আত্মবিশ্বাসে মিলবে মুক্তি

October 24, 2018

প্রতিটি মানুষই মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন, তার আছে প্রতিভা এবং সম্ভাবনা যার সঠিক ব্যবহার করে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু দরিদ্রতম মানুষ নিজেদের এই গুণগুলোর বিষয়ে নিজেরাই অবহিত নন।

আপনি মানুষকে সহায়তা করতে ভালোবাসেন। আপনার গ্রামের কিছু গরীব পরিবারকে আপনি নিয়মিত অর্থ সাহায্য করেন। কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন বারবার সাহায্য করার পর আবারও তারা আপনার দ্বারস্থ হয়? টাকাগুলো তারা কী কাজে ব্যবহার করেন? কেন আপনার দান তাদের জীবনে কোনও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে না?

সমস্যাটি মূলত অর্থ দান করাতে নয়, বরং যাকে দান করা হচ্ছে নিজ সামর্থ্যের উপর তার বিশ্বাস কতটুকু এবং সঠিক কাজে অর্থ বিনিয়োগ করতে তিনি কতটুকু সক্ষম সেই জায়গায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো অধিকাংশক্ষেত্রেই যিনি দান করেন এবং যাকে দান করা হয় তারা দুজনই মনে করেন গরীব মানুষ সারা জীবন গরীবই থাকে। অন্যের কাছে হাত পেতে তাদের জীবন পার হয়ে যায়।

প্রকৃতপক্ষে এটা একটি অত্যন্ত ভুল ধারণা। প্রতিটি মানুষই মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন, তার আছে প্রতিভা এবং সম্ভাবনা যার সঠিক ব্যবহার করে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু দরিদ্রতম মানুষ নিজেদের এই গুণগুলোর বিষয়ে নিজেরাই অবহিত নন। তাদের নেই আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা করার দক্ষতা। আর নেই তাদেরকে আশাবাদ দেওয়ার মতো কোন পথপ্রদর্শক।

সম্প্রতি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে ‘দ্য পাওয়ার অব হোপ’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লেখক অনেকগুলো গবেষণার উদাহরণ টেনে দেখিয়েছেন যে- আশাবাদ এবং অনুপ্রেরণা মানুষের ভেতর একটা বড় মানসিক পরিবর্তন আনতে পারে যা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের অবস্থার উন্নতি সাধনে উৎসাহিত করে।

বিশ্ব জুড়ে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে যে নানা ধরণের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তার মধ্যে তিন ধরনের কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। সেগুলো হলো- ১) নগদ অর্থ হস্তান্তর কার্যক্রম, ২) জীবিকায়ন এবং ৩) পূববর্তী দুই ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে আরও কিছু সহায়তা যেমন কারিগরী প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, হাতে-কলমে শিক্ষা, নিয়মিত পরামর্শ প্রদান ইত্যাদির সমন্বিত প্যাকেজ কার্যক্রম যা গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচি নামে পরিচিত।

এই তিন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থসামাজিক উন্নয়নে গ্র্যাজুয়েশন কর্মসূচি অধিক কার্যকর। কেননা এই কর্মসূচিতে অতিদরিদ্র মানুষের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা এবং তাদের দক্ষ করে তোলাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রথম দুটো কর্মসূচি অর্থাৎ নগদ অর্থ হস্তান্তর এবং জীবিকায়ন থেকে প্রাপ্ত অর্থ অথবা গবাদি পশু/ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি দিয়ে কী করবেন সে বিষয়ে জ্ঞান এবং আত্মবিশ্বাস দুটোরই অভাব থাকায় অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদে প্রাপ্ত সম্পদগুলো ধরে রাখতে পারেন না অথবা সেগুলো থেকে উপার্জন করে আরও সম্পদের অধিকারী হতে পারেন না।

অতএব, কোন মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে হলে তার জীবনে স্থায়িত্বশীল পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যক্তি জীবনে আপনি যখন কাউকে কোন সহায়তা করতে চান, তখন তার হাতে নগদ অর্থ দান হিসেবে দেওয়ার চেয়ে তার সন্তানের পরীক্ষার ফি দেওয়া বা  বই কিনে দেওয়া যেতে পারে। এতে ঐ পরিবারটি সাময়িকভাবে উপকৃত না হলেও তাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠবে। আবার এটাও হতে পারে যে আপনি একজন গরীবকে আর্থিক সহায়তা করলেন, কিন্তু একটা শর্ত জুড়ে দিলেন যে এখান থেকে তাকে কিছু অর্থ জমাতে হবে। টাকা জমানোর অভ্যাস তৈরি হলে একসময় তিনি জমানো অর্থ দিয়ে একটি ছোট গরু কিনতে পারবেন বা ভ্রাম্যমান চায়ের দোকান দিতে পারবেন। আপনি তাকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করলে কাজটি তার জন্য খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়।

বেশ কয়েক বছর আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম ভারতের কোন একটি সমুদ্র সৈকতে এক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে একটা ফ্রিজ চালু করেছেন। সেখানে মানুষ তাদের উদ্বৃত্ত খাবার রেখে যায়। ভিক্ষুক বা গৃহহীন মানুষ সেখান থেকে খাবার খান। অত্যন্ত মহৎ উদ্যোগ, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মুশকিল হলো এ রকম উদ্যোগ দরিদ্র মানুষকে সাময়িক সুখ দিতে পারে। তাদের জীবনের স্থায়িত্বশীল পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। এটিও সেই দান করার মতোই, যেখানে একটি দল তাদের অতিরিক্ত দান করছেন আর আত্মবিশ্বাসহীন, আশাহীন আরেকটি দল ধরেই নিচ্ছেন যে সারা জীবন হাত পেতে তারা সেই দান গ্রহণ করে যাবেন।

একটা সত্যি ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করবো। আমি একজন উন্নয়নকর্মীকে চিনি যিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় অতিদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। কাজের সুবাদে অত্যন্ত দরিদ্র নারীদের কিভাবে আয়ের পথ বাড়ানো যায়, আশাবাদ জাগিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা যায় এ বিষয়ে তিনি দক্ষতা অর্জন করেছেন। একবার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করার সময় তিনি একজন বৃদ্ধাকে দেখতে পান। পৃথিবীতে তার কেউ নেই, ভিক্ষা করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করেন। উন্নয়নকর্মী ভাইটির ঐ বুড়িমার জন্য খুব মায়া হয়। তিনি একদিন বুড়িমার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। এটা সেটা কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি দেখতে পান এককোনায় মুড়ি তৈরির একটি পাত্র পড়ে আছে। বুড়িমা তাকে বলেন যে তিনি মুড়ি বানাতে পারেন। কিন্তু তার কাছে মুড়ি তৈরি করাকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করার মতো কোনও মূলধন নেই। গ্রামের বাজারে গিয়ে মুড়ি বিক্রি করা এই বয়সে তাঁর পক্ষে সম্ভবও নয়। উন্নয়নকর্মী ভাইটি গ্রামের ধনবান মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুড়িমার জন্য মূলধন হিসেবে কিছু অর্থ সাহায্য যোগাড় করলেন। তিনি একটি ছোট ছেলেকে খুঁজে বের করলেন যে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে বুড়িমার তৈরি মুড়ি বাজারে বিক্রি করতে রাজি হলো। পরবর্তীতে বুড়িমা যে কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন তিনি মুড়ি তৈরির কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। ভিক্ষা করা অনেক কমিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ বয়সে এসে তার জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছিল। বুড়িমা মারা যাওয়ার পর ঐ ভাইটির সঙ্গে আমার কথা হয়। ফোনের অপর প্রান্তে তিনি অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন।

তাই বলি, সাহায্য যদি করতেই চান তাহলে এমনভাবে করুন যেন আপনি ঐ দরিদ্র মানুষটির জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশিদার হতে পারেন। শুধু অর্থ দানের জন্য দান নয় বরং মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি আনতে সহায়ক হতে পারাতেই মানবতার প্রকৃত জয়।