কোভিড-১৯ এবং প্রতিবন্ধিতা জয়

December 2, 2020

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। সব মিলিয়ে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি। এর অর্ধেকের বেশি শিশু।

করোনাভাইরাস মহামারির টানা ৬-৭ মাস যাবৎ স্কুল বন্ধ। টেলিভিশনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, স্কুলগুলো ক্লাস নিচ্ছে অনলাইনে। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু, যে লেখাপড়া করে ব্রেইল পদ্ধতিতে, সে কীভাবে ক্লাস করবে অনলাইনে? সবাই যেখানে মাস্ক পরে চলাফেরা করছে, একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষ যে ইশারা ভাষার ওপর নির্ভরশীল, তিনি আরেকজনের মুখমণ্ডল পুরোটা দেখতে না পেলে ইশারা ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন কি?

কোভিডের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা এখনও যে কথাটি বলছেন না, তা হলো, কোভিডের কারণে বিভিন্ন অঙ্গে যে রক্ত শরীরে জমাট বেঁধে যাচ্ছে, সারা দেহের ত্বকের নিচে যে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র রক্তনালি রয়েছে, সেগুলোতেও একইভাবে জমাট বাঁধছে রক্ত। এর ফলে ত্বকের নিচে স্পর্শের মাধ্যমে বিভিন্ন অনুভূতি চেনার জন্য নার্ভের যে সেন্টারগুলো রয়েছে, সেগুলোও অকেজো হয়ে যায়। অন্য ক্ষতির তুলনায় এই ক্ষতিটুকু হয়তো খুবই সামান্য বলেই এর কথা বলা হয়নি। কিন্তু এই ‘সামান্য’ বিষয়গুলোর ওপরই যে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ক্ষতিগুলো কিন্তু সামান্য নয়।

প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষায়িত স্কুলগুলোতে ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নিয়মিত ফিজিওথেরাপি বা অকুপেশনাল থেরাপি দেওয়া হয়। যেসব শিশুদের অটিজম আছে তাদের অনেকেরই এই থেরাপিগুলোর পাশাপাশি স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি দেওয়ার দরকার হয়। একটু রুটিনমাফিক এই শিশুদের শিক্ষা দিতে হয়। খেলার ছলে এসব স্কুলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুরা স্বাভাবিক জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শেখে। কয়েক বছর নিয়মিত স্কুলে এসে এই শিশুদের যতটুকু উন্নতি হয়েছিল, কয়েক মাসের ব্যবধানে সবটুকুই আবার হারাতে বসেছে। আবার নতুন করে শেখা শুরু করা যাবে, কিন্তু এর মধ্যে যে বয়সটুকু বেড়ে গেল, তা তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

সুইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, সোয়াক বা স্কুল ফর গিফটেড চিল্ড্রেনের মতো প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। তাদের নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অসহায়ত্ব বোধ করছে। তারা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, এবং চেষ্টা করছে পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত একজন সহায়তাকারীকে সাথে রাখার জন্য। তাকেই সব বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, যেন থেরাপি চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু একজন প্রশিক্ষিত প্রফেশনালের কাজটি একজন মা বা বাবার পক্ষে সঠিকভাবে দেওয়া তো সম্ভব নয়।

ক্ষুদ্রশিল্পে নিয়োজিত অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের জীবিকা হারিয়েছে, চাকরি হারিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে সকলের মতোই তারাও বিপদে পড়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধিতার কারণে তাদের জীবনযাত্রার খরচ বেশি বলে অপ্রতিবন্ধী মানুষের তুলনায় তাদের সংকট স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাথে কাজ করা বড়ো বড়ো উন্নয়ন সংগঠনসমূহ চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার, স্থানীয় সরকার বা ব্যক্তি উদ্যোগে পাওয়া সহযোগিতাগুলোতে তাদের সম্পৃক্ত করতে। এক্ষেত্রে এডিডি (অ্যাকশন অন ডিজাবিলিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট), সিবিএম, সিডিডি (সেন্টার ফর ডিজাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট), সিএসআইডি (সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজাবিলিটি), ডিআরআরএ (ডিজাবেল্ড রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড রিসার্চ অ্যাসোসিয়শন), সাইটসেভার্স-এর নাম বলাই যায়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তির পরিমাণ অপ্রতুল হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বঞ্চিত থেকেই যাচ্ছে। উন্নয়ন সংগঠনগুলোর কর্ম-এলাকার বাইরে থাকা প্রতিবন্ধী মানুষের দুর্দশার সীমা নেই।

বাংলাদেশ, তথা বিশ্বের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক তাদের বিস্তৃত কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রথম থেকেই প্রতিবন্ধী মানুষদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পৃক্ত করায় অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ অন্তত খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব থেকে মুক্তি পেয়েছে। একই সাথে তাদের শিক্ষা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত থাকা প্রতিবন্ধী শিশুরাও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়নি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস চালাবার পাশাপাশি দৃষ্টি, অটিজম, বুদ্ধি, সিপি এবং ডাউন সিন্ড্রোমজনিত যে সকল প্রতিবন্ধী শিশু ব্র্যাকের স্কুলগুলিতে সম্পৃক্ত ছিল, তাদের বিশেষ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে যার যার বাসায় গিয়ে পাঠদান করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিটি শিশু এবং তাদের পরিবারকে কোভিড থেকে নিরাপদ থাকতে করণীয়, যেমন- সামাজিক দূরত্ব, মাস্কের ব্যবহার, নিয়মমাফিক হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখতেও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

উন্নত দেশগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে, যুক্তরাজ্যে অপ্রতিবন্ধী পুরুষদের তুলনায় প্রতিবন্ধী পুরুষের মৃত্যু ঘটেছে দ্বিগুণ, নারীদের মধ্যে ২ দশমিক ৪ গুণ! সবচাইতে বেশি মৃত্যু ঘটেছে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষের, যারা স্বাস্থ্যবিধি বুঝে উঠতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিত্রটি একই, দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ মারা গেছে অপ্রতিবন্ধী মানুষের তুলনায়।

আমাদের দেশে যেহেতু এ ধরনের গবেষণালব্ধ তথ্য নেই, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আমাদের আরও বেশি সচেতন থাকতে হবে । তারা হতে পারে আপনার পরিবারের কেউ বা প্রতিবেশী। সরকারি যেসব সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সেবা পাবার কথা। সেটি পাচ্ছে কি না দেখা প্রয়োজন। বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করলে তারাই এদের খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে। এর পাশাপাশি তাদের জন্য পৃথক কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ করা যায় কি না, সেটি সরকারের ভাবনায় নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ১০৩টি সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র আছে। এগুলোতে প্রয়োজনীয় লোকবলের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি স্থানে মোবাইল ভ্যান রয়েছে।

যে সকল প্রান্তিক প্রতিবন্ধী মানুষ এসব কেন্দ্র থেকে নিয়মিত সেবা গ্রহণ করে থাকেন কিন্তু কোভিডের কারণে মাসের পর মাস আসতে পারছেন না, তাদের বাসায় গিয়ে সেবা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে অথবা তার নিয়মিত পরিচর্যাকারী কোভিডে আক্রান্ত হলে কীভাবে সামাল দেয়া হবে, এ বিষয়টি ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা ব্যবস্থা কীভাবে হবে, এ বিষয়ে ফ্রন্টলাইন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও সেবাকর্মীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এদেশের প্রায় ৩০ লক্ষাধিক শ্রবণ, বাক্ প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ইশারা ভাষার প্রমিতকরণ করে তা প্রচার করা প্রয়োজন। যে সকল প্রতিবন্ধী মানুষ এখনও সরকারি গণনায় এসে পরিচয়পত্রটি পায়নি, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে জাতীয় ডাটাবেইজে অন্তর্ভুক্তি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দেশব্যাপী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলি যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সঠিক তথ্য প্রতিবন্ধী মানুষসহ সকলের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য মিডিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রায় দেড় কোটি প্রতিবন্ধী মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাইরে রেখে এদেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু এই দায়িত্বটি একা প্রতিবন্ধী মানুষ বা তাদের পরিবারের নয়, একা সরকার বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়েরও নয়। আমাদের সকলেরই যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে এসে দায়িত্ব পালন করা উচিত। আমাদের দৈনন্দিন ভাবনায়, এই ভিন্ন ভাবনাটুকুরও স্থান পাওয়া উচিত। প্রত্যেকেরই উচিত নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা, এভাবে আমি ভাবছি কি?

 

নাফিসুর রহমান পেশায় চিকিৎসক নাফিসুর রহমান নীতি গবেষণা এবং  অ্যাডভোকেসি  ক্ষেত্রে, বিশেষত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ  করছেন। ১৫ বছর ন্যাশনাল ফোরাম অফ অর্গানাইজেশন্স ওয়ার্কিং উইথ দ্য ডিজেবল্ড (এনএফওডব্লিউডি)-এর পরিচালক ছিলেন। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক পরামর্শদাতা এবং বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধী অধিকারবিষয়ক  এনজিও-র স্বেচ্ছাসেবক।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments