আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস: প্রয়োজন নতুন সংজ্ঞায়ন

September 9, 2019

সাক্ষরতার সঙ্গে একটি দেশের উন্নয়ন গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ‘বহু ভাষায় সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা’ এই শপথ থাকুক অটুট।

সাক্ষরতার সঙ্গে শিক্ষা এবং শিক্ষার সঙ্গে উন্নত জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘বহু ভাষায় সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে (৮ই সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো দিবসটি প্রথম উদ্যাপন করে। তবে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে।

সাক্ষরতা অর্জনের  ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে সত্য কিন্তু এখনও বহু চ্যালেঞ্জ থেকে গেছে। সাক্ষরতার ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন হয়েছে সেটি অসম, দেশে দেশে মানুষে মানুষে এর ভিন্নতা স্পষ্ট। এক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয় তা সাক্ষরতা দিবসে আলোচনার দাবি রাখে।

প্রথিবীতে বহু ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এথনোলগ ওয়েবসাইট সূত্র থেকে জানা যায় যে,  পৃথিবীতে বর্তমানে আনুমানিক ৭হাজার ৯৭টি ভাষা বেঁচে আছে। এর মধ্যে দুই হাজার ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা এক হাজারেরও কম। এ ছাড়া মোট ভাষার মাত্র অর্ধেকের আছে লিখিত রূপ। এসব ভাষায় ব্যবহার করা হয় ৪৬ ধরনের বর্ণমালা। বাকিগুলো মৌখিকভাবেই চর্চিত হয়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাকেন্দ্রিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচেছ একটি করে ভাষা। সেগুলোর অবস্থান কোথায় আছে সেগুলোকেও বুঝতে হবে।

বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় ও ডিজিটালাইজড বিশ্বে বহুভাষিকতার বৈশিষ্টাবলি, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর প্রভাব ও ফল কী হতে পারে বহুভাষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্যসব ভাষার অন্তর্ভুক্তি ঘটানোও সাক্ষরতা দিবসের উল্লেখযোগ্য একটি দিক। ২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পৃথিবীতে ৭৭৫ মিলিয়ন মানুষ সাক্ষরতার মৌলিক ধারণা থেকে দূরে রয়েছে। এর অর্থ হচেছ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নয়। এই ২০ শতাংশের মধ্যে আবার প্রায় ৬৬ শতাংশ হচেছ নারী। প্রায় ৭৫ মিলিয়ন শিশু এখনও হয় বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে।

সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এদেশে সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৩.৯ শতাংশ এবং আমাদের মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার। তবে শুধু অক্ষরজ্ঞানসম্পন্নদের সাক্ষর বলা হয় না, এর সঙ্গে জীবনধারণ, যোগাযোগ দক্ষতা ও ক্ষমতায়নের দক্ষতাও যুক্ত হয়েছে। একসময় ছিল যখন কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো।  বর্তমানে যিনি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোটো বাক্য পড়তে পারবেন, সহজ ও ছোটো বাক্য লিখতে পারবেন এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাবনিকাশ করতে পারবেন তাকে আমরা সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলব। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো একে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।

যেসব শ্রমিক পরিবহনের সঙ্গে সংযুক্ত তাদের সাক্ষরতা বলতে আমরা কী বুঝব? তারা অবশ্যই নিজের নাম লিখতে পারবে, পরিবহন সম্পর্কিত আদেশ নিষেধ নিজ ভাষায় পড়তে পারবে, জনসাধারণ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হবে। যেমন অযথা হর্ন বাজানো, হাইড্রোলিক হর্ন না বাজানো, কোথায় কোথায় হর্ন একেবারেই বাজানো যাবে না ইত্যাদি। একইভাবে, কৃষিশ্রমিকদের ফসল উৎপাদনের সাধারণ নিয়মকানুন লেখা বই পড়া ও বুঝতে পারা, শিশু শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার শিক্ষার পূর্ণ অধিকার সম্পর্কে জানা ও আদায় করা, তাদের জন্য কোন কাজগুলো ঝুঁকিপূর্ণ তা বুঝতে পারা সাক্ষরতার অংশ। জনগণকে তাদের পেশা অনুযায়ী সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করে তুলবে, সরকার সেখানে সহায়তা প্রদান করবে, সামর্থ্য অনুযায়ী বেসরকারি সংস্থাসমূহ সহায়তা করবে। এভাবেই দেশ ও বিশ্ব থেকে প্রকৃত নিরক্ষরতা দূর হবে, প্রয়োজনীয় সাক্ষরতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি হবে।

বিশ্বে পনেরো বা তার বেশি বয়সিদের সাক্ষরতার হার ৮৬.৩ শতাংশ, তার মধ্যে পুরুষ ৯০ শতাংশ এবং নারী ৮২.৭ শতাংশ। ২০০৬ সালে ইউনেস্কোর গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিম আফ্রিকায় সাক্ষরতার হার সবচেয়ে কম। বিশ্বে যেসব দেশ সবচেয়ে কম সাক্ষরতাসম্পন্ন তার মধ্যে রয়েছে বার্কিনা ফাসো (১২.৮ শতাংশ), নাউজার ১৪.৪ শতাংশ, এবং মালি ১৯ শতাংশ। ২০১৫ সালে এই হার কিছুটা বেড়েছে সাব সহারান আফ্রিকায় ৬৪ শতাংশ। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাক্ষরতা দশক ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে এর সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা যুক্ত করে ‘সাক্ষরতা এবং স্বাস্থ্য’ হিসেবে তা পালিত হয়েছিল। ২০১১-১২ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সাক্ষরতা ও শান্তি’।

১৯১৮ সালে আমাদের দেশে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরপর ১৯৩৪ সালে খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ও নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৬০ সালের ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় সফলভাবে পরিচালিত হয় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যুরো অব নন ফরমাল এডুকেশন’। ১৯৯১ সালে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হচেছ আর মেয়েদের শিক্ষা বৃত্তি তো আছেই। আমাদের সংবিধানের ১৭ অনুচেছদে ছয় থেকে দশ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য বিনামূল্যে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সাক্ষরতা বৃদ্ধির ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বর্তমান বিশ্বে এখনও ৭৭৫ মিলিয়ন মানুষ সাক্ষর নয়, প্রতি পাঁচজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন নিরক্ষর। এ এক  বিশাল  বিভাজন নয় কি?  এই বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৬৪ শতাংশই আবার নারী। বিশ্বের সাত কোটি শিশু এখন লিখতে ও পড়তে পারে না। বিশ্বের মোট অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর তিন-চতুর্থাংশই বাস করছে জনবহুল ১৫টি দেশে। আফ্রিকার অনেক দেশগুলোতে আমরা অনবরত সংঘাত, অস্থিতিশীলতা দেখতে পাই, ঐসব দেশগুলোতে সাক্ষরতার হারও কিন্তু অনেক কম অর্থাৎ  শান্তিপূর্ণ অবস্থা ও উন্নয়ন সূচকের সঙ্গে সাক্ষরতার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার যখন (১৯৯১ সাল) ৩৫.৩ শতাংশ ছিল তখন ‘সমন্বিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম (ইনফেপ)’ নামে একটি বড়ো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এরপর  ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৯.৮২ শতাংশ। বর্তমানে ৭৩.৯ শতাংশ।

সাক্ষরতাকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং মানব উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ধরা হয়। কারণ দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা হার বৃদ্ধি জরুরি। সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের অবস্থান কোথায় স্ট্যান্ডর্ড মানদণ্ডে সেটি পরিমাপ করতে হবে, শুধুমাত্র সংখ্যার বৃদ্ধিতে  উন্নীত করে তৃপ্তি পাবার অবকাশ নেই।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of