গবেষণার খেরো খাতায় কক্সবাজারে পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্র

February 18, 2018

“উই শেল ওভার কাম সাম ডে….” । ওদের সাথে কিছুক্ষণ দুষ্টামি করে আবার হাঁটার পথ ধরতে হলো। দুই কদম নিচে নামতেই মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা ওরা এই গান শিখলো কোথা থেকে!? ফের তাদের কাছে ফিরে গিয়ে প্রশ্ন করা হলো, “তোমরা এই গান কোথা থেকে শিখেছ?” তারা জানালো ‘শিশু খানা’ থেকে শিখেছে; তার মানে দাঁড়ালো ক্যাম্পে পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্র থেকে এই গান শিখেছে।

চারপাশে কেমন যেন একটা গুমোট বাতাস। কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল গাছগাছালি, সেখানে আজ সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। শিশুদের কান্না, শূণ্য, অসহায় চোখে মানুষের উদ্দেশ্যহীন হেঁটে যাওয়া এসবই শুধু চোখ পড়ে।

২০১৭ সালের অক্টোবরের শেষ এবং নভেম্বরের শুরুর দিকের কথা, গবেষণার কাজে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আগত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যূত মানুষের জন্য পরিচালিত অস্থায়ী আবাসগুলোতে নানান বিষয়ে নানান মানুষের সাথে কথা হচ্ছিল। ঘুরে বেড়াতে হচ্ছিল কাঠফাঁটা রোদে এক ন্যাড়া পাহাড় থেকে আরেক ন্যাড়া পাহাড়ে। আবার কখনও কখনও ব্র্যাকের সহায়তাগুলো ক্যাম্প এবং অস্থায়ী আবাসগুলোতে মানুষ কেমন করে পাচ্ছে তা দেখতে দেখতে বাস্তবতা উপলব্ধির চেষ্টাও ছিল।

এমনই একদিন গিয়ে উঠলাম ব্র্যাক আর ইউনিসেফ মিলে পরিচালিত এক শিশুবান্ধব কেন্দ্রে। সেখানে অনেকক্ষণ সময় বাস্তুচ্যুত শিশুদের দল বেঁধে ছবি আঁকা, গান গাওয়া, ছড়া আওড়ানো ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখছিলাম। সেখানে এক শিশুর দিকে হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেলো।

চোখের সামনে যদি কখনও আপনার এমন দৃশ্য দেখতে হতো যে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে, আপনার বাড়িতে আগুন জ্বলছে ও পাশেই দু’টো মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে- আপনি তখন কি করতেন?

ঠিক এই দৃশ্যই আব্দুল্লাহর আঁকা ছবিতে ফুটে উঠেছিল। এই ছবি যেন তার পরিবারের উপর চালানো বর্বরতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। ছবি আঁকা শেষ হলে আব্দুল্লাহর সাথে কথা বলার ইচ্ছা হলো। কিন্তু সে ভাষা বুঝতে পারছিল না; এমন সময় আরেকজন শিশুর দেখা মিললো যে ঐ ক্যাম্পে দুই বছর আগে এসেছে, দোভাষী হিসেবে দুই পক্ষের ভাষাই বুঝতে এবং বোঝাতে পারে।

এই ‘দু’ভাষী শিশুটির নাম জহির। জহিরের সহযোগিতায় আবদুল্লাহ সম্পর্কে আরও কিছুটা বিস্তারিত জানা গেলো। আব্দুল্লাহর বাবা মাকে মায়ানমার সেনাবহিনী গুলি করে হত্যা করেছে, তার ছোট একটা ভাইকেও মেরে ফেলেছে। সে তার বোন এবং বোনের স্বামীর সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ২০১৭ সালের ঈদুল আযহার দিন (২৫ আগস্টের পর)।

আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জানা গেলো, আব্দুল্লাহ এখনো মাঝে মাঝে কেঁদে উঠে বাবা মা আর ভাই হত্যার সেই বিভৎষ দৃষ্যের কথা মনে করে। তার সাথে একান্তে আরো অনেকটা সময় কাটানো সম্ভব হয়েছিল জহিরকে সাথে নিয়ে। তার আঁকা ছবিটার বিষয়ে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, সে জানালো যে এটা তার গ্রামের দৃশ্য, যেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল। যেখানে তার বাবা মা ও ভাই মৃত্যু বরণ করেছিল। কথাগুলো বলার সময় আব্দুল্লাহ কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিলো না, বারবার কেঁদে ফেলছিলো। এমন পরিস্থিতিতে নিজের আবেগ ধরে রাখাও কঠিন, তাই আব্দুল্লাহর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতে হয়। আব্দুল্লাহর গল্প ও ছবি আমার চোখের সামনে এক নিদারুণ বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছিল। আর বারবার মনে মনে হচ্ছিলো, সে সময় কেমন ছিল আব্দুল্লাহর মনের অবস্থা? এই ছোট্ট হৃদয়ে কি বীভৎস স্মৃতিই না সে বয়ে বেড়াচ্ছে, এই স্মৃতি নিয়েই তো সে বেড়ে উঠবে আর তার মানসিক বিকাশই বা কেমন? সেই ক্যাম্প থেকে চলে আসার পর কাজের ব্যস্ততায় আব্দুল্লাহর গল্পটাও হারিয়ে গেল।

এর মধ্যে প্রায় বিশদিন পর আরেকটি কাজে কক্সবাজারে মিয়ানমার নাগরিকদের অস্থায়ী আবাসগুলোতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। সেখানে একদিন এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার সময় একদল শিশুর সাথে দেখা হলো যারা তাদের ঘরের দরজার পাশে জড়ো হয়ে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সময়টা তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।

অপর একজন সহকর্মীসহ তাদের পাশ দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামার সময় হঠাৎ দুষ্টামি সুলভ হাসির কোরাস ভেসে এলো। ততক্ষণে তারা পেছনে পড়ে গেছে, পাহাড়ের ঢাল থেকে শিশুদের দিকে ঘুরে তাকাতেই তারা আবার সমস্বরে হেসে উঠলো। এদের মধ্য থেকে ছোট একটা মেয়ে বলে উঠলো- হাই, আবার পরক্ষণেই হাত নেড়ে দুষ্টামির স্বরে বলতে থাকলো বাই বাই..! উত্তরে হাসি দেখতে পেয়ে এই সময়ে আরেকজন এক হাতে ঘরের দরজার বাঁশ ধরে আর অন্য হাত নাড়াতে নাড়াতে দুষ্টামির ছলে গেয়ে উঠলো- “উই শেল ওভার কাম, উই শেল ওভার কাম..”, শুনে অবাক হয়ে যেতে হলো! এক পর্যায়ে তাদের সাথে স্বর মেলানোর ইচ্ছা দমন করা গেল না, “উই শেল ওভার কাম সাম ডে….” । ওদের সাথে কিছুক্ষণ দুষ্টামি করে আবার হাঁটার পথ ধরতে হলো। দুই কদম নিচে নামতেই মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা ওরা এই গান শিখলো কোথা থেকে!? ফের তাদের কাছে ফিরে গিয়ে প্রশ্ন করা হলো, “তোমরা এই গান কোথা থেকে শিখেছ?” তারা জানালো ‘শিশু খানা’ থেকে শিখেছে; তার মানে দাঁড়ালো ক্যাম্পে পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্র থেকে এই গান শিখেছে।

‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলী স্পেস’ কে তাদের ভাষায় তারা ‘শিশু খানা’ বলে ডাকে। আরো জানা গেলো, তারা প্রতিদিন শিশু খানায় যায়, খেলা করে, গান গায়, কবিতা শিখে। ঐ সময়ে “উই শেল ওভার কাম..”  এই গানটার সাথে মূলধারার উন্নয়ন কর্মকান্ডের একটা যোগসূত্র সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। আতঙ্কগ্রস্ত শিশুদের সুস্থ মানবিক বিকাশের লক্ষ্যে ব্র্যাকসহ  বভিন্ন সংস্থার তত্ত্বাবধায়নে শিশুবান্ধব কেন্দ্রগুলো এই শরণার্থী ক্যাম্প গুলোতে কাজ করছে আর তারা কিছুটা হলেও শিশুদের দুঃসহ স্মৃতি ভুলিয়ে স্বাভাবিক শিশু সুলভ চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে পারছে। যার বহিঃপ্রকাশ এই  শিশুদের দুষ্টামি ভরা হাসি।

একইভাবে আব্দুল্লাহর কথাও মনে পড়ে আবার। সেও বুঝি এতো দিনে শিশুবান্ধব কেন্দ্রের আবহে দল বেঁধে গান গাওয়া, ছড়া আওড়ানো আর ছবি আঁকার মতো নানান কাজের মধ্য দিয়ে দুঃসহ স্মৃতিগুলোকে পাশকাটাতে পেরেছে। একদিন হয়তো সত্যই অস্থায়ী আবাসের সকল শিশু তাদের দুঃসহ স্মৃতি কাটিয়ে উঠবে এবং একদিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের ভবিষ্যত গড়তে সক্ষম হবে।