অনেক তো হলো, এবার রুখে দাঁড়াই!

January 23, 2018

এখানেই রুখে দাঁড়ানোর শুরু। সিদ্ধান্ত হলো এই ক্যামপেইন হবে পুরুষদের নিয়ে, পুরুষদের জন্য এবং পুরুষ পরিচালিত। আমরা পুরুষদের আহবান জানালাম নারীদের প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণের মতো অপরাধ রুখে দাঁড়াতে। ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে এই যাত্রার শুরু, যেখানে পুরুষদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় রূপাহত্যার উদাহরণের মধ্য দিয়ে।

বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকে সেই সমস্যাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করার মধ্যে।

সমস্যার উৎপত্তি এবং কারণ জেনেও সমাধান ঘটানোর উদ্যোগ গ্রহণ না করা তাকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতোই।

যারা ভুক্তভোগী তাদের উপর সমস্যার দায় চাপিয়ে দেওয়া একটি সামাজিক হঠকারিতার বহিঃপ্রকাশ।

যে সমস্যা একের পর এক মৃত্যুর কারণ, সম্ভ্রম হারানোর কারণ, যার অনুষঙ্গ পৃথিবীর আদিপাপগুলোর একটি, তার সমাধান না খুঁজে যখন হঠকারীর মতন তাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন তা হয়ে ওঠে অপরাধ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অপরাধীরা আমাদের সমাজে পার পেয়ে যায় আর বিচারের অভাবে ডুকরে কেঁদে মরে মানবতা।

ইয়াসমিন, রূপা, তনু – এই নামগুলো পরিচিত লাগছে?

এই নামে তো আপনার আশেপাশেই কতজন আছে। আপনার কোনো প্রিয় গল্প বা উপন্যাসেই হয়তো এদের হেসে বেড়াতে, কথা বলতে দেখেছেন; ঠিক বাস্তবের মতোই। কিন্তু আপনার আশেপাশের বা গল্পের চরিত্রগুলোর তুলনায় আমরা যাদের কথা বলছি সেই ইয়াসমিন, রূপা, তনুরা আরও অনেক বেশি দুঃখী, গল্প-উপন্যাসের বর্বরতাকে হার মানায়, এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের।

তাদের পরিণিতি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কথা হয়নি তাদের পরিণতির দায়ভার কাদের ওপর বর্তায় সে বিষয়ে।

এই দায় পুরুষের। এক কথায়, এক বাক্যে। অনেক তো হলো, পুরুষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে জানার এবং সচেতন হবার সময় এসেছে এবার।

ব্র্যাকের লক্ষ্য সবার জন্য বসবাসযোগ্য, একটি সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ। ব্র্যাক বিশ্বাস করে সকলে মিলে এক হয়ে একটি বৈষম্যহীন, সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ অসম্ভব কিছু নয়। আর এই পৃথিবী নির্মাণের কারিগর নারী-পুরুষ সবাই। নারীর ক্ষমতায়নে ব্র্যাক বিশ্বাস করে। এবং এই লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ব্র্যাক কাজ করে আসছে জেন্ডার সাম্য প্রতিষ্ঠায় এবং সর্বোপরি শোষণ ও নির্যাতনমুক্ত এক সমাজ নির্মাণে।

সাম্প্রতিককালে দেশে ধর্ষণের প্রকোপ বেড়েছে ব্যাপক মাত্রায়। প্রতিদিনই গণমাধ্যমগুলোতে ধর্ষণের খবর আমরা দেখছি বা শুনছি। ধর্ষণের পরও শান্তি পাচ্ছে না অবিবেচক, পাষণ্ড পুরুষ। একটি নারীদেহ একজন বা কয়েকজন মিলে জোরপূর্বক ভোগ করার পর সমস্ত চিহ্ন ঢেকে ফেলতে তারা তাকে হত্যা করছে, এবং পথেঘাটে আবর্জনার মতো ফেলে দিচ্ছে ভোগ করে নেওয়া সেই প্রাণহীন নিথর দেহ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট বলছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮০টি। ধর্ষণ শেষে বর্বর পুরুষ ১৬ জন নারীকে হত্যা করেছে এবং নিজেকে লজ্জা থেকে বাঁচাতে ৫ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।

এখানে না হয় ধর্ষণের একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হলো। কিন্তু এর বাইরে কি কিছু ঘটছে না? ধর্ষণের বাইরেও নারীকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করতে পুরুষ প্রতিনিয়তই উদ্ভাবনী (!) সব পন্থা বেছে নিয়েছে এবং সেগুলো কোথায় না ঘটছে! ঘর থেকে একজন নারী, তিনি যে বয়সেরই হোন, বের হওয়ামাত্রই আশেপাশের অনেক পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তিনি সক্ষম হন। এটা যতটা না তার বাহ্যিক আবরণ বা সৌন্দর্য বা ফ্যাশনের কারণে, তার চাইতে অনেক বেশি এক ভোগ্যবস্তু হিসেবে। তিনি যদি পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিয়মাবলি যথাযথভাবে পালনও করেন তবেও তিনি ছাড় পাচ্ছেন না। চলন্ত বাসে আপাদমস্তক ঢাকা এক ঘুমন্ত নারীর ভিডিওচিত্র নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন একজন পুরুষ, এমন ঘটনাও ঘটছে। এবং সেই পুরুষের মোবাইলের হোমস্ক্রিনে কার ছবি আছে জানেন? নিজের স্ত্রী-সন্তানের!

এমন ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে অহরহ। তবে ব্র্যাকের ধর্ষণবিরোধী ক্যামপেইন #রুখেদাঁড়াই-এর কাজ যখন শুরু হয়, তখন একটি বিষয় সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট হয়, ধর্ষণ, নির্যাতন বা নারীর প্রতি অপমানসূচক যে কোন কর্মকান্ড যেখানেই হচ্ছে, যারাই করছে, সেটা ঘটছে আশেপাশের পুরুষদের প্রতিবাদের অভাবে। পাবলিক বাসে একজন যদি কোন অপরাধ করেন, তখন তিনি পার পেয়ে যান আশেপাশের অসংখ্য মানুষের নীরবতার কারণে। তারা নীরব থাকেন কারণ তাদের ধারণা প্রতিবাদ করলে উল্টো তাকে হেনস্তার শিকার হতে হবে। আবার কেউ বা লজ্জায়, রাগে, দুঃখে চুপ করে থাকেন।

এখানে প্রয়োজন এক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের। তাই যে বৃহৎ এক চিন্তার ছায়াতলে #রুখেদাঁড়াই ক্যামপেইনের উদ্ভব, তা হলো ‘পৌরুষ: নতুন ভাবনা’। ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট রাতে বগুড়া থেকে টাঙ্গাইল যাবার পথে চলন্ত বাসে রূপা নামের একজন তরুণীকে বাসে একা পেয়ে ধর্ষণ এবং হত্যা করে সেই বাসের ড্রাইভার, হেলপার, কন্ডাক্টরসহ পাঁচজন। ঘটনাটি আমাদের ভীষণভাবে আঘাত করে। আলোচনা হয় এই হত্যাকান্ডের জন্য কি রূপা নিজেই দায়ী? রাতে ভ্রমণ করাটা কি এতই বড় অপরাধ একটি মেয়ের জন্য? নাকি মেয়ে হওয়া মানেই চলন্ত বাস হোক বা নিরাপত্তারক্ষীর ভ্যান হোক, সেখানেই পুরুষেরা তাকে ভোগ করতে পারে?

এখানেই রুখে দাঁড়ানোর শুরু। সিদ্ধান্ত হলো এই ক্যামপেইন হবে পুরুষদের নিয়ে, পুরুষদের জন্য এবং পুরুষ পরিচালিত। আমরা পুরুষদের আহবান জানালাম নারীদের প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণের মতো অপরাধ রুখে দাঁড়াতে। ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে এই যাত্রার শুরু, যেখানে পুরুষদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় রূপাহত্যার উদাহরণের মধ্য দিয়ে।

পথেঘাটে, অফিস-আদালতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার পুরুষের কাছে আমরা নিজেরা গিয়ে ভিডিওটি দেখাই। তাদের মতামত গ্রহণ করি। আমরা আশাবাদী হই কারও দৃঢ়, প্রত্যয়ী, ইতিবাচক কথায়। আবার হতাশ হই যখন শুনি নারীরা পথে বের হলে তার উপর পুরুষের দৃষ্টি থাকবেই এবং কামনা চরিতার্থ করা ইচ্ছা জাগবে – সেটাই যেন স্বাভাবিক। এসব মতামত নিয়ে আমরা প্রকাশ করি দ্বিতীয় একটি ভিডিও।

এই ভিডিওটি আমরা প্রদর্শন করি বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সম্মুখে ‘পৌরুষ: নতুন ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে। বৈঠকে উপস্থিত টেলিভিশন, দৈনিক পত্রিকা, রেডিও, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিবৃন্দ একমত হন যে, এবার পুরুষেরই পালা ধর্ষণ রোধে এগিয়ে আসার।

এই মুহূর্তে আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি সেসব পুরুষদের, নিজেদের অবস্থান থেকে যারা বিভিন্নভাবে এগিয়ে এসেছেন, যারা সরাসরি মাঠে নেমে পড়েছেন ধর্ষণ এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে। এমনই একজন হলেন টাঙ্গাইলের ৬৫ বছর বয়স্ক স্বাস্থ্য সাধক মির্জা শাহজাহান। গণমাধ্যম ব্যক্তিদের নিয়ে তৃতীয় ভিডিওটি প্রকাশের পর আমাদের পরবর্তী কাজটি হয় রূপা হত্যার দাবিতে টাঙ্গাইল আদালত ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় দৌঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া মির্জা শাহজাহানকে জনসমক্ষে তুলে ধরা। নিজের অবস্থান থেকে রুখে দাঁড়ানোর এক অনন্য নজির স্থাপন করায় তাঁর গল্প নিয়ে আমরা সামাজিক মাধ্যমে আমাদের চতুর্থ ভিডিওটি প্রকাশ করি।

শুধু সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে এই মহামারি রোধ করা যাবে না, আমরা জানি। তাই ধর্ষণ প্রতিরোধে দেশের পুরুষসমাজকে সম্পৃক্ত করতে আমরা গ্রহণ করতে যাচ্ছি এক বৃহৎ পরিকল্পনা। পুরুষেরা যদি এখনই রুখে না দাঁড়ান তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এক সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে কাজ করছি আমরা, আর এই নির্মাণের পথে এক বড় বাধা হলো নারী নির্যাতন। আমরা রুখে দাঁড়াই মানবতার খাতিরে, রুখে দাঁড়াই বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

পুরুষেরা আসুন, আমরা প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধ গড়ি, প্রতিকার করি।