পহেলা বৈশাখ:
ঐতিহ্যের বর্ষবরণ

April 11, 2018

পহেলা বৈশাখ হচ্ছে লোকজের সাথে নাগরিক জীবনের একটি সেতুবন্ধন। ব্যস্ত নগর কিংবা গ্রামীন জীবন যেটাই বলা হোক না কেন, এই নববর্ষই বাঙালী জাতিকে একত্রিত করে জাতীয়তাবোধে।

সময়ের পরিক্রমায় বিষয়গুলো কত সহজ হয়ে যাচ্ছে! এখন অল্পক্ষনেই কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে মানুষ তার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। কয়েক দশক আগেও তো আমরা এমন ভাবতে পারিনি। যদিও সব ক্ষেত্রে এই কম্পিউটার ব্যবহারের প্রচলন যে ঘটেছে তা বলা যাবে না। এখনো অনেক ক্ষেত্রে রেজিষ্টার খাতার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা তাদের হিসাব কষে থাকেন।

ব্যবসাক্ষেত্রে হিসাব রাখার যে রীতি সেটা এক সময় করতো হালখাতা। বছর শেষে ব্যবসায়ীরা নিজেদের দেনাপাওনার হিসাবনিকাশ তাদের ক্রেতাদের কাছে প্রদান করেন বা বুঝে নেন, এই প্রক্রিয়া যে উৎসবের মাধ্যমে পালন করা হয়, তাই যুগে যুগে হালখাতা অনুষ্ঠান নামে পরিচিত হয়ে আসছে। আজও তার গ্রহণযোগ্যতা এতটুকু কমেনি। বরং সময়ের সাথে সাথে আজ সেটা পরিণত বাঙ্গালীর উৎসবে। বাংলা নতুন বছরের উৎসব, বাঙালির প্রাণের উৎসব, পহেলা বৈশাখ।

শুরুর দিনগুলো আজকের মতো উৎসবের ছিল না। সময়ের প্রয়োজনে এই উপলক্ষের আগমন। ইতিহাসের পাতা থেকে যেটি জানা যায়, হিন্দু সৌরপঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। যে সময় প্রযুক্তির সুবিধা না পাওয়ায় কৃষকদের কৃষিকাজের হিসাবাদি ঋতুর উপরই নির্ভরশীল ছিল।

মুঘল সম্রাটেরা তাদের কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতো হিজরী সন অনুসারে। হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল, ঋতুর সাথে নয়। যে কারণে খাজনা প্রদান কৃষকদের জন্য পরিণত হতো শোষণে। পরিবর্তনটা আনলেন সম্রাট আকবর। কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা, মাশুল, শুল্ক আদায় করতেন চৈত্র মাসের শেষ দিনে। আর পরের দিনটি থাকতো পহেলা বৈশাখ। এই দিনটিতে ভূমি মালিকেরা তাদের অঞ্চলের মানুষদেরকে আপ্যায়ন করতেন বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্বারা, খোলা হতো হিসাব মেলানোর হালখাতা। এভাবেই শুরু নববর্ষের আগমনী অনুষ্ঠান, যা বিভিন্ন সামাজিক পরিবর্তন, পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে আজকের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

পহেলা বৈশাখ হচ্ছে লোকজের সাথে নাগরিক জীবনের একটি সেতুবন্ধন। ব্যস্ত নগর কিংবা গ্রামীন জীবন যেটাই বলা হোক না কেন, এই নববর্ষই বাঙালী জাতিকে একত্রিত করে জাতীয়তাবোধে। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরাসহ দেশে বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালী এই দিন নিজ সংস্কৃতিতে নিজেকে খুঁজে পায়। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান পরিণত হয় প্রতিটি বাঙালীর কাছে শিকড়ের মিলন মেলায়। ধর্ম, বর্ণ সকল পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে বাঙালী জাতি এই নববর্ষকে সাদরে আমন্ত্রণ জানায়। গ্রামীণ মেলাগুলো পরিনত হয় উৎসবে। এই উৎসবের রংই একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে বাঙালী জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে বারবার।

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার জন্য এদেশের মানুষ সব সময়ই আন্তরিক, অকৃত্রিম ও অগ্রগামী। দীর্ঘ প্রস্তুতির বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে অনেক আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সব পেশার মানুষ। বৈশাখী মেলা হালখাতা অনুষ্ঠান কিংবা নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় এই নতুন বছরকে আমন্ত্রণ জানাতে। বাংলার পটশিল্পীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসে। পটশিল্পে জায়গা করে নেয় আমাদের গ্রামীণ জীবনের নানা কথা। লোকজ ব্যবহারিক তৈজসপত্রের বিভিন্ন অংকন শিল্প আমরা খুঁজে পাই এই পটচিত্রের মাধ্যমে। শিল্পী তার রঙ্গীন আল্পনায় স্বপ্ন দেখে আগামী দিনের। নিজ সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠে বাঙালী জাতির প্রজন্ম।

নগরকেন্দ্রিক ব্যস্ততাকে পিছে ফেলে সমস্তশ্রেনী পেশার মানুষ এই দিনটিকে সাদরে বরণ করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমুহ ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা সকল অপসংস্কৃতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো ২০১৬ সালে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে। বাঙালী সংস্কৃতির জন্য যা ছিল একটি বিশাল অর্জন। এছাড়া রমনার বটমূলসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয় সংগীত, নৃত্যকলা কিংবা আবৃতি। এই শিল্পগুলোর প্রতিটিই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়কে। বরণ করে নেয় নিজ পরিচয়ের নববর্ষকে।

নববর্ষের এই উৎসব নারী পুরুষ সকলের। উৎসবে যোগ দেয়ার স্বাধীনতাও সবার সমান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নারী হয়রানি এবং নির্যাতনের বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যাচ্ছে উদযাপনকালে, উৎসবস্থলে। এটি আমরা মেনে নেব না। এবারের নববর্ষের শুভক্ষণে মুছে যাক বিগত বছরের জরা এবং গ্লানি, যার মধ্যে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো। সকলের প্রতি আহবান, যার যার অবস্থান থেকে, বছরের প্রথম দিনটি থেকেই সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধ গড়ি, প্রতিকার করি।

একটি জাতি যখন তার নিজ সংস্কৃতিতে বলিষ্ট হয় তখন তাকে কোনো অপসংস্কৃতি, কু-সংস্কার গ্রাস করতে পারেনা। তাই নিজ সংস্কৃতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা শিল্পগুলোর নিয়মিত চর্চার প্রয়োজন। যে কোন জাতির কাছেই তার নিজ সংস্কৃতিই সেরা এবং আপন। বিশ্বায়নের এই যুগে নিজেদের সংস্কৃতির রক্ষায় এবং বিস্তারে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির ছায়াতলে অবস্থান নিতে হবে। অন্যান্য সংস্কৃতির সাথেও আমরা পরিচিত হব, তবে তার আড়ালে যেন ঢেকে না যায় আমাদের যা স্বকীয়তা। বাঙালি হিসেবে নিজ সংস্কৃতির প্রতি আমাদের আছে দায়বদ্ধতা। পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব আমাদের প্রতিনিয়ত আলোর পথ দেখাতে সাহায্য করে। আমাদের সংস্কৃতিই হোক আমাদের শেষ আশ্রয়।