মণিলালের ছোট্ট দোকান আর বিশাল স্বপ্ন

August 8, 2022

বাংলাদেশে ৫০ বা তারও অধিক ভিন্ন ভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১.৮%। এই জনগোষ্ঠীর প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই ভূমিহীন দিনমজুর, অন্যের জমি চাষ করে জীবন চালায়। তারা পর্যাপ্ত মূলধন, সঠিক দিকনির্দেশনা ও নেটওর্য়াকিংয়ের অভাবে অন্যান্য পেশায় যুক্ত হতে পারেন না। দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ প্রদানের মাধ্যমে ব্র্যাক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির ইন্ডিজেনাস পিপলস্ প্রকল্প সমতলের প্রায় ৮৪ হাজার জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়ন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণের কাজ করে যাচ্ছে।

“যারা একসময় আমার শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে ঠাট্টা করত আজ তারাই আমার দোকানে কাজ নিয়ে আসে।” বলছিলেন মণিলাল পাহান।

শারীরিক প্রতিবন্ধিতা এবং দরিদ্রতা জয় করে মণিলাল পাহান আজ স্বাবলম্বী। মণিলাল পাহান (৩৪) নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার শম্ভুপুর গ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহান সম্প্রদায়ের একজন। মণিলাল তার গ্রামের প্রথম ব্যক্তি, যিনি পূর্বপুরুষের পেশা- দিনমজুরের কাজ না করে নিজের ক্ষুদ্র ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান- সাইকেল, ভ্যান, মোটরসাইকেল মেরামত ও যন্ত্রাংশের দোকান দিয়েছেন।

বাল্যকালের কথা বলতে গিয়ে মণিলাল বলেন, বাড়ির কাছাকাছি একটি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি, তারপর আর হয়নি। বাড়ির কেউ চাইল না যে, পোলিও আক্রান্ত মণিলাল পড়ালেখা শিখুক। অবশ্য আমার বাড়িতে কেউ এর চাইতে বেশি পড়ালেখা করেছে বলেছে আমরা কেউ শুনিনি।

অন্য পাঁচ ভাইও আমার মতোই ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। এরপর অন্যের জমিতে কাজ শুরু করে। কিন্তু আমার তো হাঁটতেই কষ্ট হয়, জমিতে চাষ দেব কীভাবে? আয়রোজগারের ভালো কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারতাম আমাকে নিয়ে মা-বাবার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দিনদিন বেড়েই চলছে।

সময় কাটাতে, আবার বলতে পারেন কাজের সন্ধানেও আমি প্রতিদিন প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরের এক ছোটো বাজারে চলে যেতাম। পাহান সম্প্রদায়ের মানুষ, আবার একপায়ে ভর দিয়ে চলে এমন লোককে চাকরি দেবে কে? তবুও হার মানিনি। শুধু মনের জোরে প্রায় বিনা বেতনেই কয়েকদিন কাজ করি ব্রিজের ধারের একটি ছোটো দোকানে, যেখানে সাইকেল, ভ্যান মেরামতের কাজ করা হতো। এর কিছুদিনের মধ্যেই দোকানের মালিকের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। তার কাছেই কাজ শিখেছি বেশ কয়েক মাস। প্রথমদিকে সবাই আমাকে আনাড়ি ভেবে কাজ দিতে চাইতো না। কিন্তু আমার তাতে মনোযোগে ভাটা পড়েনি। বেশ কিছুদিন পর লক্ষ্য করলাম যে, লোকে আমার কাজের প্রশংসা করছে।

নিজের কাজের দক্ষতা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ রইল না। এবার আমি নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম, নিজের একটা দোকান হবে। কিন্তু দোকানের সামান্য কর্মচারী আমি, যেখানে সংসার চালানোই কঠিন সেখানে নিজের দোকান করা কী যে সে কথা! তবু ঝুঁকি নিলাম, অনেক সাহস করে একটি পাম্প মেশিন কিনে ছোট্ট একটা ঝুপড়ি ঘরে দোকান সাজালাম। নির্জন রাস্তার ধারে দোকান, একান্ত বিপদে না পড়লে কেউ আসে না। অনেকে বলত, এই দোকান চালানোর চাইতে ভিক্ষা করলেও আয়রোজগার ভালো হবে।

এসব কথা শুনেও আমি স্বপ্ন দেখা ছাড়িনি, কোনো না-কোনো একদিন বাজারে বড়ো দোকানের মালিক হব। দোকান ভর্তি থাকবে সাইকেল, ভ্যান, রিক্সা ইত্যাদি মেরামতের যন্ত্রাংশে। কিন্তু কিছুতেই সেই সুযোগ হয়ে উঠছিল না। এদিকে আমি বিয়ে করেছি, পরিবার বড়ো হয়েছে, এসেছে সন্তান। সংসারের দায়দায়িত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ।

২০১৪ সালে যুক্ত হই ব্র্যাক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি আদিবাসী প্রকল্পের উঠান বৈঠকগুলোতে। পেশাজীবনের খুঁটিনাটি এবং সুস্থ জীবনধারার জন্য অত্যাবশ্যক এমন বিষয়গুলো শেখার পাশাপাশি ব্যাবসা বাড়ানোর জন্য আমাকে এককালীন অনুদান ৮,০০০ টাকা সমমূল্যের টায়ার, টিউব, পাম্প মেশিন, চেইন, গিয়ারসহ প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে দেওয়া হয়।

এবার শুরু হলো স্বপ্নপূরণের পালা।

বাজারে একটি দোকান ভাড়া নিলাম। সময়ের সাথে নিজেকে এগিয়ে নিলাম, শিখে নিলাম মোটরভ্যান ও রিকশাসহ অন্যান্য স্থানীয় যানবাহন তৈরির কৌশল। আমার দোকানে এখন কত কত যন্ত্রাংশ সাজিয়ে রাখা! ক্রেতারা বেশিরভাগ জিনিস এক দোকান থেকেই কিনতে পারছে, তাই তারাও খুশি। দোকানের মাসিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ মিটিয়ে এখন গড়ে থাকে দিনে ৩০০-৪০০ টাকা।

নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই গড়তে হয়। তাই একার আয়ের ওপর নির্ভর না করে স্ত্রীকে গরু কিনে দিয়েছি। দুজনের আয় থেকে টাকা জমিয়ে প্রায় দুই লক্ষ টাকা দিয়ে কিনেছি ৬ শতাংশ জমি। মেয়ের পড়ালেখার জন্য ভবিষ্যতে খরচ করব, সেই ভাবনা থেকে ব্যাংকে নিয়মিত টাকা জমাচ্ছি।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বেশিরভাগ দিনমজুরের ভাগ্য বংশ পরম্পরায় দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রে বন্দী। কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত মৌসুমি দিনমজুররা সাধারণত ফসল কাটা ও জমি চাষের সময় ছাড়া বছরের অন্য সময় বেকার দিন কাটায়। তখন অনেকে আগাম শ্রম বিক্রির টাকায় সংসার চালান। ফলে কাজের ভরা মৌসুমে যখন হয়তো একটু বেশি টাকা আয়ের সুযোগ থাকে তখনও আগাম নেওয়ায় কম মজুরি দরেই কাজ করতে হয়। অন্যদিকে অনেক কর্মক্ষম যুবক পেশাগত দক্ষতার অভাবে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও ফিরে যান তাদের পূর্বপুরুষের আদি পেশায়। মূলধনের অভাবে সাহস করে নতুন কাজ শুরু করতে পারেন না। এই কারণে তারা সাধারণ জনগোষ্ঠীর সাথে তালমিলিয়ে চলতে হিমশিম খায়।

ব্র্যাক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি ইন্ডিজেনাস পিপলস্ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যেন মণিলালের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ দরিদ্রতা ও সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে সমানভাবে অবদান রাখতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী ও যুব সমাজকে আধুনিক কৃষিকাজের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক অন্যান্য পেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। স্থানীয় পরিসরে উদ্যোগ শুরু করার জন্য ভাতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়। সেইসঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ যেন তাদের নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারে সেজন্য কার্যক্রম পরিচালনা করে।

মণিলাল পাহান সেই সাহসী যোদ্ধা, যিনি ক্ষুধা, দরিদ্রতার বিরুদ্ধে লড়াই করে তৈরি করেছেন নিজের ভবিষ্যৎ।

 

সম্পাদনাতাজনীন সুলতানা, সুহৃদ স্বাগত

সার্বিক সহায়তাতানজীম ওয়ালিদ রহমান

4.7 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments