দারিদ্র্য বিমোচনে আমার অভিজ্ঞতা

October 15, 2020

দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হলে পূর্বের অবস্থা বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্যের বর্তমান অবস্থা, এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাকে পরিকল্পনায় রূপ দিয়ে কাজ করতে হবে। সকলকে নিয়ে গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে গ্রামের সকলের কাজের ব্যবস্থা করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করা, বিভিন্নরকম কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে অবদান রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগের বিকল্প নেই।

ব্র্যাকের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারছেন তিনি। ভালো-মন্দের উপলব্ধিবোধ ও ইচ্ছেশক্তি জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি সামান্য সহায়তা পেলে মানুষ কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে তা তিনি শিখেছেন দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকেই। যা তাকে উজ্জীবিত করে, এগিয়ে যেতে পথ দেখায়।

চাকরির প্রথমদিকে ব্র্যাককর্মী মোঃ সিদ্দিকুর রহমান কখনও চিন্তাই করেননি যে একদিন পুরো ফিল্ড অপারেশনের দায়িত্বে তিনি থাকবেন। তবে, মনে আশা ছিল একসময় ম্যানেজমেন্টে কাজ করবেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি দেখেছেন মানুষের ক্ষুধার কষ্ট, দেখেছেন চরম দারিদ্র্য। মানুষ তিনবেলা তো দূরে থাক দুবেলাও ঠিকমতো খেতে পারছে না। ছোটো একটি খুপরি ঘরে পরিবারের সবাই কোনোরকমে থাকে, ছেঁড়া কাপড় পরে। এমনও দেখেছেন, মাত্র একশ টাকা পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছে সারাদিন।

আজ কর্মজীবনে পদোন্নতির বেশ কয়েক ধাপ পেরিয়ে এসেছেন সিদ্দিকুর রহমান। ২০০৩ সালের ১২ই এপ্রিল তিনি ব্র্যাকে যোগ দেন। কর্মস্থল ছিল কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী এলাকায়, পদবী ছিল কর্মসূচি সংগঠক (পিও)। তিনি যোগ দেন ব্র্যাকের আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে (ইউপিজি), সেসময় যা ‘টার্গেটিং আলট্রা-পুওর’ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে একজন ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন, ১২টি অঞ্চলের অপারেশন বিষয়ক সকল কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করছেন।

গত ১৭/১৮ বছরে এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আগেও কর্মীদের পরামর্শ সদস্যরা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, পালন করার চেষ্টা করতেন। এখনকার সদস্যরা আরও বেশি সচেতন! যখন তাদের প্রোগ্রামের কাজ সম্পর্কে জানানো হয়, উৎপাদনশীল সম্পদ নিয়ে কথা বলা হয়, তখন তাদের অনেক প্রশ্ন থাকে, নিজেরা মতামত প্রদান করেন। সার্বিকভাবে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, যেমন: মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে সুযোগ বেড়েছে, মানুষের আয়ের উৎস বেড়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে ইত্যাদি।

এরপরও, জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বমূল্য এবং নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ আজও দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

সিদ্দিকুর রহমান যাদের জন্য কাজ করেছেন তাদের অধিকাংশের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রক্ষা করেন। সদস্যরা যখন ভালো কিছু করেন বা কোনো পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তাকে ফোন করেন। কাজের সূত্রেই এমন অনেক ঘটনা আছে যা সদস্যদের মনে দাগ কেটে গেছে; সিদ্দিকুর রহমানকেও মনে রেখেছেন অনেকে।

২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলায় শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সেসময় সবজিচাষি ১২ জন সদস্যকে খুব অল্প দামে ব্র্যাকের নামে জমি কিনে চাষাবাদের জন্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে জমিগুলো কেনা দামে উক্ত সদস্যদের দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৬ সালে উক্ত ১২ জন সদস্যকে একদিনে জমিগুলো যখন রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয় তখন রেজিস্ট্রি অফিসে ১২জন সদস্য খুশিতে কেঁদে ফেলেছিলেন।

অতীতে জমিগুলো কেনা হয়েছিল ২০০০-৫০০০ টাকা শতক হিসেবে আর যখন তাদের রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয় তখন জমির মূল্য ছিল ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ হাজার টাকা শতক। কিন্তু সদস্যরা ২০০০-৫০০০ টাকা শতকেই জমিগুলো কিনতে পেরেছিল এবং প্রত্যেককে ২০ থেকে ২৫ শতক জমি দেওয়া হয়েছিল।

আরও একটি ব্যাপার আজও তার মনকে নাড়া দেয়। আগের দিনে বিয়ে রেজিস্ট্রি করার প্রচলন ছিল না। অনেক দম্পতির বিয়ে রেজিস্ট্রি না থাকায় সংসারে ঝগড়া-বিবাদ এবং তালাকের প্রবণতা বেশি ছিল। পারিবারিক সমস্যা সমাধানে তাই তিনি নতুনদের পাশাপাশি পুরোনো দম্পতিদের বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে ভূমিকা রাখেন।

সিদ্দিকুর রহমান তার দীর্ঘ ব্র্যাকজীবনে দেখেছেন নানা ধরনের পরিবর্তন। সময় তথা পরিস্থিতির সাথে এই পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। যদি পরিবর্তন না আনা হতো তাহলে হয়তো কর্মসূচির ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হতো না। করোনার জন্য দেশে অঘোষিত লকডাউন থাকার কারণে দরিদ্র মানুষদের বেশিরভাগই তাদের কাজ হারিয়েছেন, যার ফলে সার্বিকভাবেই অতিদারিদ্র্যের হার বাড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে হলে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সকলের জন্যই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে হবে এবং তাদেরকে বাজারের সাথে যুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হলে পূর্বের অবস্থা বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্যের বর্তমান অবস্থা, এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাকে পরিকল্পনায় রূপ দিয়ে কাজ করতে হবে। সকলকে নিয়ে গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে গ্রামের সকলের কাজের ব্যবস্থা করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করা, বিভিন্নরকম কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে অবদান রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগের বিকল্প নেই। দারিদ্র্য বিমোচনে গ্র্যাজুয়েশন অ্যাপ্রোচ খুবই কার্যকর একটি মডেল, সরকার যদি এই মডেলটি গ্রহণ করে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রজেক্টে তা ব্যবহার করে তাহলে এই দেশে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে তার একটি স্মৃতি কথা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। ২০১৬ সালের দিকে একবার আবেদ ভাই ডকুমেন্টারি করার জন্য রংপুর আসেন। সকালবেলা সবাই জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য লাইন ধরে দাঁড়ালে আবেদ ভাইও এসে সকলের সাথে দাঁড়ালেন। এরপর সবাই ছবি তোলার জন্য তার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন কিন্তু কেউ তাঁর সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। আবেদ ভাই নিজেই বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং আমাদের সবাইকে ডেকে নিজেই ছবি তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এতো বড়ো মানুষ হয়েও সকলের সাথে সহজভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে সত্যিই অবাক করে।

 

সম্পাদনা: তাজনীন সুলতানা, সুহৃদ স্বাগত, তানিয়া তাসনিন
সমন্বয়: কামরান কাদের

4 4 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments