কালিগঞ্জ থেকে কাবুল, মাগুরা থেকে লাইবেরিয়াঃ এক অভিযাত্রীর গল্প

অভিযাত্রীর সহজ দর্শন

তিনি মার্কো পোলো বা ক্রিস্টোফার কলোম্বাস নন! কিন্তু তাঁরও আছে অভিযানের নেশা। নিজের পেশাগত কাজকে ঘিরেই তাঁর অভিযান যার ভিত্তি এক সহজ দর্শন, আর তা হলো মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণে কাজ করে যাওয়া। সেই দর্শন বুকে নিয়ে ব্র্যাকে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালে। সেই ছিল তাঁর প্রথম চাকরি। শুরুতে ভাবেননি খুব বেশি দিন এখানে থিতু হবেন। কিন্তু নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার নেশায় শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মানুষের উন্নয়ন অভিযানের সাহসী অভিযাত্রী হয়েকখন যে প্রায় তিন তিনটি দশক পার হয়ে গেল তা যেন টেরই পেলেন না।

নাম তাঁর খালেদ মোর্শেদ। এই খাতেই বহুমুখী কাজ করে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই। ব্র্যাক জীবনের প্রতিটি দিনই যেন তাঁর কাছে একেকটি গল্প।

ব্র্যাকে তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ। শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। কালিগঞ্জে তখন ব্র্যাকের অফিস চালু হয়েছে মাত্র। কৃষকদের সুবিধার জন্য এলাকায় ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপন ছিল তাঁর প্রথম কাজ। এমন কাজ আগে কখনও করেননি, কিন্তু তাতে কী? প্রবল উদ্যমে নলকূপ বসানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

কালিগঞ্জে নারী সহকর্মীদের কথা তাঁর বিশেষ করে মনে পড়ে কারণ তাঁরা অধিকাংশই ছিলেন মাস্টার্স পাশ। “সেই সময় এতজন মাস্টার্স করা নারী সহকর্মী থাকাটা আমাকে বিস্মিত করে।” তখন কর্মীরা কয়েকজন করে একসাথে বাসা ভাড়া করে থাকতেন। সবাই মিলে বেশ হইচই করে কাজ করার একটি পরিবেশ ছিল, সেকথা খালেদ মোর্শেদ আজও ভোলেননি।

 

জেলা থেকে ‘জেলান্তরে’..

খালেদ মোর্শেদের পৈতৃক ঠিকানা ফেনী। পড়াশোনা চট্টগ্রাম শহরে। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেও জেলা থেকে জেলায় ছুটে বেড়ানোর ব্যাপারটা ঠিকই বহাল থাকল। কালিগঞ্জে বছর দুয়েক কাজ করলেন। এখানকার আরো এক অভিজ্ঞতা তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। ঝিনাইদহ ও সন্নিহিত জেলাগুলোয় তখন সর্বহারা পার্টির প্রবল প্রতাপ। প্রতিদিনই নতুন নতুন সহিংসতার খবর পাওয়া যেত। হঠাৎ একদিন সর্বহারা পার্টির দুজন সদস্য তাঁর অফিসে এসে হাজির। চাঁদা চাই তাঁদের। কিন্তু খালেদ মোর্শেদের পকেট থেকে চাঁদা আদায় কি এতই সহজ? চাঁদা তো তিনি দিলেনই না, বরং কৌশলে তাঁদের সাথে এমন বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেললেন যে পরে অনেকবার একত্রে সিনেমাও দেখতে যাওয়া হয়েছিল।

কালিগঞ্জ থেকে পদোন্নতি পেয়ে খালেদ ছুটলেন মাগুরায়। সেই পদোন্নতির খবর এল হুট করে, বিনা নোটিশে। ছিল না তখন মোবাইল কিংবা ইন্টারনেট। রিজিওনাল অফিস থেকে একজন কর্মসূচি সংগঠক (পিও) এসে তাঁকে এরিয়া ম্যানেজার পদে পদোন্নতির সংবাদ দিলেন।

মাগুরায় কিছুদিন কাজ করার পর হঠাৎ করে আবার একদিন বদলির খবর এল। ঠিকানা মানিকগঞ্জ। সেখানে যোগ দিলেন রিজিওনাল প্রোগ্রাম অর্গানাইজার হিসেবে।

পেশাগত জীবনে শুধু নয়, পারিবারিক জীবনেও তাঁর কম অভিযান নেই! তার নমুনা পাওয়া যায় মানিকগঞ্জে। সেখানে থাকতেন এক সহকর্মীর সাথে। কিন্তু ঘরে তাঁর একটিমাত্র তোষক, আর কোনো আসবাব নেই। সারাদিন বাইরে বাইরেই কাটে তাই কিনব, কিনছি করেও অন্যকিছু কেনা হয়নি। হঠাৎ একদিন শুনলেন স্ত্রী পরদিন আসছেন। তটস্থ হয়ে সহকর্মীদের জানালেন। পরদিন স্ত্রী পৌঁছাবার আগেই সহকর্মীদের উদ্যোগে বিছানা, টেবিল-চেয়ার সবঘরে চলে এল।

মানিকগঞ্জে এক বছর পেরোতেই আবার সেখানকার পাট গোটাতে হলো। এবার গন্তব্য কুমিল্লা। সময়টা তখন ১৯৯৬। সেখানে কিছুদিন যেতে না যেতেই কক্সবাজারের পথে রওনা করলেন।১৯৯৭ সালে যে প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হেনেছিল তারই জরুরি ত্রাণসহায়তা কাজের নেতৃত্ব দিতে তাঁকে রিজিওনালকোর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো।

তারপর এলো ২০০২ সালের অক্টোবর মাস। এসে গেল এক রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রস্তাব যা হঠাৎ করেই যেন তাঁর দিগন্তকে প্রসারিত করে দিল আরো অনেকটা।

 

কাবুলিওয়ালার দেশে

চট্টগ্রামে কাজ করার সময় একদিন অপারেশনস ডিরেক্টর আমিন ভাইয়ের ফোন এল, আফগানিস্তান থেকে। ভূমিকা ছাড়াই তিনি জানতে চাইলেন খালেদ মোর্শেদের পাসপোর্ট আছে কিনা। বললেন, না থাকলে যত দ্রুত সম্ভব পাসপোর্টসহ জরুরি কাগজপত্র জোগাড়যন্ত্রের কাজ যেন শুরু করে দেন তিনি।

দ্রুত প্রয়োজনীয় সকল কাজ সেরে পাড়ি জমালেন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের উদ্দেশে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যাকের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে। প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁকে সেখানে প্রথম রিজিওনাল ম্যানেজারের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হলো।

নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, সর্বোপরি নতুন চ্যালেঞ্জ। অফিসের জন্য জায়গা নির্বাচন, অফিস ঘর তৈরি, স্থানীয়দের মাঝ থেকে কর্মী নিয়োগ- এই সমস্ত কিছুর পাশাপাশি তাঁকে মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলগঠনও করতে হচ্ছিল। এসব কাজে তিনি ঘুরে বেড়াতে লাগলেন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানিস্তানে কর্মী নিয়োগ ছিল এক দূরহ কাজ। কাজের জন্য অফিসে ইংরেজি জানা লোক দরকার ছিল। কিন্তু আশেপাশে সেরকম লোক ছিল যেন ডুমুরের ফুল। অনেক কষ্টে খুঁজে খুঁজে নিয়োগ দিতে লাগলেন।

বিকেল বেলা মাঝে মাঝে যখন হাঁটতে বের হতেন তখন তিনি দেখতে পেতেন কিছু কোচিং সেন্টার, যেখানে ইংলিশ শেখানো হয়। একদিন ‘ইংলিশ’ কথাটি দেখেই তিনি চমকে উঠলেন এবং তাঁর মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে গেলো! তখন তাঁর প্রয়োজন নারীকর্মী। সেই নারীকর্মীর খোঁজ পাবার আশায় তিনি কোচিং সেন্টারে গেলেন এবং সন্ধান পেলেন ইংরেজি জানা বেশ কয়েকজন নারীকর্মীর। এছাড়া রাস্তাঘাটে যদি কাউকে দেখে মনে হতো যে সে ইংরেজি জানে, তখন নিজে থেকে কথা বলে কাউকে যদি কাজ চালানোর মত মনে হতো সাথে সাথে দলে লুফে নিতেন!

২০০২-এর অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানে থাকলেন। এই সময়ের মধ্যে কাজের কলেবর বেড়েছে, তাঁর দায়িত্বেও পরিবর্তন এসেছে। কাবুলের বাইরেও সামাঙ্গান রাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছেন। এমনও হয়েছে, ঘোড়ায় চড়ে যাবার সময় একজন কাবুলিওয়ালা হয়েছেন ভূপাতিত, কিন্তু বাঙ্গালিরা নন!

 

আফ্রিকা অভিযান ও তারপর

২০০৬ সালে আফগানিস্তান থেকেদেশে ফিরলেন।বছরখানেক পেরোতেই আবার বিদেশের ডাক। এবার আফ্রিকা। লাইবেরিয়াতে তখন ব্র্যাক কাজ শুরু করেছে। তিনি সেখানে গেলেন ফাইনানশিয়াল এনালিস্ট হিসেবে। দুই বছর পর নতুন দায়িত্ব পেলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত লাইবেরিয়াতে কাটল। তারপর সিয়েরা লিয়ন। সেখানে প্রায় দশ মাস মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচিতে কাজ করে দেশে ফিরলেন।

আফ্রিকায় ব্র্যাকের মাইক্রোফাইন্যান্সকর্মসূচির প্রসারে তাঁর অবদানের বিষয়টি মাথায় রেখে দেশে ফেরার পর আরো এক গুরুদায়িত্ব দেওয়া হলো তাঁকে। মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির সেবাগুলোকে ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনতে গঠিত অটোমেশন কর্মকাণ্ডের টিম লিডার হিসেবে নিযুক্ত হলেন তিনি।

অভিযান চলবেই..

সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমরা। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আগত ছয় লাখেরও বেশি মানুষ এই মুহূর্তে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন। এই মানুষগুলোকে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য ব্র্যাক যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে সেখানে মানবিক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে খালেদ মোর্শেদ দায়িত্ব নিয়েছেন। আগত মানুষদের সহায়তায় তাঁর কর্মীবাহিনী নিয়ে দিনরাত কাজ করে চলেছেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলে, আরাম-আয়েশ ভুলে ব্র্যাকের গোলাপি পোশাকে তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন এক অস্থায়ী আবাস থেকে আরেক অস্থায়ী আবাসে, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্প নিয়ে।

যে অভিযানের মন্ত্র বুকে নিয়ে খালেদ মোর্শেদ ও তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষেরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে চলেছেনসেটি এক সুন্দর পৃথিবী নির্মাণের মন্ত্র। মানুষের ভালোবাসাই তাঁদের অক্লান্ত ছুটে চলা ও শ্রমের পুরস্কার। গর্বে বুক তাঁর ভরে যায় যখন আফগানিস্তান থেকে সাবেক সহকর্মী ফোন করে বলেন, ‘আমার ছেলে হয়েছে, আর সেই ছেলের নাম রেখেছি তোমার নামে!”

অন্যের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ এই শ্রমক্লান্তিহীন মানুষটির কল্যাণ কামনা করি আমরা। কামনা করি তিনি যেন আরো গুরুদায়িত্ব সমধিক আনন্দে ও মেধায় পালন করে যেতে পারেন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of