যে ৯টি উপায়ে আমরা কক্সবাজারে বর্ষা মৌসুম মোকাবেলা করছি

June 10, 2018

এই বৈরী আবহাওয়াতে ঝরে যেতে পারে বহু প্রাণ, ছড়িয়ে পড়তে পারে মহামারী। পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলার কারণে হতে পারে পাহাড় ধস। ফলস্বরূপ আশ্রয় শিবিরের ভেতরের রাস্তাগুলো হয়ে পড়বে চলাচলের অযোগ্য, বাধাগ্রস্ত হবে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম, বিশেষত পানি, রেশন ও অন্যান্য সহায়তা সেবা।

কক্সবাজারে শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টির মৌসুম

৩০০০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা আশ্রয় শিবিরে কোনো রকমে মাথা গুঁজে আছে হাজার হাজার পরিবার। প্রায় ২ লক্ষ মানুষকে ইতিমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ মৌসুমে সাইক্লোনের ঝুঁকির সঙ্গে রয়েছে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা। ঝড়ের প্রকোপে উড়ে গেছে অনেকগুলো আশ্রয় শিবিরের ত্রিপলের ছাউনি। বৃষ্টির পানি জমে কর্দময় পিচ্ছিল পথে হাঁটাও যাচ্ছে না।

এই বৈরী আবহাওয়াতে ঝরে যেতে পারে বহু প্রাণ, ছড়িয়ে পড়তে পারে মহামারী। পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলার কারণে হতে পারে পাহাড় ধস। ফলস্বরূপ আশ্রয় শিবিরের ভেতরের রাস্তাগুলো হয়ে পড়বে চলাচলের অযোগ্য, বাধাগ্রস্ত হবে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম, বিশেষত পানি, রেশন ও অন্যান্য সহায়তা সেবা। ঝড়ো বাতাসে বেশিরভাগ আশ্রয় শিবিরের ত্রিপলের ছাউনি ও বেড়া এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও লার্নিং সেন্টারসহ অন্যান্য অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে পড়তে পারে । ৭০%-এর বেশি ল্যাট্রিন এবং পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টির কারণে ল্যাট্রিনগুলো ভরে ময়লা উপচিয়ে পড়তে পারে, পানি ও সুয়ারেজের মিশ্রণ শিবিরগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে জলাধারগুলোর পানি দূষিত হয়ে যাবে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ, হেপাটাইটিস ই ও কলেরা রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়বে।

 

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা যা করছি

১.      আশ্রয় কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকার উন্নয়ন

৯০০০-এর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র সনাক্ত করা হয়েছে। ১০০০-এর বেশি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বিতরণের জন্য ৫০০০ ঘরবাড়ি তৈরির সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জাতিসংঘ উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) ৩০ সেট তাঁবুর মতো ছাউনি গড়ে তুলেছে। কারিতাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে অস্থায়ীভাবে লোকজনদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য আশ্রয় ছাউনি গড়ে তোলা হচ্ছে। পাহাড়ে ওঠা-নামার জন্য ৮৯টি সিঁড়ি, ১১টি সেতু তৈরি এবং পানি নামার জন্য ৩১টি নালা খনন করা হয়েছে।

২.      দুর্যোগ সহনীয় নিরাপদ স্থান

ঝড়-বাদলে ক্ষতি ও ভূমিধসের আশঙ্কা  নেই এমন নিরাপদ স্থানে শিশু-বান্ধব আশ্রয় ছাউনি গড়ে তোলা হচ্ছে। এই কার্যক্রমে আমাদের সঙ্গে আছে সেভ দ্য চিলড্রেন। ১৮৯টি শিশু-বান্ধব নিরাপদ আশ্রয় ছাউনি ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে।

আধুনিক নকশা এবং স্থানীয় লোকবল ও কাঁচামাল ব্যবহার করে ২০০টি অস্থায়ী লার্নিং সেন্টার তৈরির কাজ মে মাস নাগাদ শেষ হবে। এই সেন্টারগুলোতে তিন ফুট গভীর ধাতব পাইলিং থাকবে আর ওপরে সিমেন্ট দিয়ে চারটি বাঁশ গাঁথা হবে। এই সেন্টারগুলোর মেঝেতে ইট বিছিয়ে সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হবে। এর ফলে বন্যার পানি মেঝেতে উঠতে পারবে না।

 

৩.      ওয়াটার স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন

আমাদের পরীক্ষাগারে পানির উৎসগুলো থেকে পানি সংগ্রহ করে নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। পানির ট্যাংক কেনা হচ্ছে যাতে আশ্রয় শিবিরগুলোতে একসঙ্গে ৪০,০০০ লিটার পানি সরবরাহ করা যায়। ১০০০ ল্যাট্রিন তৈরির সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেগুলো তৈরি করা যায়। যেসব জায়গায় ল্যাট্রিন ও নলকূপ কাছাকাছি আছে সেখান থেকে ল্যাট্রিন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কারণ এতে পানি দূষণের আশঙ্কা থাকে।

 

৪.      র‌্যাপিড রেসপন্স অ্যান্ড ইমার্জেন্সি অ্যাকশন হাব

বিপর্যয়কালীন জরুরি সেবা পৌঁছে দিতে ব্র্যাকের ১২টি শাখা অফিসে ইমার্জেন্সি অ্যাকশন হাব চালু হয়েছে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুদ রাখা হয়েছে। এই শাখা অফিসগুলোতে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক সার্বক্ষণিক কর্মরত থাকবেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরে ২৪০ জন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইমার্জেন্সি ফোকাল পয়েন্টের তিনটি টিম সুরক্ষা ওয়াশ কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত রয়েছে। যে কোনো বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্য ১১টি সেবা কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে।

৫.      আগাম সতর্কতা ও কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ

সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমাদের ৮০০ জন স্বেচ্ছাসেবী গত ৩ সপ্তাহে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৬৫৪৭২ জন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। দুর্যোগকালীন ঝুঁকি কমানোর জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক ১০০টি গ্রুপ গঠন করা হয়েছে।

৬.      পানি সংরক্ষণ

৪টি পানির ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে সেখান থেকে ১০০০০ লোকের জন্য পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সৌরচালিত পাম্পের সাহায্যে ট্যাংকে পানি ভরা হবে। এই পানি ক্লোরিন দিয়ে বিশুদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকবে। আমরা পানি সংরক্ষণের বিষয়টিকে একটি জটিল ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছি কারণ যে টিউবয়েলগুলো বসানো হয়েছিল সেগুলো থেকে ইতিমধ্যেই লবণাক্ত পানি উঠছে বা নষ্ট হয়ে গেছে।

৭.      বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট তৈরির কাজ চলছে। স্থানীয় বাজার থেকে প্ল্যান্ট তৈরির উপকরণ কেনা হচ্ছে যাতে তা ব্যয়সাশ্রয়ী হয়। ২৫টি প্ল্যান্টের মধ্যে ২০টিতেই ওয়েটল্যান্ড টেকনলজি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিকে প্রথম পুকুরে বর্জ্য জমা হবে এবং সেখান থেকে পানি পরিশ্রুত পানি দ্বিতীয় পুকুরে যাবে। কলাবতী গাছ লাগানো হবে যেটি বর্জ্য খেকো ব্যকটেরিয়া জন্মাতে সাহায্য করবে। পুরো পুকুরটি স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঘেরা থাকবে যাতে বৃষ্টির পানি তাতে প্রবেশ করতে না পারে। বন্যা ঠেকানোর জন্য বাঁধ দেওয়া হচ্ছে, ভূমি ধস ঠেকানোর জন্য প্যালিসটেড ড্রাম সিট ব্যবহার করা হচ্ছে এবং নালাগুলো পানি নেমে যেতে সাহায্য করছে।

৮.      গ্রামীণ পাম্প

আলট্রা-ফিলট্রেশন পদ্ধতির হাতেচালিত পানির পাম্প ব্যবহার করে বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে। পুকুর, খান ও জলাশয় থেকে এই পাম্প পানি তুলতে সক্ষম। এক ঘণ্টায় এই পাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর মান অনুযায়ী ৫০০ লিটার পর্যন্ত পানি বিশুদ্ধ করতে পারে।

৯.      গণ রান্নাঘর

প্রতিটি পরিবার মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করার ফলে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটছে। এই দূষণের হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে আমরা ৬টি গণ রান্নাঘর তৈরি করেছি। এই রান্নাঘরে অনেকে একসঙ্গে নিরাপদে রান্না করতে পারে। এর মধ্যে ৪টি রান্নাঘরে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসে জ্বলে এমন চুলো লাগানো হয়েছে। লাম্বাশিয়ায় এই রান্নাঘরগুলোতে ৯০০ জনেরও বেশি লোকের রান্না হয়ে থাকে।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মাত্র এক ঘন্টার বৃষ্টিতেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে একশ’র বেশি আশ্রয়কেন্দ্র।

আমরা জানি, এবারের বর্ষা মৌসুম আমাদের অনেকের জন্যই হতে পারে অনেক দীর্ঘ এবং কষ্টসাধ্য।

অন্যান্য অনেকের সাথেই আমরা একযোগে কাজ করছি দুর্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবেলায়। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করছে আমাদের প্রায় ২,০০০ নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। বর্ষা মৌসুম এসে যাবার সাথে সাথেই ঘড়ির কাঁটায় দেখানো সময় ভুলে কাজ করছে এই কর্মীগণ। মানুষের পাশে আমরা, আপনারাও এসে দাঁড়ান আমাদের পাশে- ডোনেট করতে ভিজিট করুন response.brac.net এবং আমাদের ফলো করুন আমাদের ফেসবুকে।