জামদানি:
আমাদের গর্ব

April 22, 2018

বাংলাদেশের জামদানি শাড়ির ঐতিহ্যকে সমকালীন শিল্পধারায় প্রবাহিত করে দিয়েছিল আড়ং। এটি ছিল দেশীয় ঐতিহ্যের বিকাশে আড়ংয়ের পক্ষ থেকে পরিচালিত এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক অভিযান। পরবর্তীতে জামদানির বুননশিল্প ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউমিনিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

নকশা ও বুননপদ্ধতির বিশেষত্বের কারণে জামদানি শাড়ি অন্য সব ধরনের শাড়ির চাইতে আলাদা। শাড়িপ্রেমীদের কাছে জামদানির কদর খুব বেশি। তবে এই শিল্পের বিকাশ বা ব্যাপ্তি তত বেশি নয়। বর্তমানে দেশের বাজারে জামদানির চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও এর প্রসার ঘটছে।

জামদানি আমাদের বস্ত্রশিল্পের ঐতিহ্য। কার্পাস তুলা থেকে তৈরি এক ধরনের সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র জামদানি। জামদানি বলতে মূলত জামদানি শাড়িকেই বোঝানো হয়। বাঙালি নারীদের প্রিয় পোশাকের তালিকায় রয়েছে জামদানি শাড়ি।

মসলিন ও জামদানি আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যের প্রতীক। বিশ্বের নানা দেশে পোশাকের ইতিহাস নিয়ে লেখা ও আলোচনায় মসলিনের পাশাপাশি জামদানিরও উল্লেখ আছে। জামদানি কবে কখন তৈরি শুরু হয়, তা স্পষ্টভাবে জানা যায় নি। তবে অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক মনে করেন, আজকের যে জামদানি তা বিশ্বখ্যাত মসলিনেরই উত্তরাধিকার।

নদীর নাম শীতলক্ষ্যা

শীতলক্ষ্যা ব্রহ্মপুত্র নদের একটি শাখানদী। নরসিংদী, ঢাকা, গাজীপুর ও নারয়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে শীতলক্ষ্যা।
ভালো জামদানি তৈরির জন্য ভালো সুতো, দক্ষ কারিগর, ঐতিহ্যবাহী নকশা যেমন দরকার তেমনি আবহাওয়াজনিত বিশেষ আর্দ্রতারও প্রয়োজন রয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীপাড়ের আর্দ্র আবহাওয়া জামদানি তৈরির জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত। ভোরবেলা সুতো প্রস্তুতের সবচেয়ে ভালো সময়। কেননা এসময় বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে। এ কারণে দেশের অন্য কোথাও জামদানি তৈরি সম্ভব হয় না। তাইতো অতীতের মসলিন এবং আজকের জামদানিশিল্প শীতলক্ষ্যাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।

মসলিন থেকে জামদানি

পাতলা ও সাদা রঙের মসলিনের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। অতীতে ঢাকা, সোনারগাঁ, ধামরাই, বাজিতপুর প্রভৃতি অঞ্চল মসলিনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। একসময় এই বস্ত্র রোম ও চীনে রপ্তানি করা হতো। এ ছাড়াও আরব, ইরান, আর্মেনিয়া, মালয়, জাভা প্রভৃতি দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এদেশে আসত মসলিন কেনার জন্য। মুঘল আমলে এ শিল্পের সবচেয়ে বেশি প্রসার ঘটে।

জামদানি নামকরণ

জামদানির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে। মনে করা হয় মুসলমানরাই ভারত উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ও বিস্তার করে। লোকশিল্পবিশারদ তোফায়েল আহমদের মতে, ‘জামদানি’ অর্থ ‘বুটিদার কাপড়’। ফারসি শব্দ ‘জামা’ মানে ‘কাপড়’ আর ‘দানা’ মানে ‘বুটি’। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকেও বঙ্গদেশ থেকে মসলিনের মতো সূক্ষ্মবস্ত্র ইউরোপে রপ্তানি হতো।

সুতো থেকে তাঁত অবধি

দোআঁশ মাটি ও পর্যাপ্ত তাপ এবং বৃষ্টিপাতের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চলে ফুটি কার্পাসের চাষ ভালো হতো। এই ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি সুতোয় বোনা হতো মসলিন। জামদানি তৈরির জন্যও কার্পাস তুলো ব্যবহার করা হয়। জামদানি বানানোর জন্য সুতো প্রস্তুত করতে হয়। এর বেশ কয়েকটি ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপের জন্য থাকে আলাদা কারিগর। শুধু তাঁতি নয়, এর মানে দাঁড়ায় যে জামদানি তৈরিতে অনেক কারিগরও যুক্ত থাকে।

জামদানির তাঁত ও শাড়িতে নকশা তোলা

আধুনিককালের বেশিরভাগ তাঁতগুলো হয় আংশিক, নয়তো সম্পূর্ণভাবেই যন্ত্রচালিত। কিন্তু জামদানি তৈরির জন্য বিশেষ তাঁত ব্যবহার করা হয়। এটি হস্তচালিত তাঁত নামে পরিচিত। তাঁতে কাপড় বোনার সঙ্গেসঙ্গেই চলে নকশা তৈরির কাজ। জামদানি শাড়ি তৈরির সময়ই তাঁতিরা জামিনের চাইতে খানিকটা মোটা সুতো দিয়ে তাতে নকশা ফুটিয়ে তোলে। তাঁতিদের এই শিল্পনৈপুণ্যের দীক্ষা হয় নিজ পরিবারেই। ছোটোবেলা থেকেই অনেকে নকশা তৈরির হাতেখড়ি নেয়। বংশপরম্পরায় একজনের কাছ থেকে পরিবারের অন্যরা নকশার কাজ শিখে নেয়।

তাঁতে একবার জমিনটা বোনে তারপর তাতে নকশার সুতো ঢোকায়। আবার বোনে আবার নকশা করে। এখন নকশার সুতো জমিনের কোন জায়গায় ঢোকানো হবে, তারপর বামে না ডানে যাবে এবং ওপরে উঠবে না নিচে নামবে এই জটিল হিসাবগুলো তাঁতিরা করে থাকে। এভাবে জমিন বোনার সঙ্গেসঙ্গে নকশা তোলার কাজও শেষ হয়। তারপর শাড়িটিকে আারেকবার মাড় দিয়ে পলিশ করা হয়। নকশা যত সূক্ষ্ম হবে শাড়ি তৈরি করতে ততই বেশি সময় লাগবে। সাধারণত একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে তাঁতিদের সাতদিন থেকে কয়েক মাস এমনকি বছরও লাগতে পারে।

কত নকশা কত নাম

জামদানি শাড়িতে রং দিয়ে নকশা করা হয় না। তাঁতিদের কল্পনাকে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। নকশার কাজটি যেহেতু তাঁতিরাই করে, সেহেতু সেখানে দেশের প্রকৃতির কথা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। এ কারণেই জামদানির নকশায় দেশীয় ফুল-লতা-পাতার চিত্রই প্রাধান্য পায়।

তবে জামদানিতে জ্যামিতিক নকশারও প্রচলন রয়েছে। নকশা অনুযায়ী জামদানি নানা নামে পরিচিতি পায়। পান্না হাজার, দুবলি জাল, বুটিদার, তেরছা, ডুরিয়া, ময়ূর প্যাঁচ, কলমিলতা, পুঁইলতা, কচুপাতা, কলকা পাড়, আঙুরলতা, সন্দেশ পাড়, শাপলাফুল, জুঁইবুটি, চন্দ্রহার, হংস, ঝুমকা, চালতা পাড়, কলসফুল, মুরালি জাল, জবাফুল, প্রজাপতি বুটি, শামুক বুটি- এরকম কত নামে কত নকশায় জামদানি তৈরি হয়!

জামদানি শাড়ির প্রকারভেদ

জামদানি শাড়ি প্রধানত দুই প্রকার। হাফসিল্ক জামদানি ও সুতি জামদানি। হাফসিল্ক জামদানিতে আড়াআড়ি সুতোগুলো হয় রেশমের আর লম্বালম্বি সুতোগুলো হয় তুলোর তৈরি। অন্যদিকে সুতি জামদানির সম্পূর্ণই তুলোর তৈরি সুতো দিয়ে তৈরি হয়।

জামদানি শিল্পনগরী

শীতলক্ষ্যা নদী জামদানি শাড়ি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে বিধায় ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের ১টি গ্রামের মধ্যে জামদানিশিল্প গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশন জামদানিশিল্পকে আরও উন্নত, এর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিপণনে সহায়তা করার জন্য তারাবোর নোয়াপাড়া গ্রামে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করে।

বাংলাদেশের জামদানি শাড়ির ঐতিহ্যকে সমকালীন শিল্পধারায় প্রবাহিত করে দিয়েছিল আড়ং। এটি ছিল দেশীয় ঐতিহ্যের বিকাশে আড়ংয়ের পক্ষ থেকে পরিচালিত এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক অভিযান। কালের আবর্তে জামদানিশিল্প প্রায় বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে ঢাকার ডেমরা এলাকায় ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে একটি জরিপকাজ পরিচালনা করা হয়েছিল। তাতে দেখা যায় ডেমরা এলাকায় প্রায় সাতশ পরিবার জামদানি শাড়ি তৈরি করত। এই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আড়ং জামদানি শাড়ির নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করে। সেসময় গত দুশ বছরে যত রকম জামদানি তৈরি হয়েছে তার সবগুলোর মোটিফ ব্যবহার করে তিনশ জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়।

পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই মসলিনশিল্পের অবনতি ঘটতে থাকে। তবে মসলিন বিলুপ্তির প্রধান কারণ ইউরোপের শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক যন্ত্রপাতির আবিষ্কার। কারখানায় উৎপাদিত সস্তা দামের কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরেই মসলিন হারিয়ে যায়। তবে জামদানির জৌলুস ও খ্যাতি আজও আছে। জামদানির বুননশিল্প ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউমিনিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।