জীবনের মধ্যগগনে পৌঁছেও থামেনি তার লড়াই

December 8, 2020

কাগজে-কলমে স্বামীর সঙ্গে আজও কনিকা দিদির ছাড়াছাড়ি হয়নি। তিনি তার সংসারে ফিরে যান না, যাবেনও না- স্বামীও আসেন না। আজও কপালের সিঁদুরটা ঠিকই আছে, কিন্তু সেটা যতটা না স্বামীর মঙ্গল কামনায়, তার চেয়ে অনেক বেশি সমাজের চোখরাঙানির ভয়ে।

জনবহুল এই দেশে কারও অধিকার কেড়ে নিয়ে তার জীবনকে মূল্যহীন হিসেবে আখ্যা দেওয়া অনেক সহজ।

জাতিগতভাবে যে চর্চা আমরা বহুবছর ধরে করে আসছি, তা হলো নারীর প্রতি বৈষম্য। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কাছে একজন নারীর স্বপ্ন, আশা বা লক্ষ্য খুবই ঠুনকো। নারীদের কোনঠাসা করে রাখার সেই প্রতিযোগিতায় পুরুষ দোর্দন্ড প্রতাপশালী, যেন তার ওপর আর কেউ নেই।

যার গল্পের সূচনায় কথাগুলো বলা, তার নাম কনিকা রানী পাল। গ্রামের কারও কাছে তিনি কনিকা মাসি, কারও কাছে দিদি। জীবনের মধ্যগগনে পৌঁছেছেন তিনি, কিন্তু লড়াই তার থামেনি। তিন সন্তানের মধ্যে ছেলে দুইজন কাজ শিখছে, মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে- আপাতদৃষ্টিতে ঝামেলামুক্ত সংসার। কিন্তু আসলেই কি তাই?

মৌলভীবাজারের চাঁদনীঘাট এলাকায় তার বসবাস। স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি।

এককালে সংসার জীবনে মা-ছেলের অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছিল কনিকা রানীকে। শাশুড়ির সমর্থনে নানা অজুহাতে স্বামী হাত ওঠাতো বউয়ের গায়ে, ছেলের কথাই শাশুড়ির কথা। এ ছিল শ্বশুরবাড়ির নিত্যদিনের ঘটনা। নির্যাতনের কারণে বারবার বিচার-সালিশ বসেছে। কনিকার ভাই সেখানে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেছেন। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বিভিন্নভাবে কনিকার উপর পাশবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।

এভাবে কষ্টে এবং যন্ত্রণায় কাটে বছরের পর বছর, স্বামী বা শাশুড়ির স্বভাবে কোনো পরিবর্তন আসে না। একসময় শোনা যায় অন্য নারীর সাথে স্বামীর সম্পর্কও আছে। অপমান, নির্যাতন এবং সহিংসতা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন কনিকা।

কনিকার শ্বশুরবাড়ি কমলগঞ্জের ভানুগাছ ইউনিয়নে। ছোটোবেলায় মা-বাবা হারানো কনিকার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিকভাবে। আজ থেকে প্রায় ২৬ বছর আগে ১৫ হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে তার বিয়ে হয়।

বিয়ের পর স্বামী বলতে শুরু করে, কনিকার গায়ের রং কালো। এই বউ তার পছন্দ নয়। এলাকার মুরুব্বিরা বলেছে তাই সে চাপে পড়ে বিয়ে করেছে।

এক সন্ধ্যায় স্বামী-শাশুড়ির অত্যাচার চরম আকার ধারণ করে। নিষ্ঠুরতার এক পর্যায়ে কনিকাকে গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। শরীরের সেই ক্ষতচিহ্ন হয়তো শুকিয়ে যায়, কিন্তু মনের ক্ষত কি সময়ের সাথে মলিন হয়?

এবার সংসার ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন কনিকা দিদি। এক কাপড়ে, একা বাবার বাড়ি চলে আসেন। সন্তানদেরও রেখে এসেছিলেন শ্বশুরবাড়িতে কারণ তাকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। বছর দুয়েক পর ছেলেমেয়েরা একে একে মায়ের কাছে চলে আসে। বাবার কাছে তারাও ভালো থাকে না।

কাগজে-কলমে স্বামীর সঙ্গে আজও কনিকা দিদির ছাড়াছাড়ি হয়নি। তিনি তার সংসারে ফিরে যান না, যাবেনও না- স্বামীও আসেন না। আজও কপালের সিঁদুরটা ঠিকই আছে, কিন্তু সেটা যতটা না স্বামীর মঙ্গল কামনায়, তার চেয়ে অনেক বেশি সমাজের চোখরাঙানির ভয়ে।

এক কাপড়ে চলে এলেও কনিকা দিদি পরাজয় শিকার করে নেননি। এখন যেখানে ভাড়া থাকছেন, সেখানে একজন আত্মীয়ের সূত্র ধরে তার বসবাস শুরু- যিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্র্যাকের মাঠ পর্যায়ের নানা কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত, এলাকায় একজন সক্রিয় সমাজকর্মী হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি (সিইপি) পরিচালিত পল্লীসমাজের একজন সভাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শুরু হয় কনিকা দিদির জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

ব্র্যাক থেকে কনিকাকে আয়বর্ধক কর্মসূচির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরিচিত এক দোকানে তিনি সেলাইয়ের কাজ শেখেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ঋণ নিয়ে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করেন, বুনতে থাকেন তিনি জীবনগাঁথা, ঘুরতে থাকে তার জীবনের চাকা নতুন গতিতে।

গত বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালে কনিকা দিদি জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন।

কনিকা দিদি আগে শহরের বড়ো বড়ো দোকানে গিয়ে কাজ করতেন, এখন বেশিরভাগ সময় কাজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। দুটো মেশিন আছে তার। নিজের সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা এসেছে। এই তো সেদিন ৬ হাজার টাকা দিয়ে ছেলের যাতায়াতের সুবিধার জন্য কিনে দিয়েছেন সাইকেল।

তিনি চান সামনের দিনগুলোতে এভাবেই কাজ করে যেতে, সকলের মঙ্গল হয় এমন এক সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখেন তিনি। আরও চান, যে ভয়াবহতা এবং পাশবিকতার শিকার তিনি নিজে হয়েছেন এমন যেন না ঘটে আর কোনো নারীর জীবনে।

আমরা চাই নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য এবং নির্যাতন মুছে দিতে, আমরা চাই পৃথিবীটা বদলে যাক।

 

সহযোগিতায়- তারিক আজিজ

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments