নির্ভীক ব্র্যাককর্মীদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া কিছু পদক্ষেপ

March 22, 2020

ব্র্যাক তার নিবেদিতপ্রাণ, লড়াকু কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যেন তারা নিজেরা নিরাপদ থেকে সবাইকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন এবং সকলকে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করতে পারেন।

কোভিড-১৯ যেন পুরো পৃথিবীটাকে হঠাৎ স্তব্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কিছুই। রোজই বন্ধ হচ্ছে নতুন কিছু। এমন পৃথিবী আমরা কেউ দেখিনি আগে।

কিন্তু সবকিছু থেমে নেই। অনেক মানুষ কাজ করছেন অবিরাম, অক্লান্ত- অন্য মানুষদের নিরাপদ রাখতে। তাই আমাদের অনেককেই এখন আগের চাইতেও কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

করোনাভাইরাস থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখার কাজকে একেবারে সামনে থেকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করছেন এবং কোভিড-১৯ সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও শিক্ষা সরবরাহ করছেন আমাদের অনেক কর্মী। এছাড়াও চিকিৎসক, নার্স, সেবাদানকারী, সুপারমার্কেটের কর্মী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণ কর্মীরা সকলেই ভাইরাস সংক্রমণ রোধে একযোগে দিন-রাত কাজ করছেন।

ব্র্যাকের এক লাখেরও বেশি কর্মী এভাবেই সরাসরি মোকাবেলা করছেন এই মহামারি। শহরে, গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় তারা একেকটি জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গিয়ে, বস্তি এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কোভিড-১৯ এর ছড়িয়ে পড়া রোধে তথ্য ও প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

ব্র্যাক তার এই নিবেদিতপ্রাণ, লড়াকু কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে যেন তারা নিজেরা নিরাপদ থেকে সবাইকে নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করতে পারেন। এখানে তাদের সুরক্ষার ৬টি ধাপ নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১. গ্লোবাল টাস্কফোর্স গঠন

ব্র্যাক, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল, ব্র্যাক ইউএসএ এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথের জনস্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞগণকে নিয়ে কোভিড-১৯ গ্লোবাল টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাক্সফোর্স আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো যেমন, সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-র সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং সে অনুযায়ী ব্র্যাকের লিডারশিপ টিমকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছে।

২. মাঠ পর্যায়ের সকল অফিসে দ্রুত ও সুস্পষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা

করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে আমাদের কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত তার একটি তালিকা পরিপত্র হিসেবে বাংলাদেশের নিয়মিত ও অনিয়মিত প্রায় এক লাখ ব্র্যাককর্মীর কাছে পৌঁছে গেছে। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক স্বাক্ষরিত পরিপত্রটি এই মহামারি প্রতিরোধে ব্র্যাকের প্রত্যেকের কণ্ঠস্বরকেই যেন তুলে ধরেছে।

ব্র্যাককর্মী, ক্লায়েন্ট এবং অন্যান্য সেবাগ্রহণকারীদের সচেতন করতে করোনাভাইরাসের লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কিত ৪০০০টি ব্যানার ২৭০০টি ফিল্ড অফিসের প্রধান ফটকের কাছে রাখা হয়েছে। যাতে তারা আসা-যাওয়ার পথেই তা দেখতে পায়।

৩. সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি প্রদান এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা

মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে কর্মীদের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাত ধোয়ার স্থানে সাবান, টিস্যু, পরিষ্কার তোয়ালে এবং পর্যাপ্ত পানির সুব্যবস্থা আছে। অফিসে আসার পর থেকেই কিছুক্ষণ পরপর কর্মীরা হাত ধুয়ে থাকে। আমরা স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের সাথে অনলাইন ওরিয়েন্টেশন সেশন পরিচালনা করছি, তৈরি করা হয়েছে প্রশিক্ষণ মডিউল এবং ভাইরাস প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ওয়েব পোর্টাল brac.net/covid19

৪. স্বাস্থ্য এবং সুস্থতাকে প্রাধান্য দেওয়া

আমাদের কোনো সহকর্মীর মধ্যে যদি করোনার লক্ষণ (জ্বর, হাঁচি-কাশি, শ্বাসকষ্ট) প্রকাশ পায় তাহলে তিনি বাড়িতে থেকে কাজ করবেন। এজন্য বেতন বা ছুটি কোনোটাই কাটা যাবে না। ইতিমধ্যে প্রধান কার্যালয়ের ২,৪০০ কর্মীকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাড়িতে থেকে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। কর্মীদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত জনসমাগম ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন স্থান ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

৫. ব্র্যাক পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া

কীভাবে নিজে এবং অন্যদের করোনা থেকে সুরক্ষিত রাখা যায় এই সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বার্তা ইতিমধ্যে ব্র্যাকের বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতা-কর্মী এবং অফিস সহকারীসহ সকল কর্মীর কাছে পৌঁছে গিয়েছে। দিনে ৩-৪ বার তোয়ালে বদলে রাখা হয়, জীবাণুনাশক দিয়ে দরজার হাতল, টেবিল, চেয়ারগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। যেখানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ছিল না সেখানে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া এবং যেখানে অপ্রতুল রয়েছে সেখানে প্রয়োজনে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কুরিয়ারদের অহেতুক ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

৬. মাঠ পর্যায়ে কার্যাবলির সিদ্ধান্ত গ্রহণ

স্পেশাল ফিল্ড-লেভেল কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনাশক সামগ্রী ক্রয় করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মনিটরিং করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্র্যাকের সকল কর্মসূচির ব্যবস্থাপকগণ, ব্র্যাক জেলা প্রতিনিধি, মানবসম্পদ এবং অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মীদের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সংস্থাগুলো তাদের কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এই দুঃসময়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা, জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান, ভুল বোঝা বা আতঙ্ক দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়তে সকলকেই একসাথে কাজ করতে হবে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of