নির্জন দ্বীপে পরীক্ষার প্রস্তুতি

December 7, 2017

জমিটা নাকি ভুতূড়ে। একদম শুরুর দিকে রাতের বেলা যিনি জমি পাহারা দিতেন, তিনি একজন স্থানীয় লোক। কথায় কথায় রাগে গজগজ করতে করতে বলতেন, “ভূতের জমিতে স্কুল করার মজা এবার সবাই বুঝবে। কয়েকটাদিন খালি যাক।“

দেখতে দেখতে কিন্তু তিন বছর পার হয়ে গেল। ভূতের উপদ্রব যদি এই জমিতে থেকেও থাকে, তবে তারাও নিঃসন্দেহে পালিয়ে গেছে। জেএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে গত তিনমাস ধরে এখানে থেকেছে ৭৪ জন প্রাণবন্ত কিশোর-কিশোরী।

ওদের সাথে থাকেন আরও ৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। স্কুলের হেডস্যার আব্দুল মালেক যাঁদেরকে বলেন ‘ফাইটার’।

হেডস্যারসহ এই ৬ জন ‘ফাইটার’ একাধারে রাতের বেলা এই ভূত তাড়ানো কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধু এবং সর্বোপরি, নিরাপত্তার আশ্রয়।

আচ্ছা, জায়গাটার নামই তো বলা হয়নি! সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার স্বরমঙ্গল গ্রাম। জায়গাটা দেশের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার অন্তর্ভুক্ত। দিনের বেলা যতদূর চোখ যায় কেবল পানি, মাঝে মাঝে চোখে পড়ে পানি ভেদ করে মাথা উঁচু করে জেগে থাকা কিছু ফসলের মাঠ।

আমাদের এই স্কুলের নাম ‘আলোর দিশারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। আশেপাশের প্রায় ৮ বর্গকিমি এলাকায় এটিই একমাত্র মাধ্যমিক স্কুল। দুই বছর ধরে এখান থেকে শিক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সম্প্রতি জেএসসি অর্থাৎ জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। অনুমোদন পেয়ে যাওয়ায় শীঘ্রই এই স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করতে পারবে।

ব্র্যাক পরিচালিত ‘আলোর দিশারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে’ নৌকাযোগে ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত। প্রতিদিন সকাল আটটায় দুটি নৌকা স্কুল থেকে রওনা হয়। উদ্দেশ্য হলো, থমকে যাওয়া জনজীবনে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা যেন থমকে না যায় সেজন্য বাড়ি থেকে তাদেরকে স্কুলে নিয়ে আসা। আলাদা রুটে আশেপাশের সাত-আটটি গ্রামে নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে দাঁড়ায় নৌকা দুটি। শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যাগ, ছাতা এবং টিফিন বাটিসহ নৌকায় ওঠে। এই এলাকায় হয় তীব্র রোদ, নয় মেঘলা আকাশে যে কোন সময় বৃষ্টির সম্ভাবনা, তাই দুই ক্ষেত্রেই ছাতা অপরিহার্য।

কিছু কিছু বাড়ি থেকে নৌকায় ওঠে শুধু টিফিন বাটি। মায়েরা দিয়ে দেন। জানা গেল, এই খাবার জেএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য যারা সেসময় স্কুলেই থাকছিলো। পানিপ্লাবিত পথে দিনে একাধিকবার স্কুলে যাতায়াত বেশ দূরহ। তাই পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের বিশেষ অনুরোধে ‘আলোর দিশারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে’ নেওয়া হয়ে থাকে এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ- যাকে বলা হচ্ছে ‘নাইট স্কুল’।

দিনে সেখানে নিয়মিতভাবে ক্লাস হয়। শুরু হয় সকাল ১০টায় অ্যাসেম্বলি দিয়ে। স্কুলে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পাঠদান চলে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার্থীরা দিনের বেলা মডেল টেস্ট দিতে ব্যস্ত থাকে। তাদেরসহ স্কুলের অন্যান্য ছাত্রছাত্রীর জন্য দুপুর ১২.৪৫-এ রয়েছে ‘মিড ডে মিল’ ব্যবস্থা। দুপুর ২.৩০-এ দুপুরের খাবার। বিকেল ৪.৩০ এ ছুটি। পরীক্ষার্থী বাদে অন্যরা নির্দিষ্ট নৌকায় উঠে যার যার বাড়ির পথে রওনা হয়। তাদের নামিয়ে দিয়ে ফেরার পথে নৌকায় আবার পরীক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে রাতের খাবার নিয়ে আসা হতো।

যে দুইটি নৌকা ছাত্রছাত্রীদের আনা নেওয়া করে থাকে, তার একটির মাঝি হলেন মোঃ আইনুর। তিনি জমিতে ধান চাষ করতেন, যার কিছুই এবার তুলতে পারেননি। নিজের সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থ ব্যয় করে একটি নৌকা বানিয়ে নিয়েছেন, এটাই এখন তার একমাত্র আয়ের উৎস। “ছাত্রছাত্রীরা খুবই ভালো। নৌকায় ওদের সাথে গল্প করলে বা ওদের দুষ্টামি দেখলে সব দুঃখ কষ্ট কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাই।“

‘নাইট স্কুল’ কার্যক্রমে অভিভাবকগণ সন্তুষ্ট এবং পুরোপুরি নির্ভার। তাঁরা জানেন ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ার সময় পড়ে, অবসরে যে যার মতো খেলাধুলা করে বা গল্প করে, সন্ধ্যা সাতটা থেকে আবার স্যারেরা তাদের দু’টি ক্লাসরুমে ক্লাস নেন। ক্লাস শেষে ক্লাসরুমেই তারা রাতের খাবার খায় এবং নিজেরাই টেবিল-চেয়ার সব সরিয়ে মাদুর এবং চাটাই পেতে ক্লাসরুমেই নিজেদের ঘুমানোর বন্দোবস্ত করে নেয়। বলা বাহুল্য, মেয়েদের থাকবার জায়গায় সন্ধ্যার পর ছেলেদের যাওয়া নিষেধ।

আবাসিক পরীক্ষার্থীরা রাতের খাবারের পর রাত ১১.৩০ বা ১২টা পর্যন্ত পড়াশোনা করে। বছরে ৬ মাস বা তার বেশি এই এলাকা থাকে পানির নিচে তাই একে মাঝে মাঝে নির্জন দ্বীপের মতই মনে হয়। আশেপাশে আর কোনো স্থাপনা না থাকায় দিনের আলো পড়ে যাওয়ার পর এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। স্কুলের উঠোনে আছে একটি লাইটপোস্ট। কিছু ছাত্র সান্ধ্যকালীন ক্লাস শেষ হওয়ার পর সেই লাইটপোস্টের আলোর নিচে টেবিল চেয়ার পেতে পড়াশোনা করে। তখন যেন এক মায়াবী দৃশ্যের অবতারণা হয়! নির্জন এলাকায় কেবল পানি আর পানি, মাঝখানে একটুকরো ছোট্ট দ্বীপ, সেখানে চলছে শিক্ষার চর্চা। এ যেন হাওরবাসীর চিরকালীন রোমাঞ্চকর এবং সংগ্রামী জীবনযাপনের এক অপূর্ব ছবি!

হাওর এলাকায় ৭ জেলা মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি মানুষের বাস। স্কুল থেকে ঝরে যাওয়ার হার এখানেই সবচেয়ে বেশি। শতকরা মাত্র ১%, বা তারও কম সংখ্যক ছাত্রছাত্রী এখানে মাধ্যমিক পর্যায় শেষ করতে পারে। স্বরমঙ্গল ছাড়াও একই উপজেলায় দত্তগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চালু আছে এই ‘নাইট স্কুল’ কার্যক্রম। সেখানে জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে আরও ৪৯ জন ছাত্রছাত্রী।

এক সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে কাজ করছি আমরা। আর এই সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে দুর্গম এলাকায়, নগরকেন্দ্রিক জীবন থেকে অনেক দূরে যার অবস্থান। শিক্ষাই আলো, এই ব্রতকে মূলমন্ত্র ধরে এগিয়ে চলছে ‘আলোর দিশারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। তাদের আলোয় আরও আলোকিত, আরও সুন্দর হোক পৃথিবী।