আমরা কি পাঠকের মৃত্যু চেয়ে চেয়ে দেখব?

February 5, 2018

আজ, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ‘বই পড়ি স্বদেশ গড়ি’ শ্লোগানে এবার পালিত হচ্ছে এই দিবস। একদিকে সাধনা, চর্চা, ধৈর্য্য, একগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি, অপরদিকে ক্ষতিকর এবং অকল্যাণকর বিষয় থেকে দূরে রাখতে বইয়ের মতো ভূমিকা অন্যকোন শিল্পই পালন করে না।

‘বই কই? কই বই?
ছোট নই, বড় নই
যদি না পড়ি বই, পিছিয়েই পড়ে রই
যত টাকার মালিকই হই!’

মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব। এর পেছনে যুক্তি বা কারণ কোনটাই কম নেই। কিন্তু একটি তথ্যের ভিত্তিতে এই ব্যাপারটির পক্ষে একেবারে অকাট্য একটি যুক্তি প্রমাণ করা যায়। তা হলো, মানুষ ছাড়া আমাদের আশেপাশের আর কোন প্রাণী বই লেখেও না, পড়েও না। বরং মানুষ সৃষ্টি নিয়ে লেখে, ছবি আঁকে- যা যুগের পর যুগ ধরে মুদ্রিত হয়ে আসছে বইয়ে।

বই ইতিহাসের ধারক। একটি বই মানে সেখানে অসংখ্য তথ্যের ফুলঝুঁড়ি, অসংখ্য মানুষের কথামালা, অসংখ্য চরিত্রের বিচরণ। বইতে লিপিবদ্ধ হয় গল্প, কবিতা, ছড়া। একটি বই কালের সাক্ষী। সে যেন হাজার বছরের পুরনো একটি বটগাছের মতো। শুধু পার্থক্য হলো- একটি বটগাছ সময়ের চিহ্ন হয়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়। কিন্তু বই হাত বদলায়, বারংবার মুদ্রিত হয়। হয়তো কাগজের মান বদলায়, হয়তো একই বইয়ের মলাটও বদলায়, অক্ষর ছোট বড় হয়- কিন্তু সৃষ্টি থেকে যায় লিখিত বক্তব্য আকারে। পঞ্চাশের দশকে লেখা কোন বই এখন চাইলে আমরা ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনেও পড়তে পারি।

শুধুমাত্র বই নিয়ে আরও কথা বলার আগে, অন্য একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়েও এখানে কিছু কথা বলে রাখা জরুরি। ঠিক গান, নাচ কিংবা ছবি আঁকার মতো লেখালেখিও কিন্তু এক ধরণের শিল্প। আর শিল্প মাত্রই বিনোদন। প্রযুক্তির আগমনের সাথে সাথে বিনোদন বহুমাত্রিকতা লাভ করেছে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বই এখনও একটি বিনোদন, এখনও এটি বিলুপ্তির পথে যায়নি সত্য, কিন্তু বই পড়ার স্থানগুলো বিলুপ্তপ্রায় বলতেই হবে। কমে যাচ্ছে লাইব্রেরি, নাগরিক জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে কাগজের গন্ধ, মানুষ হারাচ্ছে একাগ্রতা এবং মনোযোগ দিয়ে শিল্পের সাধনা করার অভ্যাস, কমছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা।

আজ, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ‘বই পড়ি স্বদেশ গড়ি’ শ্লোগানে এবার পালিত হচ্ছে এই দিবস। একদিকে সাধনা, চর্চা, ধৈর্য্য, একগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি, অপরদিকে ক্ষতিকর এবং অকল্যাণকর বিষয় থেকে দূরে রাখতে বইয়ের মতো ভূমিকা অন্যকোন শিল্পই পালন করে না। যে কোন কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ এমনকি খবর বা কাজের ক্ষেত্রে কত ই-মেইল, নিউজলেটার ইত্যাদি কতকিছুই তো আমরা রোজ পড়ি। যত পড়ি, ততই আমরা জানতে পারি, আর যা জানি সেই অনুযায়ীই নিজেদের চিন্তাধারাকে পরিচালিত করি, সেভাবেই বাঁচি। কাজেই নিজেদের বাঁচাতে লাইব্রেরি বাঁচাতে হবে; সরকারের পক্ষ থেকে আসা এই ঘোষণাকে এক দূরদর্শী চিন্তার ফল বললে মোটেও বেশি বলা হয় না!

আমাদের এই বাংলা, পূর্ব-পশ্চিম দুই ভাগ মিলিয়েই শত শত বছর ধরে কৃষিকাজের জন্য যেমন এক উর্বরভূমি, তেমনি শিল্প সাহিত্যের জন্যেও। পুরো এশিয়া মহাদেশের প্রথম নোবেল প্রাইজ এই বাংলার হাত ধরেই এসেছিল, সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্যে এসেছে পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস, যুদ্ধের ইতিহাস এবং সেই সাথে কত সহস্র কবিতা- নানা বর্ণের, নানা ঢঙ্গের, নানা রঙয়ের। ‘অমৃতাক্ষর ছন্দ’ বা সনেটও লিখেছে বাঙ্গালি, লিখেছে গোয়েন্দা কাহিনী কিংবা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সব রম্যরসের অনেকগুলোই কিছু বঙ্গসন্তানদেরই লেখা।

পাঠক ছাড়া কি এতো লেখা হয়? মানুষ পড়েছে, জেনেছে; আরও পড়েছে, বুঝেছে; নিজেরা ভেবেছে, অতঃপর পক্ষে বিপক্ষে আবার লিখেছে। পড়ার চাহিদা সেদিন তৈরি হয়েছিল লেখা এবং পড়ার মধ্যে এক অপূর্ব সমঝোতায়। দেশবিদেশের দোর্দন্ডপ্রতাপশালী সব লেখকদের লেখা পড়েছে বাঙ্গালি, কারণ এমন সব সাহিত্য অনুরাগীরা ছিলেন যারা বিদেশী ভাষার বিখ্যাত সব বই অনুবাদ করে সকলকে সেসব লেখার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

বই বাঙালির লড়াইয়ের হাতিয়ার। ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বই, ইসতেহার ছিল বাঙ্গালির কাছে বন্দুকের চেয়েও কার্যকর অস্ত্র। বিভিন্ন লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল, স্কুল, কলেজগুলোতে গড়ে উঠেছিল সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীর চেয়েও ভয়ংকর একেকটি পাঠচক্র। সাহিত্য, নীতি, তত্ত্ব নিয়ে আলাপ হতো, বিতর্ক হতো, সমালোচনা হতো, প্রশংসাও হতো। সবাই বলতো আরও বই চাই, আরও লেখক চাই।

বাঙালির এই জ্ঞানচর্চা সম্ভব হয়েছিল কারণ লাইব্রেরি ব্যাপারটি এক সময় হয়ে উঠেছিল বাঙালির সংস্কৃতির অংশ, এমনকি ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’। বনেদি পরিবারগুলোতে থাকতো বিশাল ঘরজুড়ে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি, জমিদার এবং সমাজের বাঘা ব্যক্তিবর্গ সকলেই জেলা শহর এবং গ্রামগুলোতে লাইব্রেরির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন- এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে এই নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতাও হতো একে অপরের মধ্যে। কার লাইব্রেরিতে কত বই, কে কত নামী লেখকের বই পড়েছে, ক’টা ভাষার বই পড়েছে তাই নিয়ে গোলযোগ বেঁধে যেতো তরুণদের মধ্যে। কোন প্রেমের উপন্যাস থেকে সংলাপ ধার করে প্রেমিকা জুটিয়েছে কত যে বাঙালি তরুণ! এমনকি লাইব্রেরিতে বসেও তরুণ তরুণীরা একসাথে বই বেছে নিয়ে পড়তো, পরীক্ষার প্রস্তুতি, রিসার্চ পেপার এসব কাজে তো লাইব্রেরির বিকল্প আগে ভাবাই যেতো না! সবজান্তা গুগল মশাই তো এই সেদিন এলেন বাঙ্গালির বাড়ি।

বাঙালি আজও বই পড়ে, বই লেখে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে প্রতি বছরই আরও বড় পরিসরে আয়োজিত হচ্ছে বইমেলা, প্রতিটি স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে আছে বিশালাকার সব লাইব্রেরি, নীলক্ষেতের মতো বইয়ের এক ঈর্ষনীয় বাজারও আমাদের আছে, কিন্তু চর্চাটা কোথায় গিয়ে যেন আটকে যায়! আসলে বইও তো বিনোদন, আর এই একুশ শতক তো বিনোদনের এক স্বর্গীয় উদ্যান এনে দিয়েছে সকল বয়সী মানুষের একেবারে হাতের মুঠোয়, তাই প্রয়োজন ছাড়া খুব বেশি সংখ্যক মানব মস্তিষ্ক বইয়ের ভার বহন করার মতো কষ্ট করতে চাননা; তাও কিনা আবার লাইব্রেরিতে!

ব্র্যাকের কার্যক্রমের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শিক্ষা। ব্র্যাক পৃথিবীব্যাপী প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ব্যবস্থা যা পরিচালিত হচ্ছে আটটি দেশে। ২৯০০ গণকেন্দ্র ও ৫০০০ কিশোর কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে ব্র্যাক বিশ্বজুড়ে ১৪ লাখেরও বেশি পাঠক এখন পর্যন্ত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আশার কথা হলো, এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সুন্দর এক পৃথিবীতে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি ব্র্যাকের এই বিশাল পাঠকেরা পৃথিবীর বিভিন্ন বিশালাকার গ্রন্থাগারগুলো ভ্রমণেরও স্বপ্ন দেখে। সেখানে আছে তাদের জন্য সময় কাটাবার সবচেয়ে লোভনীয় অনুষঙ্গ- বই!

আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে, বই কিনে কেউ কোনদিন দেউলিয়া হয়না! বই কিনে কিছু হারাবারও নেই। একান্তই যদি কেনার সুযোগ না থাকে তবে গ্রন্থাগারগুলো তো আছেই! আসুন, সবাই একসাথে এই প্রথম জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে একমত হই- সবাই হাতে তুলে নিই বই, গড়ে তুলি পড়ার অভ্যাস, আমরা করব জয়, একদিন!