এই শিশুদের ভবিষ্যত কী?

December 18, 2017

যতোদূর চোখ যায় মানুষের লাইন। দুপুরের খাবার নেয়ার জন্য তারা লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বৃদ্ধ যুবক যেমন আছেন সেখানে তেমনি আছে অনেক শিশু। দীর্ঘ অপেক্ষার পর খাবারের প্যাকেট হাতে করে যাচ্ছে তারা সারি সারি করে বানানো অস্থায়ী ঘরগুলোতে।

কক্সবাজারের কুতুপালং, বালুখালী, থায়াংখালী, হাকিমপাড়া, শ্যামলাপুর সর্বত্রেই এমন দৃশ্য দেখতে হয়েছে। যে বয়সে একজন শিশুর স্কুলে থাকার কথা, মাঠে খেলার কথা সেই বয়সে উদ্বাস্তু হিসেবে এমন লাইনে দাঁড়ানো দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। অবশ্য ব্র্যাকের শিশু বান্ধব কেন্দ্রগুলোতে (সিএফএস) গিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের খেলতে দেখে কিছুটা মন ভালো হয়। কিন্তু কক্সবাজারের সমাজসেবা কর্মকর্তা মনজুর যখন জানালেন, এখন পর্যন্ত তারা ৩৬ হাজার শিশুকে চিহিৃত করেছেন যারা এতিম, তখন আবার বিষন্ন হতে হয়।

ভাবতে থাকি ২০১৪ ও ২০১৫ সালের কথা। বঙ্গোপসাগর দিয়ে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যাণ্ডে পাচার হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মানুষের মধ্যে সেবার অনেক শিশুকেও দেখেছি। এবারের এই এতিম শিশুরাও কী আবার সেই পাচারের শিকার হতে পারে? মেয়ে শিশুরা থাকলে তাদেরও কী নির্যাতন সইতে হবে? মালয়েশিয়া-থাইল্যাণ্ড সীমান্তের সেই গণকবরগুলো দেখার স্মৃতি মন থেকে মুছে যায়নি আজও। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম আবারও কী পাচার শুরু হতে পারে?

দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সুবাদে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন বিশ্ববাসীর জানা। গত ২৫ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ছয় লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এদের প্রায় অর্ধেকই শিশু। পত্রিকার পাতা, টেলিভিশন কিংবা বাস্তবে গিয়ে যখন এই শিশুদের অসহায় মুখগুলো দেখতে হয় তখন বারবার নিজের ১১ মাসের ছেলেটার কথা মনে পড়ে। তিন মাস হয়ে গেলেও ভুলতে পারি না সেই ছবি ঢেউয়ে ভেসে আসছে রোহিঙ্গা শিশুর লাশ। এ কী কেবলেই শিশুর লাশ নাকি মানবতার লাশ? আচ্ছা এই শিশুদের কী অপরাধ? কেন তারা আজ উদ্বাস্তু?

শ্যামলাপুর সিএফএসে গিয়ে দেখেছি চার বছরের এক শিশুর কোলে আট-দশমাসের আরেক শিশু। মানুষের সৃষ্ট নৃশংসতা চার বছরের এক শিশুকে তার ছোট ভাইয়ের বড় অভিভাবক বানিয়ে দিয়েছে।

ব্র্যাকে যোগ দেয়ার আগে এক যুগেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছি। অভিবাসন আর মানবপাচার নিয়ে নিয়মিত কাজ করার কারণে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন, জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা অজানা নয়। আর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুসহ যেসব এলাকায় রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার সেই গ্রামগুলোতে গিয়েছি আরও এক দশক আগে। তখনো নির্যাতনের এসব কথা শুনে এসেছি।

শুধু বাংলাদেশের ক্যাম্পেই নয়, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে অনেক রোহিঙ্গাকে দেখেছি। তাদের কাছে জানতে চাইতাম তোমরা কেন এতো ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দাও? তাদের জবাব, মিয়ানমারে থাকলে তো নিশ্চিত মৃত্যু। বাংলাদেশে বা সমুদপ্রথে মালয়েশিয়া যেতে পারলে তো অন্তত বেঁচে থাকা যাবে।

বেঁচে থাকার অধিকার সবচেয়ে বড় মৌলিক অধিকার। অথচ নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের সেই অধিকারই আজ বিপন্ন। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে এ দেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু। এখনো চলছে। জাতিসংঘ বলছে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় জাতির নাম রোহিঙ্গা। মাত্র তিন মাসে ছয় লাখ মানুষের আশ্রয় নেয়া সেই অসহায়ত্বেরই চরম স্বাক্ষর।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনেকদিন ধরে কাজ করার কারণেই এবারের ঘটনাও শুরু থেকেই আঁচ করতে পারছিলাম। আগস্টের ২৭ কিংবা ২৮ তারিখেই টেকনাফের সাংবাদিক গিয়াস ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। গিয়াস ভাই বলেছিলেন, এবার বোধহয় একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমার রাখবে না।

ব্র্যাকের দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা কমিটির জরুরী সভাগুলোতে সেই কথা উল্লেখ করে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই বলেছিলাম, আমার নিজের ধারনা সাত থেকে আট লাখ রোহিঙ্গা এবার চলে আসবে। কাজেই আমরা যেন পুরোদমে প্রস্তুতি নেই।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ব্র্যাকের কী কর্মকাণ্ড চলছে সেখানে যারা কাজ করছেন তারা জানেন। জানে স্থানীয় প্রশাসনও। ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্র্যাক সেখানে ১২ হাজার ৩৬৪ টি টয়লেট করেছে। এর সুবিধা পাচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। ১৮ টা গভীর নলকূপ এবং ১১৪৫ টা শ্যালো নূলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। নারীদের জন্য দুই হাজার ২৬৮ টি গোসলখানা করা হয়েছে। ১০ টা প্রাথমিক এবং ৫০ টা স্যালেটাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে পাঁচ লাখেরও বেশি লোককে স্বাস্থ্য সেবা দিয়েছে ব্র্যাক। প্রায় পৌনে দুই লাখ কম্বল এবং দেড়লাখ শিশুকে শীতের কাপড় দেয়া হয়েছে।

তবে সব কর্মকাণ্ডকে ছাড়িয়ে আমার মন টানে শিশুবান্ধব কেন্দ্রগুলো। সেখানে গেলে শিশুদের কলকাকলি কিছুটা হলেও মন ভালো করে। কুতুপালং, থায়াংখালী এবং শ্যামলাপুরসহ প্রতিটি শিশুবান্ধব কেন্দ্রেই এখন শত শত শিশু। সেখানে তারা খেলছে, গাইছে। স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের লেখাপড়া শেখাচ্ছে। না বুঝলেও রাখাইন ভাষায় শিশুদের কোরাস বেশ লাগে।

শ্যামলাপুরে আট বছরের বাহার, ছয় বছরের রহমান, নয় বছরের জাবেরসহ আরও অনেক শিশুর সঙ্গ কথা হয়। বাংলাদেশে এসে প্রত্যকেই খুশি। কারণ কী জানতে চাইলে তাদের জবাব, এখানকার মানুষজন ভালো। তারা কাউক গুলি করে মারে না।

শিশুবান্ধব কেন্দ্রগুলোর দেয়ালে শিশুদের আকা বেশ কিছু ছবিও আছে। তাতে কার্টুনচরিত্র মিনার ছবি আছে। তবে মিনা কোন এক কারণে কাঁদছে। মিয়ানমারে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশুদের আঁকা কিছু ছবি ইউনিসেফ তাদের ফেসবুক পেজেও দিয়েছিল। সেখানে একটি ছবিতে বোধহয় দেখেছিলাম হেলিকপ্টার থেকে বোমা ফেলে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে। মানুষ নৌকায় করে পালিয়ে যাচ্ছে।

শিশুদের আঁকা এসব ছবিই বলে দেয় নির্যাতনের ঘটনাগুলো তাদের শিশু মনে কতটা ক্ষত তৈরি করেছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুসারে, আগস্টে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৬০ শতাংশই শিশু।

ব্র্যকের সিনিয়র সেক্টর স্পেশালিষ্ট বিবেকান্দি দাস জানালেন, এই মুহুর্তে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য ব্র্যাকের ২০০ ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস’ (সিএফএস) চালু করা হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত ৩১ হাজার ১১২ জন শিশু এসেছে। শিশুকিশোরদের মানসিক আঘাত ও ট্রমা থেকে বের করে আনতে এই সেন্টারগুলো কাজ করছে।

এই কেন্দ্রগুলোতে গেলে আসলেই কিছুক্ষণের জন্য মন ভালো যায়। তবে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ভবনের নিচ তলায় গিয়ে যখন এতিমশিশুদের ডাটাবেজের কাজটা দেখতে হয়েছিল তখুনি অবার মন খারাপ হয়ে যায়। কক্সবাজারের সমাজসেবা কর্মকর্তা মনজুর মোরশেদ জানালো, সমাজসেবা অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৩৭৩ জন রোহিঙ্গা শিশূকে চিহিৃত করেছে যারা এতিম। এদের মধ্যে ৬৫ ভাগ তাদের বাবাকে হারিয়েছে আর ২২ ভাগ বাবা-মা দুজনেকেই হারিয়েছে।

আমি জানি না এই ৩৬ হাজার শিশুর ভবিষ্যত কী? জানি না সাড়ে তিনলাখ শিশর ভবিষ্যত। জানি না বাংলোদেশে পালিয়ে অসা ১০ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যত। কিন্তু সেটা যে আমাদের জানতেই হবে। নয়তো মানবজাতি যে অপরাধী হয়ে থাকবে।

শরিফুল ইসলাম হাসান, প্রোগ্রাম হেড, ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম