সকলের হোক আন্তর্জাতিক নারী দিবস

March 8, 2019

পুরুষতন্ত্রের অচলায়তন ভাঙলে তা শুধু নারী নয়, শুধু পুরুষেরও নয়, সমৃদ্ধ করবে পুরো সমাজকে – আমাদের মধ্যে এই উপলব্ধি যেন ধীরে ধীরে বাড়ছে।

আজকাল অফিস থেকে বাসায় ফিরতে প্রায়ই নটার মতো বেজে যায়। খোঁড়াখুঁড়ি, যানজট, জলজট পেরিয়ে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে হাঁপিয়ে পড়ি। একই অবস্থা তো আরও লাখ-লাখ অফিসফেরত নারী-পুরুষের। ছুটির দিনে যখন একটু রাত করে, এই দশটা-এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরি তখনও বাস-টেম্পোতে অনেক যাত্রী। তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা মোটেই কম থাকে না। আমার তখন শৈশব-কৈশোরে দেখা ঢাকা শহরের কথা মনে পড়ে।

ঢাকায় আমার যে পরিবার থিতু হয় গত শতকের সত্তর দশকের মাঝামাঝি। রাজধানী ঢাকা তখন আজকের কোনো উপজেলা শহরের চাইতেও নিরিবিলি ছিল। কয়েকটা মাত্র প্রধান সড়ক যাকে আমরা বড়ো রাস্তা বলি। যুদ্ধবিধ্বস্ত গরিব দেশের সেসব সড়কে তখন সন্ধ্যার পর টিউবলাইট মিটমিট করে জ্বলে কি জ্বলে না। পথচারীদের মধ্যে নারী বিশেষ করে কর্মজীবী নারী এত কম যে, আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তা কল্পনাই করতে পারবে না।

কর্মজীবী নারীর সংখ্যা যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল আরও বছর পাঁচ-সাত পরে, আশির দশকের শুরুতে, যখন একটার পর একটা রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা বসতে শুরু করল। নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা নিজের সবচেয়ে ভালো জামা বা শাড়িটি পরে, স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে, কমদামি হাতব্যাগ দুলিয়ে টিফিনবাটি নিয়ে কারখানায় যেতে শুরু করলেন। গর্বভরে বলতেন, ‘অফিস যাই’।

ছোটবেলা থেকে চার দশক দূরে দাঁড়িয়ে, আমার সেই শহরকে আজ প্রায় চিনতেই পারি না। বাড়ি-গাড়ি-ধোঁয়া-ঘিঞ্জি এসব তো আছেই, কিন্তু একটু ভাবলে বুঝি শহরের জননিসর্গটাও আমূল পালটে গেছে। আর আমার চোখে সেই পালটানোয় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে বাড়ির বাইরে কাজ করতে আসা নারীরা।

সত্তরের দশকে এদেশের মেয়েদের কোন কোন পেশায় দেখা যেত? অল্প কিছু চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, এয়ার হোস্টেস, হাতে গোনা সাংবাদিক, কিছু সরকারি ও বেসরকারি চাকুরে, গৃহকর্মী – এই তো। আর এখন? বাংলাদেশে মনে হয় এমন কোনো পেশা বাকি নেই যেখানে মেয়েদের পদচারণা নেই।

প্রকৌশলী, পাইলট, ট্রেনচালক, গাড়িচালক, নাবিক, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী, মনোবিজ্ঞানী, প্রশাসন – প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই মেয়েদের বিচরণ দেখতে পাচ্ছি। প্রশাসনে মেয়েদের অবস্থানের সংখ্যাগত চিত্রটি চমকপ্রদ। গত বছর (২০১৮) দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখলাম সেসময় প্রশাসনে ১০ জন সচিব, ৩৮৬ জন অতিরিক্ত সচিব, ১০৫ জন যুগ্ম সচিব, ২৭০ জন উপসচিব পদমর্যাদার নারী কর্মকর্তা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সেসময় ৬৪ জেলার মধ্যে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দায়িত্বে ছিলেন ৭ জন নারী। ৪৬০ উপজেলার মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পদে ছিলেন ১৭২ জন।

যে তথ্যটি দেখে কিছুটা চমকে গেলাম তা হচ্ছে, বাংলাদেশ বিমানে নারী বৈমানিক রয়েছেন ১২ জন। তাছাড়া বেসরকারি এয়ারলাইন কোম্পানিগুলোতেও নারী বৈমানিকরা কাজ করছেন। আমাদের দেশে প্রথম নারী বৈমানিক কানিজ ফাতেমা রোকসানা ১৯৭৭ সালে পেশাদার বৈমানিকের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। কিন্তু তার পথ অনুসরণ করে আজ অনেক নারী বৈমানিক হচ্ছেন বা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। এটাই সবচেয়ে বড়ো কথা, সুখের কথা।

কয়েকদিন আগে আরও একটি চমকে দেওয়ার মতো সংবাদ পেলাম। দেশে প্রথমবারের মতো পুরুষ ফুটবল ক্লাব ঢাকা সিটি এফসির কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দেশের সুপরিচিত নারী অ্যাথলেট ও ফুটবল খেলোয়াড় মিরোনা খাতুন। সারা বিশ্বেই পুরুষ ফুটবল দলে নারী কোচ নিয়োগের দৃষ্টান্ত একেবারেই হাতে গোনা। মিরোনা তাই ইতিহাস গড়েছেন। কিন্তু এর পেছনে ক্লাব কর্তৃপক্ষের আগুয়ান মানসিকতাকে অবশ্যই অভিন্দন জানাতে হবে। এই নিয়োগের ব্যাপারে ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামস-উদ-দোজা খান তুহিন বলেছেন, ‘আমরা তার মেধা দেখে তাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছি। ও ছেলে না মেয়ে একবারও চিন্তা করিনি।’

বাংলাদেশের মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা কি তাদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি? সমাজ কি তার এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর সৃষ্টি করতে পেরেছে? আমরা সকলেই কি শামস-উদ-দোজা খানের মতো?

বাস্তবতা যে একেবারেই তা নয় বিভিন্ন জরিপে তার সংখ্যাতাত্ত্বিক চিত্রটি পরিষ্কার। গণমাধ্যম শুধু নয়, আমাদের আত্মীয়স্বজন পরিচিতজনদের মধ্যেও নির্যাতন-নিপীড়নের যেসব ঘটনা আমরা নিত্যদিন শুনতে ও দেখতে পাই তা আমাদের বলে দেয় নারীর যাত্রাপথ এদেশে কতটা কণ্টকাকীর্ণ। নারী হিসেবে আমরা নিজেরাও কি প্রতিদিন ছোটো-বড়ো নানান বাধা পার হচ্ছি না? রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া আমাদের সকলের সাধারণ অভিজ্ঞতা। জনপথ ও জনপরিসরে যৌন হয়রানির ব্যাপকতার চিত্রটি উঠে আসছে বিভিন্ন জরিপে, যা থেকে স্পষ্ট এটা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি।

যোগাযোগ প্রযুক্তির আশ্চর্য উন্নতিতে পৃথিবীর দূরতম প্রান্তের সংবাদ এখন আমাদের হাতের মুঠোয়, যা থেকে জানতে পারি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব দেশেই মেয়েরা তাদের কাজ করে যাচ্ছে। তারা এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার বিভিন্ন মাত্রায় অবদান রাখছে সে কথা সত্যি, কিন্তু একইসঙ্গে কখনও কখনও সেই রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার থেকেই আবার প্রবল বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সেই বাধা কোনো সময় খুন-ধর্ষণের মতো চরম নির্মমতায় রূপ নিচ্ছে।

একদিকে এগিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে ঠেকিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা – শুধু নারী নয়, পুরো মানবসমাজ যেন এক অদ্ভুত বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। এই যাত্রাপথে পেছনে ফেরার পথটি মুছে দিতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তির ছন্দোবদ্ধ উদ্যম। ভালো কথা এই যে, পুরুষতন্ত্রের অচলায়তন ভাঙলে তা শুধু নারী নয়, শুধু পুরুষেরও নয়, সমৃদ্ধ করবে পুরো সমাজকে – আমাদের মধ্যে এই উপলব্ধি যেন ধীরে ধীরে বাড়ছে। সেই উপলব্ধির পথ বেয়ে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাব, এবারের নারী দিবস আমাদের সেই প্রেরণা দিক।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of