কেন মহাশূন্যে বাংলাদেশ?

August 17, 2017

ঢাকার অলিগলির জলাবদ্ধতা বলুন কিংবা বানের পানিতে ভেসে যাওয়া ফসলের মাঠ, এদেশের মাটিতেই তো সমস্যার শেষ নেই। এসব সমস্যার পাহাড় থেকে চোখ সরিয়ে আকাশের পানে তাকাবার হঠাৎ কি এমন প্রয়োজন দেখা দিল আমাদের! কেনোই বা এই পোড়া জমিন ছেড়ে দূর মহাকাশে যাবার স্বপ্নে বিভোর আমরা? দরকারটাই বা কী?

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী অবশ্য জোরগলায় মনে করে দরকার অবশ্যই আছে। এই শিক্ষার্থীরাই তৈরি করেছে বাংলাদেশের প্রথম ন্যানো-স্যাটেলাইট ‘অন্বেষা’। তাদের মতে এটা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটা। গ্রাউন্ড স্টেশন লিডার সৌরভের ভাষ্য অনুযায়ী, মাটিতে এতো সমস্যা বলেই না আকাশটাকেই পাখির চোখ করা জরুরি।

সাদা চোখে দেখলে ‘অন্বেষা’কে মহাকাশে ভেসে বেড়ানো একটা ছোট্ট বাক্স বলে ভুল হবে। কিন্তু এই ছোটো বাক্সটিই পথ দেখাবে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের। দেখতে ছোটো হলেও তাই দায়িত্ব কিন্তু কোনোভাবেই ছোটো নয়।

অন্বেষার যাত্রা শুরু হয়েছে স্পেসএক্স ড্রাগনের ফ্যালকন-৯ রকেটে। এটি বিশ্বের প্রথম রিইউজেবল রকেট (এমন রকেট যেটাকে বার বার মহাকাশে পাঠানো যায়)। আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র বা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের উদ্দেশ্যে দ্বিতীয়বারের মতো এই রকেট যাত্রা করছে। ভবিষ্যতের মহাকাশযাত্রাকে আরো সহজ আর সুলভ করার লক্ষ্যে এলন মাস্ক-এর প্রতিষ্ঠান ফ্যালকন-৯ রকেটটি তৈরি করেছে।

রকেটটি টেক-অফ করার আগে নাসা ঘোষণা দেয়: “রকেটের সাথে পাঁচটি কিউব স্যাটেলাইট যাচ্ছে, যেগুলো বার্ডস নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের অংশ। জাপান, নাইজেরিয়া, ঘানা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড আর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এগুলো তৈরি করেছে। কিউব স্যাটেলাইটগুলোর মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব মাপা হবে, আর হিসেব করে বের করবে অন্য স্যাটেলাইটলোর অবস্থান। পৃথিবীতে যে অপারেটররা কাজ করছে, তাদের নেটওয়ার্ক দেখানোও এই স্যাটেলাইটগুলোর দায়িত্বের একটি অংশ।

নাসার ঘোষণায় ‘বাংলাদেশ’ শুনে উদীয়মান প্রকৌশলীর চোখে ঝলসে ওঠে গর্ব আর আশার আলো। আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে মানুষের তৈরি করা ৪,০০০ স্যাটেলাইট। ৪০০ কিমি. ওপরে তাদের মধ্যে একটির গায়ে লেখা আছে: “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।” স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ হিল কাফি, রায়হানা ইসলাম অন্তরা এবং মাইসুন ইবনে মনোয়ার।

অন্বেষা-কে অবশ্য খুব বেশিদিন একা থাকতে হবে না।

বাংলাদেশের প্রথম জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ এ বছরের শেষের দিকে লঞ্চ করা হবে। বাংলাদেশের দিকেই সবসময় থাকবে এই স্যাটেলাইটের চোখ। কৃত্রিম উপগ্রহের মূল্য ধরা হচ্ছে ২৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে, এবং এটি কাজ করবে আগামী ১৫ বছর। আবহাওয়ার দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি আমাদের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় সাহায্য করবে, আর অন্য স্যাটেলাইটগুলোর ওপর থেকে আমাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনবে। স্যাটেলাইট ভাড়া করতে প্রতি বছর ১৪ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। বেঁচে যাবে সে খরচ।

বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের জন্য মহাকাশ যাত্রা বিলাসিতা মনে হতে পারে। হবারই কথা। যেহেতু স্পেস টেকনোলজিতে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দু’টো পরাশক্তি। কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব যে দেশগুলোতে পড়বে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশও আছে। সে বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে আগে থেকে পদক্ষেপ নেয়া খুবই জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জীবনযাত্রায়, বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। দেশের শতকরা ৪৭ ভাগ শ্রমশক্তি জড়িত এই শিল্প জিডিপি-তে বছরে প্রায় ১৬% অবদান রেখে চলেছে। এছাড়া এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্বারা বেশ প্রভাবিত হয়। যার ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং লাখো কৃষকের জীবনযাত্রা হুমকির মধ্যে পড়ে।

এ সমস্যা নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি জমি ও পানির টপোগ্রাফিক্যাল (অবস্থানগত/ভৌগোলিক) পরিমাপ পেতে সহায়তা করবে। ফসলি জমি ও ফসলের ধরন (প্যাটার্ন) বিশ্লেষণ করে গবেষকরা আসন্ন ফলনের পূর্বাভাস দিতে পারবেন। আসন্ন বিপর্যয় মোকাবেলা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া বা পণ্যের উন্নয়নে এ সকল তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

হাওর অঞ্চলে বর্ষাকালের অনেক আগেই হওয়া অতিবৃষ্টি এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য কৃষকের প্রায় এক বছরের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমাদের জলবায়ু দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে আর সেকারণে দুর্যোগগুলো সামনে আরো খারাপের দিকে যাবে বলেই আশঙ্কা করা যায়। যে হারে সমুদ্রের জলরাশি বাড়ছে, তাতে করে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭% জমি প্লাবিত হয়ে যাবে, যা প্রায় এক কোটি আশি লক্ষ জনগণকে স্থান পরিবর্তনে বাধ্য করবে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি ব্যবহার না করলে ভূমি ক্ষয়ের সঠিক পরিমাপ পাওয়া সম্ভব নয়। এমনকি সেগুলো মিথ্যাও হতে পারে।

মহাকাশে একটি স্যাটেলাইট স্থাপন এইসব অনিবার্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়তা করবে। এর সাহায্যে বৃষ্টিপাতের রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস দেয়া, বন্যাদুর্গত এলাকার অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ করা আগের চেয়ে সহজ হবে। ২০১৫ সালের শুরুতে ভারী বর্ষণের কারণে মালাউয়িতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিলো। যার ফলে ৩,৯০,০০০ লোক বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় এবং ২,২০,০০০ একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়। এমন দুর্যোগের মধ্যেও জাতিসংঘের ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড সাপোর্ট ডিভিশনের তড়িৎ সতর্কবার্তায় জাতিসংঘের ফুড প্রোগ্রাম মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সমর্থ হয়। কারণ নাসা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে দরকারি সরঞ্জাম তৈরি করে মালাউয়ির আবহাওয়া তারা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন।

এছাড়া দুর্যোগের কারণে আমাদের যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আক্রান্ত জনপদগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা সত্ত্বেও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে ওইসব অঞ্চলে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা সম্ভব। এমনকি ডিজিটাল টেকনোলজিও কাজ না করলে সাধারণ রেডিও যন্ত্রপাতি দিয়ে ফ্রিকোয়েন্সিতে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে কার্যকরী যোগাযোগ তৈরি করা যায়।

অর্থাৎ, মহাকাশে স্থাপিত এই প্রযুক্তি পৃথিবীতেও বিভিন্ন সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

সৌরভ জানান, “এই প্রক্রিয়ায় আমাদের অন্য একটি কার্যকরী পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি একটি আউটরিচ প্রোগ্রাম যার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তাদের এলাকায় স্থাপিত অ্যান্টেনা দিয়ে আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে। যেমন তাদের এলাকায় সাইক্লোন ধেয়ে আসতে থাকলে তার পূর্বাভাস তারা সেই অ্যান্টেনার মাধ্যমেই পেয়ে যাবে।”

অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও দলের সহকারী ইনভেস্টিগেটর মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান সাগর যোগ করেন, “এটি কোনো রকেট সায়েন্স নয়। অর্থাৎ এই প্রযুক্তিটি বেশ সরল, সহজে বোধগম্য হওয়ার মতো। কিন্তু পর্যাপ্ত গবেষণা ও দক্ষতার অভাবে এতোদিন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।”

“আমরা তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছি” প্রজেক্টের প্রধান ইনভেস্টিগেটর অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডঃ খলিলুর রহমান বলেন। “আমরা চেয়েছি এর মাধ্যমে স্পেস টেকনোলজিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তরুণ প্রজন্মকে দেখাতে এবং এই বিষয়ে তাদের উৎসাহিত করতে।“

কক্ষপথে ‘অন্বেষা’কে পাওয়ার মাধ্যমে স্পেস টেকনোলজিতে গবেষণার জন্য আমাদের সামনে সীমাহীন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গিয়েছে। সাতটি দেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে বার্ডস প্রজেক্টের নেটওয়ার্ক বিনা মূল্যে তথ্য ও জ্ঞান সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবে। শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একসাথে কাজ করার সুযোগ তৈরিতে এই প্রযুক্তি নতুন একটি ভিত্তি তৈরি করবে।

‘অন্বেষা’র মতো কিউব স্যাটেলাইট মূলত পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য স্বল্প খরচে নির্মিত স্পেস প্রযুক্তির একটি অনন্য উদাহরণ। এটির আয়ু কম এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই একে ডিজাইন করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় স্পেস প্রযুক্তি শুধুমাত্র মহাজাগতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই নয়, বরং এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীতেও সবার জন্য বাসযোগ্য সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি কর তে পারবো।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of