এটা আসলে একান্তই নিজের লড়াই

May 21, 2020

নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেয়ে এবং নিয়ম মেনে মোটামুটি সাতদিনের মধ্যে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর আবারও তার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাতে ‘নেগেটিভ’ ফল আসে।

মনোজ (কর্মীর ছদ্মনাম) (৩১) কাজ করেন ব্র্যাকের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে। তার কাজ ছিল যক্ষ্মা রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি ১৫ই এপ্রিল শেরপুর জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। ১৯ দিন সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

কখন আক্রান্ত হলেন? 
১৩ই এপ্রিল করোনা পরীক্ষা করাতে যান জেলা সিভিল সার্জন অফিসে। ১৪ই এপ্রিল তার করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়। এরপর ১৫ই এপ্রিল খোদ ইউএনও এসে তাকে শেরপুর জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করে দেন।

হাসপাতালের অভিজ্ঞতা
পুরো ইউনিটে তিনি একাই ছিলেন করোনা রোগী। একজন হাসপাতাল-কর্মী খাবারের সময় দরজার সামনে খাবার দিয়ে আসত। সারাদিন সারারাত একা! এমনিতেই তার একটু অ্যাজমার সমস্যা আছে। করোনার প্রভাবে যদি শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তখন কী হবে? এসব ভেবে তিনি খুবই ভীত হয়ে পড়েন। নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয় তার। ভাবেন, হয়তো তিনি আর বাঁচবেন না!

যদিও তাকে ফোনে সবাই উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। সিভিল সার্জন, ইউএনওসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারাও তাকে ফোন দিয়ে সাহস জোগান। পরিবারের সদস্য, সহকর্মীরাও নিয়মিত ফোন করে তার খোঁজ-খবর নিতেন। কিন্তু তারপরও বিশেষ করে রাতের বেলা তিনি খুবই খারাপ বোধ করতেন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় তার ঘুম আসত না। অস্থির লাগত।

এভাবে দুই দিন কেটে যায়। সঙ্গে শুধু মোবাইল ফোন। তিনি ফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার করে পত্রপত্রিকা পড়তেন। বিভিন্ন দেশের করোনা আক্রান্তদের খবরগুলো তার মনোযোগ কাড়ত। তিনি দেখলেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে যত জন মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি মানুষ ভালো হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, না এভাবে ভেঙে পড়া চলবে না। তাকে সুস্থ হতে হবে। মনোবল ঠিক রাখতে হবে। এরপর তিনি নিজেই নিজের যত্ন নিতে শুরু করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পানি গরম করার জন্য তাকে একটি ইলেকট্রিক কেটলি ও ফ্লাস্ক দিয়েছিল। ফেসবুক থেকে তিনি জেনেছিলেন, এ সময় আদা-রসুন, লবঙ্গ-দারুচিনি-এলাচ সহযোগে গরম পানি খেলে এবং গরম পানির ভাপ নিলে উপকার পাওয়া যায়। তিনি দিনে পাঁচ-ছয়বার এটা করতেন। আদা-মেশানো গরম পানি দিয়ে গারগল করতেন। লেবু-গরম পানি খেতেন। এসব করে তিনি অনেক আরাম বোধ করতেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। তাঁকে প্রচুর পরিমাণে খাবার দেওয়া হতো। এছাড়া সহকর্মীরা তার জন্য বিভিন্ন ধরনের ফল পাঠাতেন।

নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেয়ে এবং নিয়ম মেনে মোটামুটি সাতদিনের মধ্যে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর আবারও তার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাতে ‘নেগেটিভ’ ফল আসে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে আরও সাতদিন হাসপাতালে কাটাতে বলেন। এ সময় তিনি মোবাইলে কোভিড-১৯ বিষয়ক সচেতনতা ও সেফগার্ডিংয়ের ওপর দুটি অনলাইন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় দফায় আবারও নমুনা পরীক্ষায় ফল ‘নেগেটিভ’ আসায় ১৯ দিন পর তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এখন তিনি সম্পর্ণ সুস্থ।

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে মনোজ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, প্রশাসনসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেভাবে তাকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে, তাতে তিনি খুবই আপ্লুত। তিনি বলেছেন, সবাই মিলে আমাকে সহযোগিতা না করলে এত দ্রুত আমি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে পারতাম না।

সকলের জন্য পরামর্শ
মনোজের মতে, কোভিড-১৯-কে ভয় পাবার কিছু নেই। নিয়ম মানলে এবং মনোবল চাঙ্গা রাখলে এর থেকে সুস্থ হওয়া কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। কেউ যদি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন, তবে সবার আগে নিজের মনকে তৈরি করতে হবে। নিজের সেবা-শুশ্রূষা নিজেকেই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটা আসলে একান্তই নিজের লড়াই। এই লড়াইয়ে নিজেকেই জয়ী হতে হবে। অন্যরা হয়তো বাইরে থেকে সহযোগিতা ও সমর্থন দিতে পারেন। কিন্তু নিজের সেবাযত্ন নিজেকেই করতে হবে। আত্মবিশ্বাস ও মনোবল ঠিক রেখে করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করতে হবে।

মাস্ক-পিপিই যথাযথভাবে পরিষ্কার করতে হবে
মনোজ মনে করেন, মানুষের চেয়ে ব্যাধি বড়ো নয়। মানুষের শক্তির কাছে কোনো কিছুই জয়ী হতে পারে না। মনোজ বলেন, ‘‘করোনা থেকে রেহাই পেতে সকলের উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া ঠিক নয়। বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। মাস্ক-পিপিই যথাযথভাবে পরিষ্কার করতে হবে। মাস্ক-পিপিই ব্যবহারের পরেও কিন্তু আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম। নিশ্চয়ই এসব ব্যবহার ও পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে আমার কোনো ত্রুটি ছিল।

কাজেই কোনো ভুল করা যাবে না। সবাই সতর্ক হোন, সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।’’

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments