ব্র্যাকএক্স ২০১৮: উদ্ভাবন ও বৃত্তের বাইরে পথচলা

February 5, 2019

তারা যেসব সমস্যাগুলোর সমাধান করার চেষ্টা করেছে তা হয়তো ব্র্যাক এখনই মোকাবেলা করছে বা ভবিষ্যতে মোকাবেলা করবে এমন শঙ্কা রয়েছে।

অন্টারপ্রেনিউরশিপ বা স্ব-উদ্যোগের ধারণার উদ্ভব হয় গত শতকের আশির দশকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় গিফোর্ড পিনচো প্রথম স্ব-উদ্যোক্তার ধারণা চালু করেন। বর্তমানে এই ধারণা বেশ জনপ্রিয়। এই ধারণা মতে, কর্মীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব প্রদান করা হলে তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে নতুন ধারণার উদ্ভব ঘটায় এবং সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়।

কেউ কেউ মনে করেন, অন্টারপ্রেনিউয়ার ধারণাটি কোনো সংস্থার বিস্তারের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। আবার কারও কারও মনে এই প্রশ্নগুলো ওঠে, এই ধারণার বাস্তবায়নে যে সময় ও শ্রম ব্যয় হবে তার গুরুত্ব বিবেচনা করলে ধারণাটি কি যথেষ্ট সুফল বয়ে আনতে পারবে? কার্যবিবরণে নেই এমন সব কাজে কর্মীরা যদি মনোযোগী হয় তাহলে কি তা তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না?

গুগল এমন একটি সংস্থা যারা এই অন্টারপ্রেনিউয়ারের ধারণার চর্চা করে। গুগলের কর্মীরা কাজের বাইরেও প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে ভাববার এবং তা কাজে লাগাবার সুযোগ পায়। সংস্থাটির বিবেচনায় এতে তাদের ক্ষতির চাইতে লাভের পাল্লাই ভারী হয়। এই সংস্থার কর্মীরা তাদের ২০ শতাংশ সময় ব্যয় করে এমন সব কাজ করে, যেসব কাজের দায়িত্ব তাদের নয় কিন্তু তারা করতে আগ্রহী। ভাবছেন তো, কর্মীদেরকে কাজের বাইরে কাজ করতে দিয়ে গুগলের কী লাভ হলো? এর ফলেই জিমেইল, অ্যাডসেন্স এবং গুগুল অ্যাসিসট্যান্সের মতো জনপ্রিয় সেবাগুলোর উদ্ভাবন হয়েছে।

উদ্ভাবন যেহেতু আমাদের অন্যতম চর্চাযোগ্য মূল্যবোধ, কাজেই সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবনের তাগিদেই ব্র্যাক তার প্রধান কার্যালয়ের ২০০০ কর্মীকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং এই নতুন কর্ম-সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। ব্র্যাকএক্স একটি দলভিত্তিক প্রতিযোগিতা যা কর্মীদের অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি ইতিবাচক ফললাভের ক্ষেত্রে তাদের অনন্য ধারণাগুলোকেও সুরক্ষিত রাখবে। তারা যেসব সমস্যাগুলোর সমাধান করার চেষ্টা করেছে তা হয়তো ব্র্যাক এখনই মোকাবেলা করছে বা ভবিষ্যতে মোকাবেলা করবে এমন শঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এক্ষেত্রে ব্র্যাকের ভূমিকা কী? ব্র্যাক নির্বাচিত আইডিয়াগুলোর জন্য অনুদানের ব্যবস্থা ও কার্যক্রম বিস্তারে সহযোগিতা করবে।

ব্র্যাকএক্স ২০১৮ প্রতিযোগিতা ঘোষণার সাত মাস পর গত ২৩শে মে ২০১৮ তারিখে সেরা পাঁচটি প্রকল্পের ডেমো ডে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। উল্লেখ্য যে, প্রতিযোগিতার জন্য ১০০টির বেশি আইডিয়া জমা পড়ে। সেখান থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে আসে দশটি আইডিয়া টিম। এই টিমগুলোকে তিনদিনের একটি বুটক্যাম্প সেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বুটক্যাম্প তাদের আইডিয়ার বাস্তব সমাধান পেতে সাহায্য করেছে। এরপর প্রতিযোগিতার তৃতীয় পর্বে তারা বিচারকদের সামনে তাদের আইডিয়া উপস্থাপন করে। সেখান থেকে পাঁচটি দল নির্বাচিত হয়। আট সপ্তাহের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আবেদভাই ও ব্র্যাকের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ  এবং বিচারকম-লীর নিকট তারা তাদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা উপস্থাপন করে। বিচারকমন্ডলী এবং অতিথিদের প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর স্নেহ ও কোয়াক কোয়াক এই দুটি দলকে সম্মিলিতভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, পাঁচটি দলই তাদের আইডিয়া নিয়ে ব্র্যাকের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শুরু করবে। প্রতিটি দল প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য অনুদান হিসেবে দুই লক্ষ করে টাকা পাবে। তবে কোয়াক কোয়াক ও স্নেহ এ দুটি দলকে বিজয়ী ঘোষণা করার মাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

সেরা পাঁচটি মডেল হলো:

পাই: এমন একটি প্রকল্প যা জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (বিএসএফ) পালনের মাধ্যমে কম খরচে গবাদি পশুর খাবার তৈরি করবে।

কোয়াক কোয়াক: হাওরাঞ্চলের নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে হাঁসপালন প্রকল্প। ডিম হতে হাঁসের বাচ্চা তোলা থেকে শুরু করে বাজারে বিক্রি করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকবে।

স্নেহ: এলাকাভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার মডেল। এর ফলে পাড়ার বয়স্ক নাগরিক, শিশু ও কর্মজীবী নারীর মধ্যে যোগাযোগ গড়ে উঠবে।

রেড রুফ: একটি ব্যয়সাশ্রয়ী ও স্বল্প সময়ে যাতায়াতের জন্য পরিবহণসেবা। এটি জেলাভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এই মডেলে দেশের বিভিন্ন জেলার নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে রোগীরা গণপরিবহণে ওঠার সুযোগ পাবে।

ঐকতান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা প্রেরণের ব্যবস্থা যা বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে ভূমিকা রাখবে।

ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক জনাব আসিফ সালেহ্-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এনজিও ব্র্যাক কেন ব্র্যাক এক্স-এর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রয়োজন বোধ করল?’  এর উত্তরে আসিফ সালেহ্ বলেন, ‘আমরা যেসব সমস্যা মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি, তার সমাধানকল্পে যারা কাজ করছেন তাদের ধারণাই সবচাইতে স্পষ্ট এবং তারাই সেসব সমস্যার সমাধানে সবচাইতে গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে পারবেন। এজন্য আমরা মনে করি, কর্মীরা আমাদের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। তাদের অভিজ্ঞতা ও আগ্রহই ভবিষ্যতের ব্র্যাককে নতুন পথ দেখাবে।’

ব্র্যাকএক্স ২০১৮ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে  ব্র্যাক তার কর্মীদের শুধু ‘কাজের জন্য কাজ’ এ ধারণা থেকে বেরিয়ে ‘দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনকারী’তে রূপান্তরের জন্য বৃত্তের বাইরে পথচলাকে উৎসাহিত করছে। ব্র্যাকএক্স-এর সাফল্য দেশ ও দেশের বাইরের উন্নয়ন সেক্টরে একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও আশা করা যায়, প্রতিযোগিতাটি সময়ের সঙ্গে মানুষের পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of