খোলা মনে, মানুষের উন্নয়নে

October 18, 2020

এই মহামারিতে অনেক নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য পৌঁছালেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবার কারণে শহর ছেড়ে অনেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু সেখানে তাদের উপযোগী কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছে না, ফলে দারিদ্র্য বাড়ছে। আমি মনে করি, বিশেষ করে এই শ্রেণির মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ হলে খুব বেশিদিন বসে থাকতে হয়নি, একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হয়। পাঁচ মাস কাজ করার পর চাকরিটা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাই। কয়েকজন তরুণ মিলে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। কিছুদিন পর কাজে একঘেয়েমি চলে এলো। কাজেই সেখানেও স্থায়ী হতে পারলাম না। এরপর ২০০৩ সালে ব্র্যাকের কর্মসূচি সংগঠক (পিও) পদে যোগ দিই।

প্রথমে প্রি-সার্ভিসে যোগদান করি রংপুরে, এক সপ্তাহ পর আমার পোস্টিং হয় সাতক্ষীরার কলারোয়া শাখায়, ইনকাম জেনারেশন ফর ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (আইজিভিজিডি) প্রোগ্রামে। কাজের সুবাদে সাইকেলে চেপে, কখনও-বা পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি। সেসময় দরিদ্র মানুষের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হলো। দেখলাম দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক রূপ, জানলাম এর কারণসমূহ সম্পর্কে।

২০০৪ সালে আমি কুড়িগ্রাম সদরে টার্গেটিং দ্যা আলট্রা-পুওর (টিইউপি) বর্তমানে আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম (ইউপিজি)-এ যোগদান করি। আমি উপলব্ধি করলাম, নিজের একার পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সংস্থার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে অনেক কাজ করা সম্ভব। আর তখন থেকে আমি আমার সবটুকু ইচ্ছেশক্তি প্রয়োগ করি প্রোগ্রামে কাজ শেখার পেছনে। আমি সবসময় নিজের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য সহকর্মী এবং ঊর্ধ্বতনদের সাথে কাজ করতাম, প্রশ্ন করতাম, এভাবেই ধীরে ধীরে প্রোগ্রামের কাজ শিখেছি। ব্র্যাক থেকে আমাকে এক বছরের লিডারশিপ ট্রেনিং (ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনালস ট্রেনিং) করতে পাঠানো হয়। কর্মপরিচালনা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, ভাষাগত দক্ষতা ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, যেটি পরবর্তীতে আমাকে আরও ভালোভাবে কাজ করতে সহায়তা করেছে।

কর্মজীবনে আমি যখনই যেই অবস্থানে ছিলাম, প্রতিবারই পরবর্তী অবস্থানকে লক্ষ্য রেখে কাজ করেছি। সাধারণ মানুষের লড়াই, তাদের পাশে থাকা, জয়ের আনন্দ, মানুষের মন খুলে দোয়া পাওয়া- এই সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে আমাকে কর্মসূচির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলে। রংপুরে শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে সিদ্দিক ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে কাজ করার বছরখানেক পর ২০০৯ সালে গাইবান্ধায় রিজিওনাল ম্যানেজার (আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক) হিসেবে যোগদান করি। রংপুরে থাকতেই আমি বিদেশি অতিথি আসলে ট্রান্সলেটর হিসেবে কাজ করতাম। অন্য কর্মসূচির জন্যও করেছি। এর ফলে ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে আমার ধারণা হয়েছিল।

একবার রোজিনা আপা (বর্তমানে কর্মসূচি প্রধান, ইউপিজি) গাইবান্ধা অফিসে গেলেন। তিনি আমার কাজ খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। বছরখানেকের মধ্যে আমার প্রধান কার্যালয়ে ডাক পরে, সাক্ষাৎকারের জন্য। আমার সাথে ৪৫ মিনিট রাবেয়া আপা (তৎকালীন কর্মসূচি পরিচালক) কথা বলেন, এটাই যে আমার পদোন্নতির ইন্টারভিউ ছিল তা বুঝতে পারিনি। পরবর্তীতে আমাকে রাবেয়া আপা সিনিয়র রিজিওনাল ম্যানেজার হিসেবে হেড অফিসে যোগদান করতে বলেন। এরপর ২০১৪ সালে আমি ফিলিপাইনে মাস্টার্স করার সুযোগ পাই। ফিরে এসে টিম লিডারের দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং তারপর থেকে প্রোগ্রামের মূল অপারেশনের দায়িত্ব নিই।

আমি যখন কাজ শুরু করি তখন দেশে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশের মতো, এখন সেটা এখন প্রায় ১০-এ নেমে এসেছে। এই পরিবর্তন আমার চোখের সামনে ঘটেছে। আগে মানুষ শুধু গাছআলু খেয়ে দিন কাটিয়েছে, আধা কেজি চাল ছয়জন মিলে খেয়েছে, ভাঙা ঘর, ল্যাট্রিন ছিল না বেশিরভাগের বাসায়। এখন কিন্তু ঐ অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

সরকারের কার্যক্রম, বিদেশি ফান্ডের যথাযথ ব্যবহার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বস্তরে কাজ, মাইক্রোক্রেডিটের মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। মানুষ আগের চাইতে ভালো আছে, আরও বেশি সচেতন হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। আমি মনে করি এই অবস্থা চলমান থাকলে এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার হার আরও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

২০১৭ সালে আমি প্রথমবারের মতো আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে দেশের বাইরে কারিগরি সহায়তা প্রদানের সুযোগ পাই। কেনিয়ায় আমাদের টিমে রোজিনা আপাও ছিলেন। প্রথমদিকে ভাষাগত একটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও রোজিনা আপা আমাকে দুই একটা সেশন নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পর তা ঠিক হয়ে যায়। পরবর্তীতে শিখে নিই কীভাবে রিপোর্ট করতে হয়, প্রোগ্রাম ডায়াগনোসিস করতে হবে, কোথায় ভুল হচ্ছে, কীভাবে ঠিক করতে হবে এবং কীভাবে সেগুলো বলতে হয়। পরবর্তীতে উগান্ডায়, নেপালে কাজ করেছি, এখন ইজিপ্টের গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের অপারেশনের বিষয়ে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছি।

দারিদ্র্য দূরীকরণের পরিকল্পনা দেশ ভেদে ভিন্ন হওয়ার দাবি রাখে। আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন অ্যাপ্রোচ মডেলের চারটি পিলারকে ঠিক রেখে সেই দেশের কাঠামো অনুযায়ী কাজ করলে অবশ্যই বৈশ্বিক দারিদ্র্য কমিয়ে আনা সম্ভব। সেই দেশের দারিদ্র্যের ধরন, সমাজ-সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো, জীবনযাত্রা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনুযায়ী কর্মসূচি পরিকল্পনা করতে হবে।

বাংলাদেশে কাজ করার বড়ো সুবিধা হলো ব্র্যাকের অবকাঠামো। দেশ জুড়ে ব্র্যাকের কার্যক্রম আছে এবং এখানে ফিল্ডে কাজ করার সুযোগ বেশি। কিন্তু দেশের বাইরের চিত্র ভিন্ন। সেখানে বেশিরভাগ দেশে ১২০০/১৫০০ জন থাকে পুরো প্রজেক্টের মোট সদস্য, আর আমাদের দেশে একজন রিজিওনাল ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানেই এই সংখ্যক সদস্য থাকে। বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও যদি আমরা স্কেলিংটা করতে পারতাম, তাহলে সেই দেশের দারিদ্র্য বিমচনের জন্য বিষয়টি খুবই ফলপ্রসূ হতো।

এই মহামারিতে অনেক নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য পৌঁছালেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবার কারণে শহর ছেড়ে অনেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু সেখানে তাদের উপযোগী কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছে না, ফলে দারিদ্র্য বাড়ছে। আমি মনে করি, বিশেষ করে এই শ্রেণির মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন।  এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই মহামারির প্রভাব সামলাতে প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ।

আমি এত বছরের কর্মজীবনে খুব নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, সবসময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছি এবং এর সুফল পেয়েছি। এই সততাকে ধরে রেখেই আগামীতে দায়িত্বপালন করে যেতে চাই।

 

সম্পাদনা: তাজনীন সুলতানা, সুহৃদ স্বাগত, তানিয়া তাসনিন
সমন্বয়: কামরান কাদের

http://documents1.worldbank.org/curated/en/109051468203350011/pdf/785590NWP0Bang00Box0377348B0PUBLIC0.pdf
https://bdnews24.com/economy/2019/12/17/bangladesh-poverty-rate-down-to-20.5-in-2019-fiscal

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments