অশিক্ষা ও অপুষ্টির বিরুদ্ধে শামসুন্নাহারের লড়াই

July 27, 2017

স্কুলের সময় তখন শেষ। সেই অলস দুপুরে দূর থেকে, গাছগাছালী ভেদ করে, থেমে থেমে ডাকতে থাকা পাখিদের আওয়াজ ছাপিয়ে ভেসে আসছিল ছড়ার মত শিশুদের নামতার সুর। কিছুদূর এগোতেই দেখা গেল, বেশ কিছু সংখ্যক কিশোর-কিশোরী গাছের নিচে বসে লেখাপড়া করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু রংপুর জেলার এই মৌলভীবাজার গ্রামেই নয়, আশেপাশের আরো অনেক গ্রামেই স্কুলের পর ফ্রি-সহায়ক ক্লাস বা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। জানলে অবাক হতে হয়, এই কর্মসূচি কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত নয়। বরং স্বল্পশিক্ষিত একজন নারী, শামসুন্নাহার, নিজ উদ্যোগে এই কর্মসূচি শুরু করেছেন। তার নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশের গ্রামগুলোতেও। এখন গ্রামে গ্রামে গেলে দেখা যায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে চলছে পড়াশোনা।

দেশ জুড়ে এমন অসংখ্য উদ্যোগী ও সাহসী পরিবর্তকেরা ছড়িয়ে আছেন। এমন কয়েকজনের গল্প আমরা ইতিমধ্যে তুলে ধরেছি। আত্মপ্রত্যয়ী শামসুন্নাহার জীবনে বহু ঝড়ঝাপ্টা পার করেছেন। তবে শিক্ষার মূল্য তিনি ভালই বোঝেন। আজ তিনি দু’টি বাড়ি এবং ৩৬ কাঠা জমির একজন গর্বিত অধিকারী, কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এসব পাননি। গ্রামের খুবই দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম এবং অল্প (১৩ বছর) বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনার সুযোগ কখনও হয়নি। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় ক্যানসারে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েন। এক ছেলে এবং এক মেয়েকে তখন স্কুল পাঠানো তার জন্য অসম্ভব, কিন্তু মনের এক কোণে তিনি এই স্বপ্ন ঠিকই লালন করতে থাকেন।

শামসুন্নাহার সবসময় বিশ্বাস করতেন, বড় কিছু অর্জন করতে হলে ছোট থেকেই শুরু করতে হয়। নিজের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথে শামসুন্নাহারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল পোল্ট্রি ফার্ম এবং গবাদি পশু পালনের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়া। দু’বছর পর তিনি একটি মুরগীর খামার চালাতে শুরু করেন। আয়ের প্রথম টাকা দিয়ে সবার আগে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করান। স্বপ্ন পূরণের পথে শামসুন্নাহারের অগ্রযাত্রা তখন থেকেই শুরু ! ছেলেমেয়েদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে শামসুন্নাহার সবসময় সচেষ্ট ছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করেন এই দায়িত্ব শুধু শিক্ষকদের একার নয়, তার নিজেরও।

ইউনিসেফ-এর একটি রিপোর্ট হতে জানা যায়, অবস্থাপন্ন পরিবারের শিক্ষার্থীদের থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ফলাফলের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকে। এছাড়াও ৫ম শ্রেণীতে ওঠার আগেই নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবার ঝুঁকিও থাকে। শিক্ষা ছাড়াও, শিশুদের মধ্যে পুষ্টিজনিত ঘাটতি থেকে যায়। কোন কোন নিম্নবিত্ত পরিবারকে কখনও কখনও খাদ্য সংকটের মুখোমুখিও হতে হয়। যার ফলস্বরূপ, এই পরিবারগুলোর শিশুদের পুষ্টিহীনতায় ভুগতে দেখা যায় এবং তারা ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে।

শামসুন্নাহার বুঝতে পারলেন তার এলাকার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে যদি তারা স্কুলের পরেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত সাহায্য পায় এবং অবশ্যই যদি তাদের জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করা যায়। গ্রামের উচ্চমহল এবং কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে কথা বলে তিনি নিজেই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হন। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অতিদরিদ্র পরিবাদের ছেলেমেয়েদের একটি উন্মুক্ত, সহায়ক ক্লাসের অংশ করে নেয়া। এই কর্মসূচি চালু হয় এবং তার উৎসাহ-উদ্দীপনার পুরস্কারস্বরূপ গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন শামসুন্নাহার। এই কার্যক্রম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর তিনি তার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন শিশুদের পুষ্টি। তিনি সবজি চাষের প্রশিক্ষণ নেন এবং অন্য আরও অনেককেই এই প্রশিক্ষণ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের এলাকায় চাষের জন্য উপযোগী এমন বিভিন্ন পুষ্টিকর শাকসবজি এবং গাজর, টমেটো ইত্যাদিও তার এলাকায় চাষ করা শুরু হয়।

গ্রামের ছেলেমেয়েদের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে নিজ উদ্যোগে এই উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো হাতে নেন শামসুন্নাহার, কোনকিছুর প্রলোভনে নয়। কোন বাঁধার কাছে হার না মেনে, তিনি শিক্ষা এবং পুষ্টির প্রসারে অবিচলভাবে কাজ করতে থাকেন যা তার নিজ এলাকার পাশাপাশি নিজ নিজ অবস্থান থেকে পৃথিবীটাকেও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।