কার্টুনঃ অন্ধকারে আলোর প্রতিবাদ

January 9, 2019

আঁকাআকির একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ‘কার্টুন’। যে কথা মানুষ সহজে বলতে পারছে না কিংবা কীভাবে বোঝাবে সেটা বুঝতে পারছেনা, খুব সহজেই কার্টুন চিত্রের মাধ্যমে সেটা বোঝান সম্ভব।

লেখাটি শুরু করা যাক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ছোটো একটি গল্প দিয়ে। শিল্পাচার্য একবার স্পেনে গেলেন, রেষ্টুরেন্টে খেতে বসে পড়লেন মহাবিপদে। ওয়েটার ইংরেজি বোঝেনা আবার শিল্পাচার্যও স্প্যানিশ বোঝেন না। কী বিপদ! ঠিক এই সময় শিল্পাচার্যের মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি তার স্কেচ খাতাটিতে এঁকে ফেললেন একটি গরু, গরুর পায়ের অংশ অর্থাৎ রানের মাংস। সেখানে তির দিয়ে এঁকে দিলেন কড়াই। মানে, তিনি গরুর রানের মাংস খেতে চান। এমনিভাবে মুরগি ও ডিম আঁকলেন এবং ডিমভাজি আর সঙ্গে আলু মাছের তরকারি আঁকলেন। ওয়েটার খুব সহজেই বুঝে ফেলল তার মনের ভাষা।

একজন শিল্পীর ভাষা হলো স্কেচের আঁকিবুকি। সঙ্গে তুলির টান। শিল্পীর আঁকা রংতুলির ছোপছাপ একএকটি বর্ণ তৈরি করে। রূপ দেয় কোনো বৃহৎ বক্তব্যের যেখানে থাকে আগামীর ইঙ্গিত। আর আঁকাআকির একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ‘কার্টুন’। যে কথা মানুষ সহজে বলতে পারছে না কিংবা কীভাবে বোঝাবে সেটা বুঝতে পারছেনা, খুব সহজেই কার্টুন চিত্রের মাধ্যমে সেটা বোঝান সম্ভব। তাই সমাজ সচেতন কার্টুনিস্টরা না বলতে পারা কথাগুলো খুব সহজেই অন্যের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেই সঙ্গে সময়ের দাবি। রঙ্গরসের মাধ্যমে একজন কার্টুনিস্ট বুঝিয়ে দেয় সমাজের ঘুনে ধরা জায়গাগুলো। সমাজের বড়ো বড়ো সংস্কারের অট্টালিকায় যে আস্তারণ খসে পড়ে, সেখানে কীভাবে মেরামত করা সম্ভব সেটা একটা কার্টুন চিত্রের মাধ্যমে সহজেই সর্বস্তরের মানুষকে বোঝানো সম্ভব।

অন্যায় যার, লজ্জা তার।
এগিয়ে এসে বলুক নারী, আমি রুখে দাঁড়াতে পারি।
কার্টুনিস্ট: আহসান হাবীব

দেশে এখন পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের এগিয়ে আসাটা লক্ষ্যণীয়। কিন্তু নারীদের এই যে এগিয়ে আসা, সমাজের উন্নয়ন বৃদ্ধিতে অংশগ্রহণ সেটা কিন্তু সহজ পথ ধরে নয়। সে পথে বেছানো অসংখ্য কাঁটা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত কাঁটাগুলো হয়ে উঠেছে দিনে দিনে ভয়ঙ্কর যা রুদ্ধ করছে নারীদের অগ্রণী পথ। তাই একে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং সেটা যদি আমরা সময়মতো নির্মূল করতে না পারি তাহলে, নারী-পুরুষ সকলে মিলে আগামীর পথ চলায় দেখা দেবে সংকট। আমাদের চারপাশে কিছু মানুষ আছে যারা অনবরত বাঁধা সৃষ্টি করে চলেছে নারীর এগিয়ে চলা পথে। ঠিক এখানেই এগিয়ে আসে একজন কার্টুনিস্ট। যুদ্ধ শুরু হয় সমাজটা মেরামতের। যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় শিল্পীর স্কেচবুক। আর অস্ত্র হিসেবে পেন্সিল। সঙ্গে গোলাবারুদ হিসেবে রক্ষিত থাকে বিভিন্ন রংয়ের পুঁজি। যুদ্ধক্ষেত্রের সময়গুলোকে সন্মুখে এগিয়ে আনতে রংগুলোই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। কার্টুনিস্টের অঙ্কিত প্রতিটি রেখা তখন ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলে।

প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর ইউএন ওমেন বিশ্বব্যাপী পালন করে থাকে ’16 Days of Activism’ কর্মসূচি। অনেক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও এই কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহন করে থাকে। এই বছর ব্র্যাক গ্রহণ করে এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা কার্টুনিস্ট নারীর প্রতি সহিংসতা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নেতিবাচক দিকগুলো নিজেদের কার্টুনে ফুটিয়ে তোলেন যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘কার্টুন’ সিরিজ আকারে প্রকাশ করা হয়। সেইসঙ্গে আহসান হাবীব, মোর্শেদ মিশুদের মত প্রতিষ্ঠিত এবং দক্ষ কার্টুনিস্টদের সাক্ষাতকারের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এসবে ব্যাপক সাড়া ফেলে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। কার্টুনের বিষয়গুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে- নারীরা যেভাবে প্রতিনিয়ত যৌন সহিংসতা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কুফলের শিকার হচ্ছেন, সে অবস্থান থেকে কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে পারে। একটু নজর দিলেই আমরা দেখতে পাব- রাস্তাঘাট, অফিস, বাস প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীকে সমাজের কিছু তথাকথিত ‘অসুস্থ’ মানুষ দ্বারা অপমানিত হতে দেখা যায়। এই অসুস্থ বিভিন্ন বয়সি, বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বেশের মানুষগুলো আমাদের চারপাশে ধুলোবালির মতো ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে, আমরা অনেকেই সেই অপকর্ম দেখছি আবার উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে থাকার চেষ্টা করছি। কেউ কেউ কিছু না দেখার ভান করে এড়িয়ে চলছি। যেন আমার কী দায়।

যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ঘটতে দেখলে কিছু সচেতন মানুষ এই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করছে। তবে, প্রতিবাদগুলো হচ্ছে বিক্ষিপ্ত আকারে। বিক্ষিপ্ত এই প্রতিবাদ গুলোকেই আমাদের সর্বাঙ্গীন প্রতিবাদে রূপ দিতে হবে। সমাজের প্রতিটি পর্যায়ের মানুষকে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদের মাধ্যমে এই যৌন হয়রানি রোধ করা সম্ভব।

এই কার্টুনগুলো দেখলে সহজেই অনুমেয় হয় সমাজের ভঙ্গুর দিকগুলো। শিল্পী বোঝাতে চেয়েছেন অন্যায় যার লজ্জাও তার। একজন নারী এসে বলতে পারে, রুখে দিতে পারে। আবার দেখা যায় সমাজে বড়োদের দেখেই ছোটোরা শিখছে, বড়োদের অপকর্ম যেন কোনক্রমেই ছোটোদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে না পারে। কার্টুন চিত্রে উঠে এসেছে গণপরিবহনে কিংবা জনাকীর্ণ পরিবেশে কীভাবে নারীকে হয়রানির শিকার হতে হয়। কিন্তু কেন? আসলে একজন মানুষের মানসিকতাই তার বড়ো পরিচয়। ছাত্র-পেশাজীবী-কর্মজীবী প্রতিটি মানুষই নারীর প্রতি ভালো আচরণ করতে পারে, বদলে দিতে পারে পৃথিবী।

কখনও কখনও মানুষের অশ্লীল আচরণে পশুও লজ্জা পায়।
কার্টুনিস্ট: আসিফুর রহমান

সমাজ চাইলে সবই সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি সংস্কার। এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিবাদ এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধ। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা প্রতিবাদের ঝড়টা তুলতে পারছি। সেই ঝড়টাই বাস্তব জীবনে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে নিশ্চয়। সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি আমরা এই নারী হয়রানি নিয়ে বেশ কিছু ‘কার্টুন’ সিরিজ আকারে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হতে দেখি। প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রকাশিত এই কার্টুনগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে সহজেই বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। যারা সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয়, প্রিন্ট মিডিয়া তাদের কাছে সহজেই পৌছাতে পারে, সাধারণ মানুষ তখন আরও সচেতন ও সচেষ্ট হবে।

শিল্পী যেমন তার সৃষ্ট কর্মের মাধ্যমে প্রতিবাদটা জানিয়ে দেন, ঠিক তেমনি প্রতিটি পর্যায়ের মানুষকে তাদের কর্মপরিবেশ থেকে প্রতিবাদ সৃষ্টি করতে হবে একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। মনে রাখা প্রয়োজন অন্ধকারে কালো চশমা পড়ে প্রবেশ করলে কখনও আলোর দেখা মেলে না। সকলের মনের আলোই একদিন সূর্যের আলোয় পরিণত হবে। তবেই অন্ধকারের মুক্তি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of