বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কণিকার যুদ্ধ

March 4, 2018

সকল নির্যাতনের মূল হলো বাল্যবিবাহ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সচেতনতা গড়ে তুলতে সময় লেগেছে। ফলস্বরূপ, অকালে ঝরে গেছে অনেক প্রাণ, অনেক সম্ভাবনা।

‘বাল্যবিবাহ নিয়ে যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না তা না, হচ্ছে। এখন আমাদের প্রত্যেকের সতর্ক থাকতে হবে যেন আমাদের আশেপাশে কেউ বাল্যবিবাহ না দিতে পারে।’ ধীরে ধীরে কথাগুলো বলেন ব্র্যাককর্মী রুকসানা জামান কণিকা। বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ধীরে ধীরে এদেশের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন। তাঁর মতে, সকল নির্যাতনের মূল হলো বাল্যবিবাহ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সচেতনতা গড়ে তুলতে সময় লেগেছে। ফলস্বরূপ, অকালে ঝরে গেছে অনেক প্রাণ, অনেক সম্ভাবনা।

বিগত এক দশক ধরে কণিকার সামাজিক উন্নয়নের সাথে পেশাগত সম্পৃক্ততা। তবে ছোটবেলা থেকেই তিনি সবসময় মানুষের কল্যাণ এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন। গ্রামের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলেও তিনি তাঁর বাবাকে দেখতেন যখনই কোন দরিদ্র বা অভাবী মানুষ তাদের বাড়িতে সাহায্য চাইতে আসতেন, তিনি তাদের যে কোন ভাবে হোক সাহায্য করতেন; এমনকি নিজে না খেয়ে অন্যকে খাবার দিয়ে দেওয়ার ঘটনা তো অজস্র। জেন্ডার সাম্যতার বিষয়েও প্রাথমিক বাস্তবিক জ্ঞান তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকেই অর্জন করেছেন। কণিকারা তিন ভাই, তিন বোন। তাঁর বাবা সবসময় সকলকে বলতেন যে তিন মেয়েতে তাঁর কোন দুঃখ তো নেইই, বরং বাকি তিন ছেলেও যদি মেয়ে হতো তাও তিনি খুশি হতেন। বাবা আজ নেই, কিন্তু কণিকাকে নিয়ে আজ গর্ব করে তাঁর নিজের পরিবার, শ্বশুরবাড়ি এবং নিজের এলাকার মানুষ। তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ নির্যাতন বা বাল্যবিবাহের গ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া অগণিত নারী।

ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচির একজন ফিল্ড অফিসার (এফও) কণিকা। কর্মস্থল এই মুহূর্তে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর। স্বামী বর্তমানে অন্য একটি এনজিওতে কাজ করলেও এক সময় ব্র্যাকে কাজ করেছেন। তাই কাজ শুরু করার আগে থেকেই ব্র্যাক সম্পর্কে কণিকার একরকম ধারণা ছিল। প্রথম কর্মস্থল ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ এলাকায়। প্রথম চাকুরি বলে যেমন একটু টেনশন ছিল, আবার ভেতরে ভেতরে এক ধরণের রোমাঞ্চও কাজ করছিল। চাকুরিতে যোগদানের সময় কণিকার শ্বশুর নিজেও সাথে আসেন এবং কাজের ধরণ ও পরিবেশ দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ঠ এবং আশ্বস্ত হন।

চাকুরির শুরু থেকেই কণিকা ছিলেন কাজের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। পল্লীসমাজ মিটিং পরিচালনা, নিয়মিত অফিস ভিজিট, কোথাও কোন বাল্যবিবাহ বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে সেখানে সাথে সাথে ভিজিট, ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও হেড অফিসসহ যথাস্থানে পাঠানো, ভুক্তভোগীদের কি ধরণের সহায়তা প্রদান করা যায় সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রয়োজন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা অফিসে যোগাযোগ ইত্যাদি ছিল তাঁর দৈনন্দিন কর্মকান্ডের অংশ। সময়ের সাথে সাথে দায়িত্ব বাড়লেও এগুলো এখনও তাঁর নিয়মিত কাজ। এছাড়াও যেসব স্থানে বাল্যবিবাহ প্রদানের প্রবণতা বা নির্যাতনের হার বেশি সে সকল স্থানে গণনাটক আয়োজন করাও তাঁর কাজ।

ব্র্যাকজীবনের অসংখ্য ঘটনার মধ্য একটি ঘটনা বিশেষভাবে কণিকার মনে দাগ কাঁটে। তাঁর চাকুরির শুরুর দিককার কথা। এক ভিজিটে গিয়ে কণিকার একজন বৃদ্ধার সাথে পরিচয় হয়। তিনি জানান চার বছর পূর্বে তাঁর মেয়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। সালিশ ছিল ৩৫ হাজার টাকার। কিন্তু বৃদ্ধা বা তাঁর মেয়ে কেউই সেই টাকা তখন পর্যন্ত হাতে পাননি। যে কর্মী এর দায়িত্বে ছিলেন তিনি অজ্ঞাত কারণে চাকুরি ছেড়ে চলে যান সালিশের টাকাসহ। টাকার অভাবে বৃদ্ধা মেয়েরও আর বিয়ে দিতে পারেননি।

ঘটনাটিতে কণিকা যারপরনাই মর্মাহত হোন। তাঁর বাবা এবং শ্বশুর উভয়েই শিক্ষক এবং সর্বদা তাকে সৎপথে চলার উপদেশ দিয়ে আসছেন। বঞ্চিত, অভাবী নারীদের তিনি নিজে একসময় বিনামূল্যে সেঁলাই শেখাতেন যাতে তারা নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন। অথচ তাঁর কিনা এমন একটি ঘটনা শুনতে হলো, তাও কিনা আবার নিজের একজন সহকর্মীর বিষয়ে! তিনি তৎক্ষণাৎ সেই সাবেক কর্মীর সন্ধান জোগাড় করতে উঠে পড়ে লাগেন এবং সন্ধান পেয়েও যান। তাকে মোবাইল ফোনে তিনি যোগাযোগ করেন এবং খুবই বিনীতভাবে কোন ধরণের রাগারাগি না করে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করেন। সবশেষে নিজের অফিসের ঠিকানা দিয়ে তিনি ঐ ব্যক্তিকে এও বলেন যে টাকাটি যদি কোনভাবে ফেরত পাঠানো যায় তবে পরিবারটির খুবই উপকার হতো।

১০-১২ দিন পরের কথা। তিনি অফিসে বসে কাজ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর নামে একটি খাম এলো। খুলে দেখলেন সেখানে ঠিক ৩৫ হাজার টাকা! তিনি অবাক হলেন, বিস্মিত হলেন এবং সর্বোপরি অত্যন্ত খুশি হলেন। এই ঘটনা থেকে তিনি বুঝলেন কেউ যদি অসৎ পথে কখনও যেয়েও থাকে, ভালো করে বুঝিয়ে তাকে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

আরেকদিনের ঘটনা। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। দু:খজনকভাবে এটা ঘটে নিজের পরিবারেই। একদিন শুনতে পান তাঁর মেজো ভাইয়ের ঘর থেকে ভীষণ গোলমালের আওয়াজ আসছে। মেজো ভাই এমনিতেই রাগী, তার উপর সেদিন যেন একদম মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। রাগারাগির এক পর্যায়ে তিনি তার স্ত্রীকে ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করেন। এই দৃশ্য দেখে কণিকা নিজেকে সামলাতে পারলেন না আর। তিনি অবিরাম কাঁদতে থাকেন এবং বারবার বলেন আর কখনও যেন ভাবীর সাথে তিনি এমন না করেন। ভাই তাঁর কথা শোনেন, আজ অবধি আর কোনদিন তিনি স্ত্রীকে আঘাত করেননি।

এমন বহু ঘটনার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সাক্ষী কণিকা। এমনও হয়েছে পল্লীসমাজ মিটিং-এ যোগ দিয়েছে বলে ঘরের ভেতর থেকে একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছিলেন। শুনে এগিয়ে যান কণিকা, বরাবরের মতোই দৃপ্ত পদক্ষেপে। তিনি সেই স্বামীকে বোঝান পল্লীসমাজে যা শেখানো হয় তা উপকারী, চাইলে পুরুষেরাও এখানে আসতে পারেন। এরপর তিনি শান্ত হন এবং মিটিং-এও আসেন। পরবর্তীতে তিনি পল্লীসমাজের মিটিং-এ নিয়মিত অংশ নিতে শুরু করেন।

প্রথম কর্মস্থল রায়গঞ্জে কণিকার অনেক স্মৃতি। তিনি আট বছর আগে সেখান থেকে চলে এসেছেন, তবু আজও সেখানকার সহজ সরল, সাদাসিধে মানুষের সাথে তাঁর যোগাযোগ আছে। যেখানেই তিনি যান, মানুষ তাঁকে চেনে ‘আইন আপা’, বা ‘সাংবাদিক’ নামে। কারণ তিনি নির্ভয়, নিজের শ্বশুরবাড়িতে প্রতিবেশির বাড়িতে ঘটে যাওয়া নির্যাতনও তিনি ঠেকিয়েছেন আবার নির্যাতন বা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এলাকার চেয়ারম্যান বা পুলিশ কর্মকর্তা কারও শরণাপন্ন হতেই তিনি পিছপা হননা।

ব্র্যাকের বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার যে দর্শন তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে নারী নির্যাতন বা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পুরুষদেরও সম্পৃক্ত করছেন কণিকা। ইভটিজিং প্রতিরোধ, নারীদের শিক্ষায় উৎসাহ দিতে পুরুষদের তিনি বরাবরই উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। কণিকার মতো সক্রিয় সমাজকর্মীদের জাদুর স্পর্শে একদিন পৃথিবীটা হবে সবার জন্য বসবাসযোগ্য এবং সুন্দর, এমন আশা আমরা করতেই পারি।