এগিয়ে আসার শক্তিটা দরকার

December 12, 2019

নীরব ছিল চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো, এক পা এগিয়ে আসেনি। বরং আমি কেন প্রতিবাদ করলাম তা নিয়ে কথা বলতে থাকে। আমি সাহায্য চাওয়ার পরও কেউ এগিয়ে আসেনি।

16 Days of Activism against Gender-based Violence নিয়ে আমরা অনেকেই যখন সোচ্চার, যখন নারীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রতিবাদ থামেনি,  ঠিক তখনই একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হই আমি নিজে। নিরাপত্তা দানকারী কে? রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার না আমি? অন্তত নিজের আত্মসম্মান যখন প্রশ্নের সম্মুখীন? তখন? উত্তর খুব সহজ, নিজ দায়িত্ব সবার আগে।

এই দায়িত্ব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে ‘তুমি মেয়ে মানুষ, কথা কম বললেই তো হয়!’ ‘তোমার কারণে কাউকে মুখ দেখাতে পারব না!’ ‘এত রাগ কেন তোর?’ ‘আচ্ছা ছেলেমানুষ তো, একটু কিছু বললেই  প্রতিবাদ করে বিপ্লবী হতে হবে?’-সম্মুখীন হতে হয় এরকম নানাধরনের কথার, হরেক রকম প্রশ্নের। হ্যাঁ, এসব প্রশ্ন এবং একটি জঘন্য পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম আমি নিজে।

মাস দুয়েক আগে একটি কাজ নিয়ে এক সরকারি অফিসে গিয়েছিলাম। অনেক মানুষের ভিড় দেখে বুঝলাম সময় লাগবে। সুতরাং অলস সময়টাকে কাজে লাগাতে আমি আমার ছোটো বোনের সঙ্গে রাস্তার পাশে চা-খাওয়ার জন্য এগোতে থাকি। এমন সময় দুইজন ছেলে রিকশা থেকে নেমে সামনে এগোতে থাকে। লক্ষ্য করলাম, তাদের একজন অত্যন্ত কুদৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে তো আছেই। আমি বুঝলাম তার দৃষ্টি সরাসরি আমার শরীরের এক বিশেষ জায়গায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটির তাকিয়ে থাকায় আমি একধরনের অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, থাক ঝামেলা বাড়াবো না। কিন্তু আমার মন তাতে সায় দিল না। আমিও আগুনদৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকালাম। ওমা! কী কা-! আমার অগ্নিদৃষ্টি দেখে সে চটে উঠল।

আমি তাকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে, সে এমন কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কথা বলল যা যেকোনো মেয়ের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও আপত্তিকর। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমি প্রতিবাদ করি এবং রাগ সামলাতে না পেরে তার গালে কষিয়ে এক চড় বসিয়ে দেই। ঘটনার কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ছেলেটি তার ভুল তো বুঝলই না বরং মনে হলো তার ঠুনকো পৌরুষে আঘাত হানায় সে প্রতিশোধ নেবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল।

সে প্রচণ্ড জোরে আমাকে আঘাত করে মাটিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে আমার চশমা ভেঙে দেয়। নীরব ছিল চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো, এক পা এগিয়ে আসেনি। বরং আমি কেন প্রতিবাদ করলাম তা নিয়ে কথা বলতে থাকে। আমি সাহায্য চাওয়ার পরও কেউ এগিয়ে আসেনি। আমার ছোটো বোনটিও ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। সুযোগ বুঝে ভিড়ের মধ্যে পালিয়ে যায় ছেলেটি।

এরপর আমি নিজেই থানায় ফোন করে পুলিশের সাহায্য চাই। পুলিশ এসেছিলো কিন্তু ছেলেটির পরিচয় না থাকায় এবং পথচারীদের কেউ সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় তারা কিছু করতে পারেনি।

এই আমাদের অবস্থা! নিজের ঘাড়ে এসে না পড়লে কোনো কিছুতেই গা করে না। রাস্তায় কোনো অপরাধ হতে দেখলেও কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে না। দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি উপভোগ করে। কখনও কখনও হয়তো সহানুভূতি দেখায় তবে সমালোচনার পাল্লাটি সবসময়ই ভারী থাকে। এই ঘটনার পর আমি মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। সেসময় আমার পাশে ছিলো অসম্ভব শক্ত মনোবলসম্পন্ন কয়েকজন বন্ধু। তাই আরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে এখন আমি পথ চলি।

সেদিন হয়তো মনে হয়েছিল, আমার নিজেকে রক্ষা করার দায়িত্ব কেবলই আমার। কিন্তু তবুও বিশ্বাস রেখেছিলাম, পরিবর্তন আসবে। এখনও নিজের ওপরই আমার আস্থার মাত্রা বেশি। কিন্তু আজ জানি, শুধু বন্ধু নয়; নারীর প্রতি যেকোনো সহিংসতা প্রতিরোধে আমাদের দেশের সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সচেতনতাবৃদ্ধিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

যৌনতাকে উদ্দেশ্য করে যেকোনো অবাঞ্ছিত আকাঙ্ক্ষা, আহ্বান এবং মৌখিক বা শারীরিক আচরণই যৌন হয়রানি বলে গণ্য হয় এবং নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আমি জানি আমাকে কী করতে হবে। জরুরি হেলপ লাইন ৯৯৯ অথবা নারী নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে ১০৯-এ ফোন করতে হবে। এখন বুঝি সেইসঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করাও জরুরি। তবে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই চিত্রের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। ব্র্যাক জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচি ব্র্যাকের অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নানা কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পুরুষ ও কিশোরদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। সুতরাং নতুন সময়ে নতুনভাবে এগিয়ে চলার এই যাত্রায় শুধু নিজের এগিয়ে আসার শক্তিটা দরকার।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of