দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দারিদ্র্যকে বুঝতে হবে

October 17, 2019

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসথার ডুফলো ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬টি দেশে স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়িত পরীক্ষামূলক গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্পের উপর গবেষণা পরিচালনা করেন। অতিদারিদ্র্য বিমোচনে আজ তারা যে নতুন নতুন ধারণাগুলো নিয়ে আসছেন, এই গবেষণাগুলো থেকে সে বিষয়ক শিক্ষা তারা গ্রহণ করেছেন।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তাদের লড়াই বড়ো দীর্ঘ। দারিদ্র্য বিমোচন সম্পর্কে বলতে গিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দরিদ্রদের হাতে টাকা দিলেই তারা নষ্ট করে ফেলে। কারও কারও ধারণা দরিদ্র মানেই অলস, কাজ করতে চায় না। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, দরিদ্র মানুষের জীবন কেমন, কেন বংশপরম্পরায় একটি পরিবার দরিদ্রই থাকে-এসব বিষয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। আর দারিদ্র্যের পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা হয় না বলেই ব্যক্তিগত অর্থ সাহায্য থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনেক সময়ই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে না।

আমি ব্র্যাকের আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে কাজ করি। বাংলাদেশে ২০০২ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। গত চার বছরে ব্র্যাকের আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে কাজ করতে করতে দারিদ্র্য বিষয়ে আমার অনেক ধারণাই পাল্টে গেছে।

সব দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা এক নয়
একটি দরিদ্র পরিবার যে শহরের আশেপাশে থাকে আর যে দরিদ্র পরিবার প্রত্যন্ত উপকূলে থাকে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উপকূলে থাকা পরিবারটির আর্থিক সমস্যা ছাড়াও অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি নানাবিধ কারণে প্রথম পরিবারটির চাইতে বেশি প্রান্তিক। বাসাবাড়িতে কাজ করা যে নারীর স্বামী মাদকাসক্ত তার সমস্যা সঙ্গে আরেকজন বাসাবাড়িতে কাজ করা নারী, যার স্বামীও কোনো একটি পেশায় নিয়োজিত তার তুলনা করা কঠিন। দরিদ্র মানুষদের মধ্যে এই যে নানা রকম শ্রেণি বিদ্যমান তাকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারার ফলে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়।

সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধান চাই
ব্যক্তি উদ্যোগ বা সরকারি-বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত উন্নয়ন কার্যক্রম যেটিই হোক না কেন সেই সহায়তা হতে হবে দারিদ্র্যের ধরন এবং বাস্তবতা অনুযায়ী। চেষ্টা থাকতে হবে যাকে সহায়তা করছি তার জীবনে যেন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিবর্তন আনতে পারি। কারও জন্য ছোটোখাটো একটা ব্যবসা শুরু করার জন্য হয়তো অনুদান বা ক্ষুদ্রঋণই যথেষ্ট। আবার কারও কারও দরকার সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করলে তিনি লাভবান হবেন সেই প্রশিক্ষণ। প্রয়োজন সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা, আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে শেখা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যে, চেষ্টা করলে আর বুদ্ধি খাটালে তিনি নিজেই তার পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবেন। কারণ অনেক সময় তারা উপলব্ধি করতে পারেন না যে কী করলে তাদের ভালো হবে। ব্যক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও এভাবে চিন্তা করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। যেমন, অতিদরিদ্র পরিবারে যদি স্কুল পড়ুয়া মেধাবী সন্তান থাকে তখন নগদ অর্থের চাইতে স্কুল ফি অথবা বই কেনার টাকা দিলে তা ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল এনে দেবে।

প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহযোগিতা
সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে দরিদ্র জনগণও আত্মবিশ্বাসী, মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারেন তা আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে কাজ না করলে অজানাই থেকে যেত। ছোটকালে যখন পত্রিকায় পড়তাম কোনো পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরও তাদের পরিবারের দুরবস্থা কাটেনি, তখন মনে মনে ভাবতাম, এই পরিবারগুলোর অবস্থা পাল্টায় না কেন? আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে কাজ করতে করতে শিখেছি অর্থের পাশাপাশি সহমর্মিতা ও সঠিক পরামর্শও জরুরি। কেননা অর্থ কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা যার জানা নেই, তাকে অর্থ দেওয়া হলে সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী অতিদরিদ্র পরিবারের আগ্রহ, সামর্থ্য এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার উপর ভিত্তি করে সম্পদ বিতরণ, সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিবিড় তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে সদস্য পরিবারগুলোকে তাদের ভঙ্গুর আর্থসামাজিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করা হয়। এই কার্যক্রমের ফলে ধীরে ধীরে গ্রামের প্রান্তিক নারীরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তারা পরিবারের হাল ধরতে শেখেন। বর্তমানে বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে প্রায় ১০০টি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার, ব্র্যাক ও বেসরকারি সংস্থাসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা ব্র্যাকের এই মডেল অনুসরণ করে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে।

এই শিখনগুলোকে পেশা এবং ব্যক্তি জীবন-দুটো ক্ষেত্রের জন্যই আমি মূল্যবান হিসেবে মনে করি। আমার এই শিখনগুলোর প্রতিফলন আমি দেখতে পেয়েছি এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন প্রাপ্ত দুই গবেষক অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসথার ডুফলোর গবেষনাতেও। তাঁরা কোন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দারিদ্র্য দ্রুত নিরসন করা যায় সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন এবং দেখেছেন, দারিদ্র দূরীকরণকে শুধু আয় বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বরং যে সব কারণে মানুষ দরিদ্র হয় তার কারণগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখা, কোন ইস্যুগুলোর উপর বেশি জোর দিতে হবে সেগুলোকে খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী সমাধান খোঁজা ইত্যাদি বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফটো কপিরাইট: বিবিসি

এটা অনেক গর্বের বিষয় যে এই গবেষণালব্ধ ফলাফলগুলো প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের একটি বড় অবদান আছে। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসথার ডুফলো ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল ব্যাপি ৬টি দেশে স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়িত পরীক্ষামূলক গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্পের উপর গবেষণা পরিচালনা করেন। অতিদারিদ্র্য বিমোচনে আজকে তারা যে নতুন নতুন ধারণাগুলো নিয়ে আসছেন এই গবেষণাগুলো থেকে সে বিষয়ক শিখন তারা গ্রহণ করেছেন। তাদের নোবেল প্রাপ্তি তাই আমাকে দারুণ উদ্দীপ্ত করেছে। আমি পেয়েছি একজন উন্নয়ন পেশাজীবি হিসেবে দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of