলাফল

ডিসেম্বরে টিকাদান কর্মসূচির প্রথম পর্বে সব সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা ৮১% শিশুকে (৬ সপ্তাহ – ৭ বছর বয়সী) টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন। আইপিসির কার্যকর প্রয়োগের ফলে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে পরিচালিত টিকাদান কর্মসূচির পরবর্তী পর্বগুলোর সাফল্যের হার ছিল যথাক্রমে ৯৩% এবং ১১৫%। এই তিন পর্ব মিলিয়ে ব্র্যাকের সিফরডি সেচ্ছাসেবকরা ৬২% শিশুর টিকাদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় পর্ব শেষ হবার আগেই ব্র্যাকের স্বেচ্ছাসেবকরা যেসব এলাকাগুলোতে কাজ করে, সেই এলাকাগুলো ডিপথেরিয়াসংক্রান্ত প্রায় সবধরনের গুজব বা কুসংস্কার দূর করা সম্ভব হয়। তবে কিছু এলাকা, বিশেষতঃ লাদা ও নয়াপাড়া এলাকা, যেখানে ব্র্যাকের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করেননি, সেখানে টিকাদান কর্মসূচির তৃতীয় পর্ব শেষেও সব কুসংস্কার পুরোপুরি দূর করা যায়নি। পরবর্তীতে, সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুরোধে সিফরডি স্বেচ্ছাসেবকরা সেসব ওই এলাকাগুলোতে কুসংস্কার দূর করতে সাহায্য করেন।

ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

এই মুহূর্তে কক্সবাজারের ৩০টি রোহিঙ্গা শিবিরে একটি জরীপের অংশ হিসেবে সেখানকার বাসিন্দাদের নাম নিবন্ধন করছেন সিফরডি-এর স্বেচ্ছাসেবকরা। এই কাজ করতে যেতে নতুন একটা গুজবের খোঁজ পেয়েছেন তারা। রোহিঙ্গারা এখন মনে করছে যে এই জরীপের নাম নিবন্ধন করা হলে তাদের হয়তো জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হতে পারে। পাঁচ ধাপের আরচণ পরিবর্তন ও আইপিসি পদ্ধতিতে এখন এই গুজবটি দূর করার কাজ করছেন সিফরডি স্বেচ্ছাসেবকরা। ভবিষ্যতে সব ধরণের গুজব সম্পর্কে জানতে একটি পূর্ণাঙ্গ রিউমার-ট্র্যাকিং মেকানিজম তৈরির কাজ করছেন সিফরডি-র কর্মীরা।