বৈশাখের পথচলা হোক মঙ্গলময়

April 11, 2019

বাঙালি আরও একটি নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নতুন বছরের শুরুতে পেছনে ফেলে আসা পথ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বিগত সময়ের ব্যর্থতাগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে, এগিয়ে নিতে হবে আগামীর চিন্তাধারা।

নববর্ষ আজ দুয়ারে। বছরের শুরুতে তাই নতুন ক্যালেন্ডার শোভা পাবে বাড়ির দেয়ালগুলোতে। তখন পুরনোটা চলে যাবে সেখানে, যেখানে নিউজপেপারগুলো জমিয়ে ছোটোখাটো পাহাড় গড়া হয়েছে । সের দরে বিক্রির জন্য। সেই ক্যালেন্ডার তখন যেন গুরুত্বহীন। কিন্তু সত্যিই কি গুরুত্বহীন? মানুষ তার পুরনো স্মৃতিকথা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজের টুকিটাকি তথ্য সারা বছর তো এই ক্যালেন্ডারেই চিহ্নিত করে রেখেছিল। এর কি কোনো মূল্য নেই? আছে, তবে মানুষ তখন তা নিজের মনের ভেতরে জমিয়ে রাখে। যে জমানো নির্যাস থেকে আগামীর উপজীব্য তৈরি হয়। সুতরাং পেছনে ফেলে আসা বছরটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাংলা নতুন বছরের আগমন। ১৪২৬ সাল। বাঙালি আরও একটি নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নতুন বছরের শুরুতে পেছনে ফেলে আসা পথ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বিগত সময়ের ব্যর্থতাগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে, এগিয়ে নিতে হবে আগামীর চিন্তাধারা।

এদেশে নারী হয়রানি কিংবা নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে ঘরে ও বাইরে-জনাকীর্ণ পরিবেশে, বাসে, উৎসবে। এই ঘটনা রুখতে যে ব্যর্থতা, তা থেকেই মানুষের মধ্যে একধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে। ঠিক এ জায়গাগুলোতেই এ মুহূর্তে প্রয়োজন প্রতিরোধ গড়ে তোলা। প্রতিরোধের প্রথম ধাপ সৃষ্টি হবে প্রতিবাদ থেকেই। আপামর জনসাধারণের কাছ থেকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারে একটি সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা। ইতিবাচক পরিবেশ নির্মাণে সর্বদা নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকা জরুরি। নববর্ষ উৎসবে লক্ষ্য করা যায়, একশ্রেণির মানুষ উৎসবকে ঘিরে অশালীন কর্মকাণ্ড ঘটানোর সুযোগ খোঁজে। যা কি না নারী-স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ। আপনার সঙ্গে যদি এমনটা না ঘটে বা আপনি যদি সাবধানে থাকেন তাহলে হয়তো ভাবছেন, আপনি নিরাপদ। কিন্তু আসলেই কি নিরাপদ? উত্তর অবশ্যই, না। আপনি আজ যে অবস্থানটিকে নিরাপদ ভাবছেন, কাল তাতেও পড়তে পারে শকুনের শ্যেনদৃষ্টি। এইসব শকুনরা এখন আর অদৃশ্য নয়। তারা আমাদের আশেপাশেই চলমান। তাই শুধু সাবধানতা অবলম্বনেই মুক্তি নয়, বরং সাবধানতার বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসুন, আমাদের রুখে দিতে হবে সকল অন্যায়। মনে রাখবেন, নারীরা যদি ঘরবন্দি হয়ে যায় তাহলে আমাদের সমাজের অগ্রগতির পথটিই হয়তো রুদ্ধ হয়ে যাবে।

আমরা আশাবাদী। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা আজ আলোর ভূমিকায়। দেশ উন্নয়নে অনেকাংশে তারা পুরুষদের মতোই, কখনও-বা তার চাইতেও উজ্জ্বল। শুধু দেশ নয়, এই আলোকছটা ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বব্যাপী। এজন্য আমাদের সবাইকেই আগামী বছরগুলোতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

নারী স্বাধীনতার উজ্জ্বলতার পাশাপাশি নববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার হোক নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সম্প্রতিকালে সড়কে চলছে অনিয়মের অচলাবস্থা। সড়কে প্রাণ যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঘরে ফেরা নিয়ে  আজ আমরা সবাই নিশ্চিন্তে থাকতে পারছি না। আমাদের চাই নির্বিঘ্নে পথচলার নিশ্চয়তা। সেইসঙ্গে সচেতনতাও জরুরি। পহেলা বৈশাখ উৎসব পালনে সবাইকে হতে হবে সচেতন ও সাবধান। সড়কে পথচলতে ও পারাপারে হই সাবধান। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা।

ইদানীং মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ‘আগুন’। নিমতলী, আশুলিয়া, চকবাজার ট্র্যাজেডির পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা কতটা অসচেতন ও অনিয়মের মধ্যে দিয়ে নববর্ষকে বরণ করতে চলেছি। আসলে অনিয়ম কিংবা অসচেতনতা কোনো ভুক্তভোগীর একক সমস্যা নয়। সুতরাং এর সমাধানের জন্যও সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।

নারী নির্যাতন, নিরাপদ সড়ক কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো যদি শক্ত হাতে রোধ করা সম্ভব না হয় তাহলে এই অনাকাংক্ষিত ঘটনাগুলোই একসময় স্বাভাবিক ঘটনায় রূপ নেবে। এই ধারা রুখতে চাই সঠিক নীতিমালা। সঠিক নীতিমালা প্রণয়নে আমরা যদি ব্যর্থ হই তাহলে বছর ঘুরে আগামী নববর্ষেও আমাদের অশ্রুসজল চোখেই উৎসব পালন করতে হবে। মনে রাখা জরুরি, আজ যে অনিয়মের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে, তা চোখের পানিতে নেভানো সম্ভব নয়। তাই নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ ও প্রতিকারই হয়ে উঠুক সকল অনিয়মের মহৌষধ।

সকল ধর্মে-বর্ণে গড়া এই অসাম্প্রদায়িক পহেলা বৈশাখের উৎসব হয়ে উঠুক বাঙালির ভয়, আতঙ্কহীন পথচলার বাতিঘর।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of